আনিসুল হক’রা বেশি দিন বাঁচে না !

624

রাজু আহমেদ ::
যারা এখনো মৃত আনিসুল হকের রাজনৈতিক পরিচয় খোঁজেন, সে পরিচয়ে তাকে মূল্যায়িত করতে চান কিংবা যাদের কাছে ব্যক্তির মর্যাদা নির্ধারিত হয় তার রাজনৈতিক মতাদর্শের মাপকাঠিতে-তারা এ লেখা পড়লে নির্ঘাত সময় অপচয় হবে।
দেশের নীতিহীন রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত কারো বিদায়ের ক্ষণে মানুষের ভাবাবেগ যে এতখানি অকৃত্রিম হতে পারে তা হয়ত ক্ষণজম্মা আনিসুল হকের বিদায় না হলে উপলব্ধিতে আসতো না। এ গ্রহ থেকে অনেক তাঁরা কালে-অকালে বিদায় নিয়েছে কিন্তু বেদনার নীল রঙে মানুষকে ততোটা মলিন করতে পারেনি যতোটা আনিসুল হকের চলে যাওয়ায় সৃষ্টি হয়েছে। দল-মতের উর্ধ্বে এসে মানুষ তার শুণ্যতায় নিভৃতে কাঁদছে। সবুজ ঢাকার স্বপ্নে বিভোর এমন নবচেতকের এভাবে চলে যাওয়া শুণ্যতার গহীন অতল সৃষ্টি করেছে।
তাকে নিয়ে কিছু লিখতে বসার আগে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার দেয়া বক্তৃতার অন্তত ডজন দেড়েক শুনতে হয়েছে। কেননা ব্যক্তিকে মুল্যায়ণ করতে হলে তার কথা কিংবা কাজের সাথে পরিচিত থাকা আবশ্যক। বহুধা গুণান্বিত হকের প্রত্যেক বাক্যের দেশের তরুণ-যুবদের জন্য শিক্ষামূলক বার্তা ছিল। তিনি সর্বদা স্বপ্ন আঁকতেন কিভাবে এদেশের মানুষকে মানুষের মত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা যায়। তিনি বিভিন্ন পথের উপমা দিতেন। নৈতিকতার মন্ত্র শোনাতেন। তার রাজনীতি কিংবা জীবনদর্শনের কোথাও গোঁড়ামী কিংবা অন্ধত্ব স্থান পায়নি। স্বপ্ন দেখাতে বিভোর মানুষটি এত তাড়াতাড়ি যে নিজেই স্বপ্ন হয়ে যাবেন-তা কে জানত ! দেশের মাটির দুর্ভাগ্য যে, ভালো মানুষদেরকে সে দ্রুতালয়েই গ্রাসে নেয়।
যারা রাজনৈতিক ব্যানার বেষ্টিত করে আনিসুল হককে মুল্যায়ণ করতে চান, তাদের বোধদৃষ্টিকে আরও প্রসারিত করা দরকার। সরকারিদল মনোনীত প্রার্থী হয়ে তিনি ঢাকা উত্তরের মেয়র নির্বাচিত হয়েছে এবং ঢাকার মত এলাকায় অন্তত শ’দেড়েক একর অবৈধ দখলকৃত জমি উদ্ধার করেছেন। কোন সরকারের আমলেই তাদের মদদপুষ্ট কিংবা একনিষ্ঠ সমর্থক ছাড়া অবৈধ দখলদার হতে পারে না। অথচ আনিসুল হক দলের স্বার্থের চেয়ে দেশের স্বার্থকে সর্বাগ্রে প্রাধান্য দিয়েছেন। অবৈধ বস্তি দখল, খাল দখল, রাস্তা দখল, বাস-ট্রাকের স্টপেজ দখলসহ নানাবিধ দুর্বৃত্তাচারীদের কবল থেকে শহরকে রক্ষা করে তিনি ঢাকাকে মানুষের বাসযোগ্য করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। মানুষের বাস অযোগ্য হতে বসা ঢাকাকে তিনি মানুষের বাসযোগ্য রাখতে সবুজ নগরীতে পরিণত করার প্রচেষ্টা আমৃত্যু করেছেন। মানুষের কল্যানকর এসব কর্ম যদি অপরাধ হয় তবে আনিসুল হক সাহবকে দোষী বলাই যায় !
আনিসুল হক যে তার দলের মধ্যে সুবিধাজনক অবস্থানে ছিলেন না তা নানাবিধভাবে প্রকাশ পেয়েছে। কেননা তিনি অবৈধ উচ্ছেদে যে সকল অভিযান পরিচালনা করেছেন কিংবা পরিচালনায় নেতৃত্ব দিয়েছেন তাতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সরকারী দলের উচ্চতর প্র্যায়ের বেশ কিছু রথী-মহারথীর স্বার্থ বেশি ক্ষুণœ হয়েছে। তাদের আয় কমেছে। তবুও জীবনের হুমকি জেনেও রাজধানীর মঙ্গলার্থের কোন কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে তিনি এতোটুকুন পিছপা হননি। নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তিনি ঢাকাবাসীর কল্যাণেনিরন্তর কাজ করে গেছেন। কাজেই দলের অভ্যন্তরে আনিসুল হক যে কারো কারো চোখের কাঁটা ছিলেন তা নির্ধারণ করতে খুব বেশি পন্ডিত হওয়ার দরকার বোধহয় একেবারেই নেই।
নানা ব্যস্ততার মাঝেও স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে গিয়ে আনিসুল হক স্বপ্ন বিলাতেন। মানুষ হওয়ার পথ বলতেন, বাবা-মায়ের মর্ম বোঝার প্রেরণা দিতেন। নীতি-আদর্শের ধারক-বাহক হওয়ার পরামর্শ দিতেন। সুখ-অসুখের ব্যবধান বোঝাতেন। যে মানুষটি ব্যবসা কিংবা শুধু রাজনীতির কাজে জড়িত থাকলে সেকেন্ডের কাঁটা ঘুর্ণণের সাথে সাথে অর্থ অর্জন করতে পারতেন সেই মানুষটি ঘন্টার পর ঘন্টা কিসের আশাতে বিভিন্ন সেমিনারে আকৃতিবান মানুষকে মননে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার মন্ত্র শোনাতেন ? গাঢ় স্বদেশ প্রেম না থাকলে কেউ এটা পারে না; যেটা আনিসুল পেরেছিলেন। এদেশের অনিসুল হক পদর্যমর্যাদার কিংবা তার চাইতে বহুগুন বেশি কর্তৃত্ববানদের অভাব নেই কিন্তু আরেকজন আনিসুল হকের বেশ অভাব ছিল। আজ আসল আনিসুল হকের বিদায়ে সে শুণ্যতা গভীরভাবেই জ্ঞানীদের উপলন্ধিতে আসবে। এরপরেও আনিসুল হকের নিন্দে করা যায় ! মুখ আর পঁচতে বসা মগজ থাকলে বহুকিছু বলা যায়। মৃত আনিসুল হক সম্পর্কে বহু কুৎসা রটানো যায়, যার সাথে আনিসুল হকের দূরতম সম্পর্কও থাকতে না। এটা আমরা পারি ! কেননা মানুষ হিসেবে যেমন মানুষ হওয়ার প্রেরণা আনিসুল হক কিংবা হক’রা বিলাতেন তেমন মানুষ আমরা আজও হতে পারিনি। আদৌ পারবো কিনা তাতেও সন্দেহে। কেননা নোংরামীর গভীরতা আমাদের চিত্তের সবটা জুড়েই বাসা বেঁধেছে।