হঠাৎ কেন যুক্তফ্রন্ট?

376

বদরুল আলম মজুমদার ::

হঠাৎ করেই আত্মপ্রকাশ করা চার দলের সমন্বয়ে ‘যুক্তফ্রন্ট’ নিয়ে রাজনীতিতে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। গত সোমবার রাতে রাজনীতিক আ স ম আবদুর রবের উত্তরার বাসায় এ জোট আত্মপ্রকাশ করে। জোটে রয়েছে বিকল্পধারা, নাগরিক ঐক্য, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ও জেএসডি। আনুষ্ঠানিকভাবে তা গণমাধ্যমকে জানানোও হয়। কিন্তু হঠাৎ করেই এমন একটি জোট গঠনের উদ্দেশ্য নিয়ে নানা মহলে নানা মত প্রকাশ পাচ্ছে।

ইতোমধ্যেই বিকল্পধারা বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত নতুন জোট যুক্তফ্রন্টকে স্বাগত জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। গতকাল রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, নতুন এই জোটকে স্বাগত জানাই। এতে গণতন্ত্রের সৌন্দর্য বাড়বে। নির্বাচনকে সামনে রেখে এমন অনেক মেরুকরণ হবে। তবে দলীয় সূত্রগুলো বলছে, দলের পক্ষ থেকে জোটের ওপর নজর রাখা হচ্ছে। এই মুহূর্তে এই জোটকে অতটা গুরুত্ব দিচ্ছে না তারা। গতকাল পর্যন্ত বিএনপি এ জোটকে নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেয়নি। দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সম্মতি ছাড়া দলীয় নেতারা এ নিয়ে কোনো কথা বলতে নারাজ বলে জানিয়েছে দলীয় সূত্র। তবে জোট গঠনের পর সোমবার রাতেই দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর টেলিফোনে বি চৌধুরী ও মান্নাকে স্বাগত জানিয়েছেন।

অবশ্য ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপির যুক্তফ্রন্ট নিয়ে আগ্রহ বেশি। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনী রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এ জোটের আত্মপ্রকাশ সময়ের দাবি বলেই মনে করছে দলটি। তবে বিএনপির একটি অংশ এমনও মনে করছে, এই জোট আসন্ন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে প্রার্থী দিতে পারে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের এক শীর্ষ নেতা বলেন, উত্তর সিটি করপোরেশনের বিগত নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের দুই নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না ও মাহী বি চৌধুরী নির্বাচন করতে চেয়েও শেষ পর্যন্ত বিএনপির সমর্থন আদায় করতে ব্যর্থ হন। এ নিয়ে নবগঠিত যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান ও বিকল্পধারার সভাপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরী অনেকটাই বিরক্ত ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসনের ওপর। উত্তরের মেয়র পদটি শূন্য হওয়ায় এবার নির্বাচনের সুযোগ কাজে লাগাতেই হঠাৎ করে এমন জোট কি না এমন প্রশ্নও বিএনপির মধ্যে উঠেছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, নতুন গঠিত ফ্রন্টের নেতারা দীর্ঘদিন থেকেই একটি জোট গঠনের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। সোমবার তারা এ লক্ষ্যে একটি ফ্রন্ট গঠন করেছেন। এটি অবশ্যই একটি ভালো দিক। বিএনপির বাইরে বর্তমান সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করার জন্য নতুন ফ্রন্ট কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করি। ফ্রন্টের দলগুলোর পক্ষ থেকে ডিএনসিসি নির্বাচনে প্রার্থী দিলে বিএনপির করণীয় কি হবে বা ছাড় দেবে কি না এমন প্রশ্নের সরাসরি কোনো জবাব না দিয়ে তিনি বলেন, সময় এলেই বিষয়গুলো পরিষ্কার হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতিটি রাজনৈতিক জোটের পেছনে উদ্দেশ্য থাকে। এই জোটও হয়তো ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থী দিতে পারে। যেহেতু জোটের দুইজন নেতা গতবারই মেয়র পদে নির্বাচনের আলোচনায় ছিলেন ও শেষ পর্যন্ত একজন প্রার্থী নির্বাচনের মাঠেও ছিলেন। কিন্তু বিএনপি নিজেদের প্রার্থী নিয়ে এগুতে থাকায় সেটি আর হয়ে ওঠেনি।

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নতুন গঠিত এ জোট বিএনপির সঙ্গে একটি সমঝোতার চেষ্টা করতে পারে বলেও বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তাদের মতে, বিএনপিও এ সময়ে এসে তাদের সমমনা দলগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে যাবে বলেই মনে হয়। সে ক্ষেত্রে প্রার্থী বিবেচনায় জোটকে সুযোগও দিতে পারে। এমন বিবেচনা থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। দেখার বিষয় বিএনপি তাদের প্রতিষ্ঠিত প্রার্থীকে বাদ দিয়ে জোটের মুখী হয় কি না।

গত সোমবার জোট গঠনের পরপরই জোট নেতারা তাদের উদ্দেশ্যের কথা বলেছেন। এ সময় নেতারা গণমাধ্যমকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই এমন জোট গঠনের চেষ্টা চলছিল। এই জোট চারদলীয় বা পাঁচদলীয় কোনো জোট হবে না। যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, যারা জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনে বিশ্বাস করেন, তাদের সবাইকে আমরা আহ্বান করব। সবার জন্য এই জোটের দুয়ার খোলা। এটা কোনো লিমিটেড দলের জোট নয়। দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের স্বার্থে জোট করেছি। যেন গ্রামের মানুষের উন্নয়ন হয়, তারা যেন খেতে পায়, পরতে পারে, গণতন্ত্র গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত হয় ও দেশ যেন সত্যিকার অর্থে একটি শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ হয়, এটাই আমাদের টার্গেট।

জোট গঠনের পেছনে নানা আলোচনা চলে আসায় গতকাল এ নিয়ে কথা হয় নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার সঙ্গে। তিনি প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, অনেকে অনেক কথা বলতে পারে। আমরা সাত বছর ধরে চেষ্টা করেছি। শুধু একটি বা দুটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে জোট হয়নি। আর আমরা জোট থেকে উত্তরে মেয়র পদে প্রার্থী দেব কি না—এখনই সেটা বলার সময় আসেনি। ঠিক সেভাবে চিন্তাও করা হয়নি।