ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পেলো সিলেটের শীতলপাটি

20

নুরুল হক শিপু ::

মঙ্গল শোভাযাত্রা, বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের পর এবার জাতিসংঘের স্বীকৃতি পেলো সিলেটের ঐতিহ্যবাহী বুননশিল্প কর্ম শীতলপাটি। গতকাল বুধবার সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, শীতলপাটিকে বিশ্ব নির্বস্তুক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় যুক্ত করে ইউনেস্কো। সিলেটের ঐতিহ্যের সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত শীতলপাটি। আর শীতলপাটির এমন স্বীকৃতির খবরে আনন্দের জোয়ার বইছে গোটা সিলেট জুড়ে। জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী দুপুরে বলেন, ‘বাংলাদেশ সময় দুপুর ১টা ৩২ মিনিটে ইউনেস্কো এ স্বীকৃতি দেয়।’
অ আ ক খ। জাতির পিতাসহ বরেণ্য ব্যক্তিদের প্রতিচ্ছবি। পাখি, ফুল, লতাপাতা, জ্যামিতিক নকশা, মসজিদ, মন্দির, চাঁদ, তারা, পৌরাণিক কাহিনীচিত্র, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, শহিদমিনার, শাপলা, পদ্ম; কী নেইÑসিলেটের ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটিতে। সুযোগ আছে প্রিয়জনের নাম লেখার। সিলেটের ঐহিত্যবাহী শীতলপাটিতে রয়েছে এ রকম নানা বৈচিত্র্য।
সিলেটের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধিরাও এমন খবরে আনন্দ প্রকাশ করেছেন। তারা বলেন, বর্তমান সরকারের সফলতার আরেকটি পালক শীতলপাটির এমন স্বীকৃতি। শীতলপাটি ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পাওয়ায় এ শিল্পের সাথে জড়িতদের জীবনমান উন্নয়নে সরকারের কাজ করে যাওয়া উচিত।
জানা গেছে, শীতলপাটি সিলেটের ঐতিহ্যবাহী একটি শিল্প। সিলেটের বালাগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার মূলত এ শিল্পের আদিস্থান। এ ছাড়া সিলেটের গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ, জগন্নাথপুর ও হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলায় দুই শতাধিক গ্রামে পাটি বুনন ঐতিহ্যবাহী কাজ।
সিলেট অঞ্চলে বিয়ের অনুষ্ঠানে উপঢৌকন হিসেবে বর-কনেকে পাটি দেওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। গ্রীষ্মকালে বেড়ে যায় শীতলপাটির কদর। পাটির সঙ্গে ‘শীতল’ নামকরণের মাহাত্ম্য এখানেই। শহুরে গৃহসজ্জায়ও ব্যবহৃত হয় শীতলপাটি। চাহিদা আছে বিদেশেও।
সিলেট অঞ্চলে কারুকাজভেদে শীতলপাটির রয়েছে আকর্ষনীয় নাম। এর মধ্যে পয়সা, সিকি, শাপলা, সোনামুড়ি, টিক্কা, লালগালিচা, আধুলি, মিহি উল্লেখযোগ্য। এগুলো বিক্রি হয় ৩০০ থেকে দুই হাজার টাকায়।
শীতলপাটির মূল উপাদান হচ্ছে মুরতা। বেতজাতীয় গাছ মুরতা দিয়েই তৈরি হয় শীতলপাটি। শুষ্ক মৌসুমে রোপণ করা এই বেত পরিপক্ব হলে বর্ষার পানিতে ভিজিয়ে পাটি তৈরির উপযোগী বেতে রূপ দেওয়া হয়। এরপর চলে পাটি বুননকর্ম। এ কাজ সাধারণত কৃষক পরিবারের গৃহিণীরাই করেন। সিলেটে বন বিভাগের বেশ কয়েকটি মুরতা বেতের বাগান ‘সৃজন’ করেছে। এগুলোর বেশির ভাগ গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায়।
সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চলে এখনো পাটি তৈরি করে অনেক বুননশিল্পীর সংসার চলে। শুধু সংসার চালানোর জন্যই বুনন শিল্পীরা শীতল পাটি বুনন করেন এমন নয়; সিলেটের ঐতিহ্য ধরে রাখতেই এ নেশাকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন বুনন জাদুকরেরা।
যুগ যুগ থেকে চলে আসা এ ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছেন বুননশিল্পীরা। কেউ কেউ বাপ দাদার এ পেশায় জীবন পার করছেন। সিলেটের সেই ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটি বুননশিল্প এখন ইউনেস্কোর বিশ্ব নির্বস্তুক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় যুক্ত হয়েছে।
জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী গ্যালারিতে চলছে বুননকৌশল। সিলেটের চারজন বুননশিল্পী শীতলপাটির নৈপুণ্য দেখাতে সেখানে ব্যস্ত। সিলেটের শীতলপাটি নিয়ে সেখানে হচ্ছে প্রদর্শনী। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর এই প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে। তা চলবে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত। সময় হাতে থাকতেই স্বীকৃতিপ্রাপ্তির খেতাব পেল সিলেটের ঐতিহ্যের অন্যতম এ বুননশিল্প। এমন স্বীকৃতিতে অভিভূত সিলেটের বিশিষ্টজন থেকে শুরু করে সর্বমহল।
প্রবীণ রাজনীতিবিদ জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল্লাহ সিদ্দিকী বলেন, ‘সিলেট শীতলপাটি বলতে হয় মৃত্যুপথযাত্রী। যথেষ্ট পৃষ্টপোষকতার অভাবে এ শিল্প আজ বিলিন হওয়া পথে। আজ এ স্বীকৃতি আমাদের বুননশিল্পীদের অর্জন। বুননশিল্পীরা আমাদের সম্পদ। এদের পাশে সরকারকে দাঁড়াতে হবে। স্বীকৃতি নিয়ে বসে থাকলে শিল্প বাঁচানো সম্ভব হয়।’
বুননশিল্পীদের এ র্জনকে সাধুবাদ জানিয়েছেন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘যুগ যুগ থেকে চলে আসা সিলেটের শীতলপাটি বুনন আমাদের ঐতিহ্যের অন্যতন এক ধারক। এ ঐতিহ্যকে আমাদেরকে ধরে রাখতে হবে। এজন্য বুননশিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতা করা প্রয়োজন। তাঁদের জীবনমানের উন্নয়নের দিকে সরকার গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, একটি ঐতিহ্য আজ বিশ্ববাসীর কাছে সিলেটকে নিয়ে উল্লেখ করে বলেন, সরকারের কাছে আমার দাবি শীতলপাটির ঐতিহ্য ধরে রাখতে বুননশিল্পীদের যথেষ্ট অর্থায়ন করুন। বুননশিল্পীরা আমাদের অহংকার।’
সিলেট-হবিগঞ্জের নারী সাংসদ অ্যাডভোকেট আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী বলেন, ‘এ স্বীকৃতি আমাদের গর্বের। স্বীকৃতিটা আমরা অনেক আগে পাওয়া উচিত ছিল। যাই হোক অনেক পরে হলেও আমরা আমাদের ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পেয়েছি। কেয়া চৌধুরী বলেন, আমরা বিশ্ব স্বীকৃতি পাওয়ার পর আমরাদের ঐতিহ্যেকে গুরুত্ব দেই। কিন্তু আমার ঘরের পাশে বলে যে বাবা-মা, ভাই-বোন ঐতিহ্যকে ফুটিয়ে তুলেন তাঁদের খবর কেন নেই না। সেক্ষেত্রে আমাদের আরো বেশি ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। পাশাপাশি আমাদের এ ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে নতুন নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত।’
মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদ বলেন, প্রথমে একজন বাঙালি হিসেবে আমি গর্বিত। দ্বিতীয়তে একজন সিলেটি হিসেবে আজ নিজেকে অনেক বড় মনে হচ্ছে। আর এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, সিলেটের বুনন জাদুকরেরা। তাঁদের নৈপণ্যে আজ আমরা বিশ্ববাসীর সামনে যেতে পারলাম। তিনি বলেন, ইউনেস্কোর এ স্বীকৃতি আমাদের পাওয়ার। বিশ্বের কোথাও এমন শিল্প আবিষ্কার হয়েছে বলে মনে হয় না। তিনি বলেন, এখনো সময় আছে শীতলপাটি বুনন কারিগরদের পাশে সরকারের পাশাপাশি আমাদের সচেতন সহলকে দাঁড়াতে হবে। এ শিল্প আমাদের গৌরবের আমাদের অহংকারের শিল্প।’
এক প্রতিক্রিয়ায় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক জফির সেতু বলেন, ‘হাজার-দুই হাজার বছর আগে থেকেই উত্তর-পূর্ব ভারতের শিল্প অর্থনীতি ও সংস্কৃতির কেন্দ্র ছিল সিলেট। এর অন্যতন কারণ হচ্ছে সিলেটের ভৌগলিক স্বাতন্ত্র। সিলেট অঞ্চলেই আমরা হাতির দাঁতের রপ্তানির মতো অর্থনৈতিক কর্মকান্ড যেমন দেখি একইভাবে প্রচুর বনজসম্পদে সমৃদ্ধ এই অঞ্চলের (মুর্তাবেত) জাতীয় এক ধরণের লতা জাতিয় গাছ থেকে অসাধারণ শিল্পনৈপুণ্যে তৈরি শীতলপাটিও ভারতবর্ষ শুধু নয়; গোটা পৃথিবীতে রপ্তানি হতে দেখি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য; আধুনিক শিল্পায়নের ফলে মানুষের সৃষ্টি ও মনন ধারা নির্মিত নান্দনিক সে-সব পাটি জাতীয় পণ্য আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। এই বিলুপ্তি শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মতো অর্থনৈতিক কর্মকান্ডেরই ক্ষতি হয়নি বরং ক্ষতি হয়েছে মানুষের কৃষ্টি ও নান্দনিক শিল্পবোধেরও। এরকম পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের ইউনেস্কো সিলেটের এই ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটিকে যে স্বীকৃতি দিয়েছে, সেজন্য ইউনেস্কোকে ধন্যবাদ জানাতে হয়। এর মাধ্যমে বিশ্ব সভ্যতায় সিলেটের গৌরবের একটি ঐতিহ্য যুক্ত হলো। যা সত্যিই আনন্দের।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘ইউনেস্কোর এ স্বীকৃতিতে আমরা আনন্দিত। তবে স্বীকৃতি নিয়ে বসে থাকলে হবে না-এ শিল্পকে আরো মানসম্পন্ন করতে সরকারকে পর্যাপ্ত অর্থায়ন করতে হবে। পাশাপাশি বুননশিল্পীদের জীবন মানের উন্নয়নে কাজ করতে হবে।’
জানা গেছে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজের উপাদান সংশ্লিষ্ট দেশের আবেদনের প্রেক্ষিতে যাচাই-বাছাই ও সুনির্দিষ্ট করে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে তুলে ধরার কাজ করে ইউনেস্কো। আন্তর্জাতিক সংস্থাটির স্বীকৃতি লাভের মধ্য দিয়ে দেশ ওই উপাদানের আঁতুড়ঘর হিসেবে বিশ্ব দরবারে সুপ্রতিষ্ঠি হয়, মর্যাদা লাভ করে। এ সংক্রান্ত সনদে স্বাক্ষর করা সব দেশ প্রতি বছর নিজেদের যে কোন একটি উপাদানের স্বীকৃতি চেয়ে ইউনেস্কোতে আবেদন করতে পারে। এ বছর ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটির স্বীকৃতি চেয়ে আবেদন করে বাংলাদেশ।