যৌক্তিকতা দেখছেন না বিশ্লেষকরা : আবার আলোচনায় আগাম নির্বাচন

10

প্রতীক ইজাজ ::

রাজনীতিতে আবার আগাম জাতীয় নির্বাচনের আলোচনা শুরু হয়েছে। কয়েকদিন ধরেই আলোচনায় বিষয়টি নানাভাবে আসছে। গত ২৮ নভেম্বর মঙ্গলবার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সভাপতির ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক অনানুষ্ঠানিক বৈঠক থেকেই খবরটি চাউর হয়। সেখানে আগাম নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়েছে—এমন তথ্য গণমাধ্যমে এলে তা নিয়ে বেশ সরব হয়ে পড়ে রাজনীতি। পরদিন বুধবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদার ‘আগাম নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত ইসি’—এমন বক্তব্যে আরো গতি পায় এ আলোচনায়। এর পরপরই শুরু হওয়া আগাম নির্বাচনের বিষয়টি এখন পর্যন্ত আলোচিত রাজনীতিতে।

এ নিয়ে গত সপ্তাহজুড়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও সংসদের বাইরে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির শীর্ষ নেতারা যেমন পক্ষে-বিপক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন; তেমনি আগাম নির্বাচনের যৌক্তিকতা নিয়ে নানা আলোচনা চলছে বিভিন্ন মহলে। কারণ, নিয়মানুযায়ী নির্বাচনের এখনো এক বছর বাকি। সেখানে হঠাৎ করে আবার কেন আগাম নির্বাচন প্রসঙ্গ এবং এর যৌক্তিকতা ও সত্যতাইবা কতটুকু—এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে চারদিকে।

আগাম নির্বাচনের ইসি প্রস্তুত—সিইসির এমন বক্তব্যের পর আওয়ামী লীগ ও বিএনপিরও প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানিয়েছিলেন দল দুটির নীতিনির্ধারকরা। আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি থাকলেও এতে অংশগ্রহণে শর্ত রয়েছে বলে জানিয়েছে বিএনপি। তবে সর্বশেষ গতকাল আগাম নির্বাচনের খবর নেহাতই গুঞ্জন বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণের দায়িত্ব হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের। আগাম নির্বাচন নিয়ে যে জল্পনা-কল্পনা চলছে, এটা গুঞ্জন, নেহাতই গুঞ্জন। এর কোনো ভিত্তি নেই। তবে আওয়ামী লীগ চায়, বিজয়ের মাসে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক।

তার পরও আগাম নির্বাচন নিয়ে আলোচনা চলছেই। এর আগে গত বছরের মাঝামাঝিতেও একবার আগাম নির্বাচনের খবর আলোচনায় এসেছিল। সে বছরের ২৬ জুলাই আওয়ামী লীগের সংসদীয় কমিটির বৈঠকে আগাম নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়েছে—এমন খবর গণমাধ্যমে এলে তখনো নানা আলোচনা ঘুরপাক খায়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সরকার আলাদা কোনো কৌশলে যাচ্ছে কি না, মানুষের মধ্যে যেমন এ নিয়ে কৌতূহল, তেমনি মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়েও দেখা দিয়েছিল ব্যাপক আগ্রহ। এখন প্রায় দেড় বছর পর আবার রাজনৈতিক অঙ্গনে আগাম জাতীয় নির্বাচনের বিষয়টি উঠে আসায় এ নিয়ে শুরু হয়েছে আরেক দফা আলোচনা। নির্বাচন কি আসন্ন—উঠছে এমন প্রশ্নও। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এমন নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত, এমন খবরের সূত্র ধরে দুই দলেই নির্বাচনের পক্ষে-বিপক্ষে নানা হিসাব-নিকাশ রয়েছে বলেও জানা গেছে। এ নিয়ে নানা মত দিচ্ছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও। তাদের মতে, বারবার যেভাবে আগাম নির্বাচনের প্রসঙ্গ উঠছে, তার এখন পর্যন্ত কোনো যৌক্তিকতা মেলেনি। নিছক একটি রাজনৈতিক ইস্যু তৈরি করে রাজনীতিকে কিছুদিন সরব রাখার পুরোনো রেয়াজও হতে পারে। এমনও হতে পারে সব রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনমুখী করতেই এমন প্রসঙ্গ তোলা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, আগাম নির্বাচনের কোনো সম্ভাবনা নেই। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও নেই। বিশেষ করে এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি যে এই মুহূর্তে সরকার আগাম নির্বাচন দেবে। সাধারণ আগাম বা মধ্যবর্তীকালীন নির্বাচনের প্রয়োজন তখনই পড়ে, যখন বিরোধী দল বা কোনো পক্ষের চাপ থাকে। ২০১৫ সালের দিকে এমন পরিস্থিতি কিছুটা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এখন নেই। সংসদের বাইরে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির আগাম নির্বাচন নিয়ে কোনো চাপ নেই। এমনকি এ ধরনের নির্বাচনের ব্যাপারে তারা প্রস্তুত কি না—তাও সন্দেহ আছে। আবার সরকার বা আওয়ামী লীগ কোনো বিশেষ সুবিধা নিতে আগাম নির্বাচন দেবে, সে অবস্থাও নেই।

তাহলে বিষয়টি কিছুদিন পরপরই আলোচনায় আসছে কেন—জানতে চাইলে এই বিশ্লেষক বলেন, রাজনীতিতে একটি রেয়াজ আছে, কোনো ইস্যু না থাকলে একটি ইস্যু তৈরি করে রাজনীতিকে উত্তপ্ত রাখা হয়। তেমনটিও হতে পারে। কিংবা এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া কী—সেটাও দেখতে চায়। আগাম নির্বাচনের ব্যাপারে আওয়ামী লীগের মধ্যে দুই ধরনের মত পাওয়া গেছে। বিপক্ষে মত দিয়ে একপক্ষ বলছে, আগামী বছরের এপ্রিলে বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন দিতে হবে সরকারকে। সে বছরের জানুয়ারির শেষে পুলিশপ্রধানের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। নতুন আইজিপি নিয়োগ দিতে হবে। ওই সময় স্বাভাবিকভাবেই পুলিশ প্রশাসনের উচ্চপদেও বেশ কিছু রদবদল আসবে। আগামী নির্বাচনের আগে পরবর্তী জুন-জুলাই মাসে একটি নির্বাচনমুখী বাজেট দেওয়ার ইচ্ছা আছে সরকারের। নির্বাচনের সময় জনবান্ধব ওই বাজেটের সুফল ঘরে তুলতে চায় ক্ষমতাসীনরা। তা ছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে কোন্দল রয়েছে। কোন্দল মেটাতে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকরা কাজ করছেন। ২০১৮ সালের শেষে দৃশ্যমান হবে পদ্মা সেতু। আগামী নির্বাচনের আগে পদ্মা সেতু প্রকল্প উদ্বোধনের ইচ্ছা থাকলেও নানাবিধ জটিলতায় তা হয়তো হয়ে উঠবে না। কিন্তু পদ্মা সেতুর মূল অবকাঠামো দৃশ্যমান হয়ে উঠবে আগামী বছরের শেষে। দক্ষিণবঙ্গের ভোটারদের ভোট টানতে পদ্মা সেতুকেও কাজে লাগাতে চায় আওয়ামী লীগ। অর্থাৎ সব হিসাব মিলিয়ে আগাম নির্বাচন নয়, নির্ধারিত সময়েই নির্বাচনের পক্ষে শাসক দল।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘আগাম নির্বাচনের কোনো আলোচনা কিংবা খবর আমার জানা নেই। আমাদের দলের কোনো ফোরামেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়নি। সংবিধান অনুযায়ী যথাসময়েই নির্বাচন হবে।’

অন্যপক্ষ আগাম নির্বাচনের পক্ষে যুক্তি তুলে বলছে, বর্তমানে আওয়ামী লীগের বিপরীতে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থা দুর্বল। তাই বিএনপি সাংগঠনিকভাবে গুছিয়ে ওঠার আগেই নির্বাচন সম্পন্ন করলে আওয়ামী লীগ ঘরে ভালো ফলাফল নিয়ে আসতে পারবে। মার্চ ও ডিসেম্বরে মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বেশি সক্রিয় থাকে। সেই সেন্টিমেন্টকে ধারণ এবং কাজে লাগিয়ে নির্বাচনী মাঠে সফল হওয়া আওয়ামী লীগের জন্য কিছুটা শাপেবর হতে পারে। তা ছাড়া নির্ধারিত সময়ে জাতীয় নির্বাচনের আগেই আসন্ন রংপুর ছাড়াও আরো ছয়টি সিটি করপোরেশন নির্বাচন সম্পন্ন করতে নির্বাচন কমিশনের রোডম্যাপ রয়েছে। কিন্তু কোনো কারণে যদি সিটি নির্বাচনে সরকারি দলের ঘরে কাঙ্ক্ষিত ফল না আসে সেটি জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে। সে ক্ষেত্রে যদি কোনো কারণে জয়ের পাল্লা বিএনপির দিকে ভারী হয়ে যায় তাহলে দেশজুড়ে সাধারণ ভোটারদের কাছে ভিন্ন বার্তা যাবে। আবার সিটি করপোরেশন নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করা নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কেননা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইসির ভূমিকা বিতর্কিত হয়ে পড়লে এই কমিশনের অধীনে জাতীয় নির্বাচন করা নিয়ে পরিস্থিতি ভিন্নদিকে মোড় নিতে পারে।

তাহলে প্রসঙ্গটি বারবার আসছে কেন—জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ক্ষমতাসীন দলের উচ্চপর্যায়ের দুই নেতা বলেন, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনারের আগাম নির্বাচন-সংক্রান্ত বক্তব্যের পর আমাদের দল থেকেও এ বিষয়ে কিছুটা ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করা হয়। এটা আসলে একটা রাজনৈতিক ইস্যু বা গেম। এর মধ্য দিয়ে বিএনপিসহ অন্যান্য দলের নির্বাচন প্রস্তুতির বিষয়ে একটা ধারণা পাওয়া গেছে।’ ক্ষমতাসীন দলের ওই নেতারা আরো বলেন, আগাম নির্বাচনের ইস্যুটা আরো কিছুদিন মাঠে থাকা দরকার। এর ফলে বিএনপির সাংগঠনিক স্থবিরতা ও নির্বাচনী প্রস্তুতির ফাঁকফোঁকর সম্পর্কে দেশবাসী জানতে পারবে।

তবে বিএনপি সূত্রগুলো বলছে, মাঠের প্রস্তুতি যা-ই থাকুক না কেন, প্রকাশ্যে দলটির নেতারা বলছেন, তারাও আগাম নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান বলেন, নির্বাচন যখনই হোক বিএনপি প্রস্তুত। এটা আগাম হোক বা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হোক; তবে সে নির্বাচন হতে হবে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে। কোনো দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন যে সুষ্ঠু হয় না, বিগত স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোয় এবং ৫ জানুয়ারির দশম সংসদ নির্বাচনে তার প্রমাণ দেশের মানুষ পেয়েছে। আশা করি, আগামী নির্বাচন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে হবে।

নিয়ম অনুযায়ী, বর্তমান সরকারের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হবে শপথ নেওয়ার দিন, অর্থাৎ ২০১৯ সালের ১০ জানুয়ারি। সে ক্ষেত্রে ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের জানুয়ারির মধ্যে যেকোনো দিন পরবর্তী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। তবে সরকারি দলের দু-একটি সূত্র জানিয়েছে, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে একাদশ সংসদ নির্বাচনের পক্ষে আওয়ামী লীগের অনেকেই। গতকাল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও এমন ইচ্ছে পোষণ করেছেন।