কোচিং বাণিজ্য এবং…

24

পত্রিকার পাতায় শিরোনাম হয়ে এসেছে—‘দেশজুড়ে চলছে রমরমা কোচিং বাণিজ্য’। বাণিজ্যটি যে অনৈতিক তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, কোন বাণিজ্য বাংলাদেশে অনৈতিক এবং রমরমা নয়! এমন একটি বাণিজ্যকে খুঁজে পাওয়া খুবই কষ্টকর। একেবারে যে নেই তাও বলা যাবে না। কিন্তু অনৈতিকতার চাপে নৈতিকতা এমন এক অবস্থায় উপনীত হয়েছে যে, তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

সময় বদলেছে। আমরা এখন করপোরেট বাণিজ্য যুগে বসবাস করি। ইমোশন এখানে মূল্যহীন। নৈতিকতার দ্বীপচালান হয়েছে। মানবিক মূল্যবোধকে বিসর্জন দিয়ে সবাই যেন রকেটগতিতে ছুটছি এমন এক সোনার হরিণের পেছনে—মানবিক জীবনে যার কোনো মূল্য নেই। তবে অসুস্থ, অকার্যকর ও অনৈতিক সমাজব্যবস্থায় এরাই নায়ক এবং মহানায়ক।

আমরা এমন একটি সমাজব্যবস্থার অধীনে বসবাস করছি, যে সমাজব্যবস্থা আপাদমস্তক ক্যানসারে আক্রান্ত। দেহের এমন কোনো অঙ্গ নেই যে, সে এই দুরারোগ্য ব্যাধির আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে। দুর্বৃত্ত পুঁজির দুর্বৃত্তায়নের যুগে এখান থেকে বেরিয়ে আসাটা যেমন কঠিন, একইভাবে সহজও বটে। সভ্যতার ইতিহাস আমাদের সে কথাই বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।

অসুস্থ বৃক্ষকে সুস্থ করে তোলার জন্য আমরা গাছের গোড়া কেটে মাথায় পানি ঢেলে বৃক্ষটিকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছি। যদিও এই পথ্যপত্র ইতোমধ্যেই পরিত্যাজ্য বলে বিবেচিত হয়েছে। তবুও আমরা আফিম বাগানে, আফিম বাতাসে, আফিম গ্রহণের মাঝে আমাদের সবকিছু বিলিয়ে দিয়ে বেঁচে থাকাকেই শ্রেয় বলে মনে করছি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে সরে এসে আজ আমরা ভোগবাদী সমাজব্যবস্থার মহাসড়কে পা রেখে বলছি, ‘আহ্ কি সুন্দর!’ অথচ আমরা জানতেও পারিনি যে, নিজের অজ্ঞাতেই আমরা কখন যেন করপোরেট পুঁজির সেবাদাসে পরিণত হয়ে এক মাদকাসক্তের মতো পেছনের দিকে এগিয়ে চলেছি।

পত্রিকা বলছে, দেশজুড়ে দুই লাখ কোচিং সেন্টার। শিক্ষাব্যয়ের এক-তৃতীয়াংশ বহন করতে হচ্ছে পরিবারকে। কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করার লক্ষ্যে সাড়ে ছয়শ শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে সরকার। বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে শিক্ষা আইনেও পরিবর্তন আনার কথা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু লাভটা কী! এদেশে লাভের গুড় সবসময় পিঁপড়ায় খেয়ে গেছে। এবারও যে তার ব্যতিক্রম হবে না; গ্যারান্টি কোথায়!

তাই আমরা মনে করি, রোগাক্রান্ত সমাজকে সুস্থ করে তুলতে হলে প্রথমেই গাছের গোড়া কাটা বন্ধ ও গোড়াতে পানি ঢালার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। আর এজন্য প্রয়োজন একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লব। প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ এক বলিষ্ঠ সরকারের ইতিবাচক নেতৃত্ব।