ফিরে দেখা ২০১৭ : বিএনপির প্রাপ্তি যৎসামান্যই

91

রাজপথের আন্দোলনসহ সাংগঠনিক কার্যক্রমে ২০১৭ সাল জুড়ে সব কিছুতেই নিরুত্তাপ ছিলো বিএনপি। বছরের শুরুতে মাঠ পর্যায়ের রাজনীতি সক্রিয় করতে না পারলেও শেষ দিকে তা অনেকটা চাঙ্গা হয়। চিকিৎসার জন্য দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া সাড়ে ৩ মাস লন্ডন অবস্থানসহ তার মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা আর দুর্নীতির মামলায় আদালতে নিয়মিত হাজিরা ছিলো। এর বাইরে লন্ডৃন থেকে দেশে ফেরার দিন দলের নেতাকর্মীদের সংবর্ধনার শোডাউন, কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ আর বিজয় দিবসের র‌্যালীর মাধ্যমে নেতাকর্মীদের মনোবলকে চাঙ্গা রাখার কৌশল নেয় দলটি।

এছাড়া দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার বেশ কয়েকটি কর্মসূচি গ্রহণ করলেও তা চলেছে শম্ভুক গতিতে। এর মধ্যে সারাদেশে সিনিয়র নেতাদের সমন্বয়ে সাংগঠনিক সফর, কর্মী সভা আর সদস্য সংগ্রহ অভিযান চালায় বিএনপি। বছরের শুরুতে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জয়লাভের মধ্য দিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে দলের শক্ত অবস্থান জানান দিলেও বছর শেষে রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভরাডুবি ঘটে দলীয় প্রার্থীর।

২০১৬ সালের পদাঙ্ক অনুসরন করে ২০১৭ সালও সাংগঠনিক বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছিল বিএনপি। দল ও এর অঙ্গ সংগঠনকে ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই তারা যাত্রা শুরু করে। কিন্তু বছর শেষে প্রাপ্তি যৎসামান্য। এখনো মেয়াদোত্তীর্ণ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনকে পূনর্গঠন করতে পারেনি দলটি। সারাদেশের জেলা কমিটি গঠনের নামেও সৃষ্টি হয়েছে নানা জটিলতা। প্রায় ২০টি জেলা এখনো রয়েছে পূনর্গঠনের বাইরে। এছাড়া যে সকল জেলায় নতুন আংশিক কমিটি দেয়া হয়েছে তাও রয়েছে স্থিতিবস্থায়। এদিকে কোন্দলকে উস্কে দেয়া হয়েছে বলেও বিভিন্ন সময়ে নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেছেন।

বছরের শুরুতে যুবদলের সুপার ফাইভ কমিটিসহ ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ যুবদলের কমিটি ঘোষণা করেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ১৯ এপ্রিল ঢাকা মহানগরে নতুন নেতৃত্ব আনেন বিএনপি চেয়ারপারসন। প্রথমবারের মতো ঢাকা মহানগরকে ভেঙে দুটি কমিটি করা হয়। ২৪ এপ্রিল সরকারবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য তৃণমূল নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে সারা দেশে ৭৭টি সাংগঠনিক জেলায় কর্মীসভা করার জন্য বিএনপি ৫১টি দল গঠন করে। এ কৌশল সামনে রেখে দল গোছানো, সাংগঠনিকভাবে দলকে শক্তিশালী করা এবং এলাকায় দলের অবস্থান কতটুকু শক্তিশালী তা নিয়ে আলোচনা করতেই ৫১টি দল গঠন করা হয়। এসব দলের নেতারা ৭ মে পর্যন্ত জেলায় জেলায় কর্মিসভার পর একটি প্রতিবেদন তৈরি করে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কাছে তুলে দেয়ার পরামর্শ দেয়া হলেও শতভাগ সফল হতে পারেনি দলটি।

বছরের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনার মধ্যে রয়েছে ১০ মে বিএনপির ভিশন-২০৩০ নিয়ে খালেদা জিয়ার সংবাদ সম্মেলন। তার এই ভিশন রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ আলোচিত হয়। খালেদা জিয়ার বিএনপির ভিশন-২০৩০ তুলে ধরার দশদিন পর ২০ মে তার কার্যালয়ে তল্লাশী চালায় পুলিশ। রাষ্ট্র বিরোধী ও আইন শৃঙ্খলা পরিপন্থী নাশকতা সামগ্রীর খোঁজে পুলিশ গুলশানে বিএনপি নেত্রীর কার্যালয়ে অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে পুলিশের প্রাপ্তি শূন্য। পুলিশের এমন অভিযানে সারাদেশে সমালোচনার সৃষ্টি হয়।

১ জুলাই থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত দুই মাসব্যাপী সারা দেশে সদস্য সংগ্রহ অভিযান কর্মসূচি গ্রহন করে বিএনপি। এর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় এক কোটি। গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন চেয়ারপারসন। ১০টাকা মূল্যের এক কোটি ফরম পূরণ করে একদিকে সাংগঠনিক শক্ত ভিত্তি তৈরী করা আবার ১০ কোটি টাকা দলের আয়ের উৎস হিসেবেও এ কর্মসূচি নেয়া হয়। কিন্তু তিন দফায় সদস্য সংগ্রহ অভিযানের সময়সীমা বৃদ্ধি করেও টার্গেট পূরণ করতে পারেনি দায়িত্বশীল নেতারা। পুলিশের বাধা আর উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যার কারণে বাধার মুখে পড়ে বিএনপির এ সাংগঠনিক কর্মসূচি। বছর শেষে ৮০ লাখ সদস্য ফরম বিতরন করা হয়েছে বলে দলীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এদিকে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া চিকিৎসার জন্য লন্ডন গমনকে কেন্দ্র করে রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে বিএনপি। ওই সময়ে তার এই সফরে বিভিন্ন মহলে নানা সন্দেহ আর বিভ্রান্তির সৃষ্টি হলেও তিনি চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরেন।

লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পরপরই বেগম খালেদা জিয়া মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরনার্থীদের ক্যাম্প পরিদর্শন ও ত্রাণ বিতরণের জন্য কক্সবাজার যান। ২৮ অক্টোবর তিনি গুলশানের বাসভবন থেকে চট্টগামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। পথিমধ্যে ফেনী জেলা অতিক্রম করার সময়ে তার গাড়িবহরে দুর্বৃত্তরা হামলা চালিয়ে ২০টির মতো গাড়ি ভাঙচুর করে। এ হামলায় গণমাধ্যমের ৫টি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আহত হন ৬ জন সাংবাদিক। ২৯ অক্টোবর চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার যাওয়ার পথে নেতা-কর্মীদের ভিড় ঠেলে ও ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে কক্সবাজারে পৌঁছাতে বিএনপির চেয়ারপারসনের সময় লাগে প্রায় আট ঘণ্টা। ৪দিনের সফর শেষে ৩১ অক্টোবর কক্সবাজার থেকে ঢাকায় ফেরার পথে ফেনী জেলায় আবারো তার গাড়িবহরে হামলা চালানো হয়। এ সময়ে দূর্বৃত্তরা তার গাড়ি বহর ফেনী জেলা সার্কিট হাউজ অতিক্রম করার সময়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ২টি বাসে অগ্নিসংযোগ করে ও কয়েকটি পেট্রোল বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। তবে এতে কেউ হতাহত হয়নি। এর পরপরই স্থানীয় নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে খালেদা জিয়ার গাড়ি বহর ফেনী জেলা অতিক্রম করে।

বিমানবন্দরে নেতাকর্মীদের সরব উপস্থিতি আর কক্সবাজার যেতে পথে পথে নেতাকর্মীদের ঢল দলটির মধ্যে এক ধরনের চাঙ্গা ভাব ফিরে আসে। এই অবস্থাকে ধরে রাখার জন্য বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ১২ নভেম্বর সমাবেশ আয়োজন করে দলটি। এই সমাবেশ থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ঘোষণা করেন- প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাবে না বিএনপি। সমাবেশকে কেন্দ্র করে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের মাঝে নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। এই ধারাবাহিকতাকে ধরে রাখার জন্য মহান বিজয় উপলক্ষে রাজধানীতে ১৭ ডিসেম্বর এক বিজয় র‌্যালীর আয়োজন করে দলটি। দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে থেকে শুরু হয়ে এই বিজয় র‌্যালী মালিবাগ মোড় পর্যন্ত যাওয়ার পরও মিছিলের শেষ অংশটি ছিলো কাকরাইলে।

বছরের শেষ দিকে খালেদা জিয়ার ২টি মামলাই গতিশীল হয়ে ওঠে। প্রায় প্রত্যেক সপ্তাহেই রাজধানীর বিশেষ আদালতে তাকে একাধিকবার হাজিরা দিতে হচ্ছে। আদালতে তার হাজিরাকে কেন্দ্র করে প্রত্যেকদিনই শোডাউন করছে দলের সকল স্তরের নেতাকর্মীরা। এই শোডাউনকে কেন্দ্র করে দলের অনেক নেতাকর্মীকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

এ বছরেও বিএনপির অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে হারাতে হয়েছে। এর মধ্যে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ার, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক সংস্থাপন প্রতিমন্ত্রী নুরুল হুদা, সাবেক ডেপুটি স্পিকার ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মো. আখতার হামিদ সিদ্দীকীসহ হারুন অর রশিদ খান মুন্নু রয়েছেন।