ফোঁড়া কি টিউমারে রূপ নিতে যাচ্ছে ?

71

রাজু আহমেদ ::
আশঙ্কা করা হচ্ছে, উদ্বাস্তু শিবিরের সববৃহৎ স্থায়ী ঘাঁটিতে পরিণত হতে চলেছে বাংলাদেশ। ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশে মাত্র ৬-৭ লাখ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে বাংলাদেশীদের জনজীবন এককথায় বিপর্যস্ত। অর্থনীতি, খাদ্য এবং পরিবেশের নিরাপত্তাহীনতা সংকটে ভূগছে সমগ্র দেশ। নিত্য প্রয়োজনীয় চাল, পিঁয়াজসহ অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যাদির দাম বেড়েছে ২০-৫০ শতাংশ। রোহিঙ্গাদের নিয়ে যখন হিমশিমে গোটা রাষ্ট্রযন্ত্র তখন আসামে অবৈধ অধিবাসীদের যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে বাংলাদেশের জন্য বোধহয় দুঃসবাদ অপেক্ষা করছে। আসাম সরকার কর্তৃক প্রকাশিত ১ কোটি ৯০ লাখ অবৈধ বসবাসকারীর যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে তাতে বিপুল সংখ্যক বাঙালী ও বাংলাদেশী রয়েছে বলে খবরে প্রকাশ পেয়েছে। ক্রমশ কট্টর হিন্দুত্ববাদে প্রবেশ করতে থাকা ভারতের অন্যতম বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে শাসকদল বিজেপির তৎপরতায় আসাম থেকে বহিরাগত খেদাও আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে নিয়ত। যদিও রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন করে বিজেপি দোষ এড়িয়ে তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অবৈধ নাগরিকদের তালিকা প্রকাশ ও তাদের বের করে দেয়ার কার্যক্রম স্বয়ং আদালত কর্তৃক তদারকি হচ্ছে। মূলত এটা যে শাসকদলীয় জোটের চক্রান্ত তা প্রকাশ পেয়েছে ভারতের অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের বিবৃতি থেকে। কেননা প্রথম দিকে অবৈধ অধিবাসীর তালিকায় ২ কোটি ৩৮ লাখ মানুষের নাম থাকলেও কেমন করে সেটা অল্প দিনের ব্যবধানে ১ কোটি ৯০ লাখে নামলো? এছাড়াও কংগ্রেসের দু’জন বিধায়কের নামসহ আরও বেশ কিছু কংগ্রেসপন্থী রাজনীতিবিদদের নামও এ তালিকায় স্থান পেয়েছে। কাজেই হট্টগোল যে অত্যাসন্ন তা আন্দাজ করাই যায়।
বাংলাদেশের কূটনীতিতে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক মধুর হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। তবে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত বাংলাদেশের পাশে না দাঁড়িয়ে বরং উল্টো মায়ানমারের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সম্প্রতি আসামের নাগরিকদের নাগরিকত্বের ইস্যূ নিয়ে ভারতে যে কান্ড চলছে তা একান্তই তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার তবে সেখানে বাংলাদেশেরও শঙ্কিত হওয়ার পোক্ত রসদ আছে। কাজেই সময়টা বাংলাদেশেল পক্ষ থেকে কূটনৈতিক সাফল্য দেখানোর পরীক্ষার সময় হিসেবেই আবিভূর্ত হয়েছে। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশ কিংবা বাংলাদেশের জন্মলগ্নে ভারতের সাথে যে সুসম্পর্কের গল্প ইতিহাসের পাতা নির্ভর তা বাস্তবায়ন করে দেখানোর এটাই মোক্ষম সময়। গোটা ভারত জুড়ে শাসকদলের যে উদ্ভট হাঙ্গামার চিত্র নিয়ত প্রকাশ পাচ্ছে তাতে খুব সহজে আসাম সমস্যার সমাধান আশা করা যায় না। কাজেই বাংলাদেশের স্বার্থে ঢাকার সাথে দিল্লীর যোগাযোগ বাড়িয়ে নিজস্ব নিরাপত্তাটুকুর বিহীত করা আবশ্যক বোধহয়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে বিদেশী ষড়যন্ত্রের অন্ত নাই। সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে বিশেষ করে উখিয়ায় স্থানীয় নাগরিকদের চেয়ে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় শঙ্কাকে তো তো লুকিয়ে রাখা যাচ্ছে না। মায়ানমার যতো কথাই বলুক, ঘটা করে যতো চুক্তি করুক তারা যে সহজে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিচ্ছে না সেটা মোটামুটি নিশ্চিত। কেননা তাদের ইন্ধন দিতে রাশিয়া, চীন এবং ভারত উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছে। বাংলাদেশের কতিপয় বোদ্ধাজনও ধারণা করছেন, মাত্র কয়েক মাসে বাংলাদেশ সীমান্তে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের কয়েক যুগেও তাদের জন্মভূমে ফেরৎ পাঠানো সম্ভব হবে না। যারা দেশ থেকে তাদের নাগরিকদের হত্যা, খুন করে এবং মৃত্যু ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছে তাদেরকে খুব সহজে মায়ানমার ফিরিয়ে নিবে এটা বোকাদের অভিধানে বিশ্বাসয্গ্যো হতে পারে। কাজেই রোহিঙ্গাদেরকে যে বাংলাদেশীদের ফোঁড়া হিসেবে যুগের পর যুগ বয়ে বেড়াতে হবে তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নাই বোধহয়। উপরন্তু আসামে যে খেলা শুরু হয়েছে তাতে ফোঁড়া এখন যে বৃহৎ টিউমারে রূপ নিতে যাচ্ছে তার শঙ্কা বীজ বোধহয় থেকেই যায় ।
বাংলাদেশের জন্য সেটাই মঙ্গল হবে যদি গভীর শঙ্কায় পতিত হওয়ার পূর্বে সমাধান নিশ্চিত করা যায়। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক, ভৌগলিকভাবে এতোটা সক্ষম নয় যে মানবপ্রেমের দরিয়া উম্মুক্ত করে দেবে। আন্তর্জাতিক সে প্রশংসা বোধহয় মঙ্গলের নয় যা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণœ করার শঙ্কা জাগ্রত রাখে। মায়ামনামারে এমন আশঙ্কাজনক ও বীভৎসভাবে মানবতা লংঙ্ঘিত হওয়ার পরেও কোন আন্তর্জাতিক সংস্থা যখন কার্যকর কোন ব্যবস্থা গ্রহনে সফল হলো না তখন আর বাংলাদেশের কোন সমস্যার সমাধানের জন্য তাদের ওপর নির্ভর করে থাকা বুদ্ধিবৃত্তিক সিদ্ধান্ত হবে না। দ্বি-পাক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে কিংবা কিছুটা মানবতা কম দেখিয়ে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। মানুষের সহায়তা তো ততোক্ষণ পর্যন্ত করাই যৌক্তিক হবে যতোক্ষণ নিজেদের আভ্রু রক্ষিত থাকে।

রাজু আহমেদ। কলামিষ্ট।