ঢাকায় ফের জঙ্গি আস্তানা : সিলেটে সতর্কতা, নজরদারি বৃদ্ধি

191

সুবর্না হামিদ ::
রাজধানীর নাখালপাড়ায় জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের পর সদর দফতরের নির্দেশনায় সিলেটে ‘এলার্ট’ রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। চলতি মাসেই প্রধানমন্ত্রীর সফর ও ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে রাষ্ট্রপতির সফর নিয়ে সর্ব্বোচ্চ সতর্কতার পাশাপাশি জঙ্গি সতর্কতা বিষয়ক ‘এলার্ট’ এর কারণে সিলেটে কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলছে প্রশাসন। গত বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকার নাখালপাড়ায় জঙ্গি আস্তানার পতন ঘটায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এতে ৩ জঙ্গি নিহত হয়। অনেকটা বিরতির পর আবারো জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পাওয়ার পর পুলিশ সদর দফতর থেকে ‘এলার্ট’ থাকার নির্দেশনা জারি করা হয়। নির্দেশনার পর স্বাভাবিক নিরাপত্তার পাশাপাশি সিলেটে কড়া নজরদারি করা হচ্ছে। অতিরিক্ত সর্তকতার জন্য বাড়ানো হয়েছে চেকপোষ্ট। পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারিও চলছে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশি।
র‌্যাব-৯ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মনিরুজ্জামান বলেন, ঢাকায় ফের জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পাওয়ার পর আমরাও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়িয়েছি। আমাদের মোবাইল নাম্বার বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে। কারণ সাধারণ জনগন বা মিডিয়া যারাই যে কোন তথ্য পেলে আমাদের জানালে আমরা সাথে সাথে এর ব্যবস্থা নিব। ঢাকা থেকে আমাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আমরা যেন সব সময় সতর্ক থাকি।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (মিডিয়া) মো. আব্দুল ওয়াহাব বলেন, সিলেটে আমরা সব সময় সতর্ক। আমরা তথ্য সংগ্রহ করছি এবং আমাদের অভিযান সব সময় অব্যাহত থাকবে। যদি এই ধরণের কোন খবর পাওয়া যায় আমরা সাথে সাথে ব্যবস্থা নেবো। আর আমাদের চেকপোস্ট প্রতিদিন অব্যাহত থাকবে। আমাদের গোয়েন্দা বিভাগ সবসময় সচেতন রয়েছে।
সিলেট জেলা পুলিশের সহকারি পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান খান বলেন, ঢাকা থেকে আমাদের কাছে এখনো কোন নির্দেশ আসেনি। তবে আমরা সব সময় সজাগ রয়েছি। যাতে যারা জঙ্গি তৎপরতা বা সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত তারা যেন আমাদের এলাকাতে আসতে না পারে বা আশ্রয় নিতে না পারে।
জানা গেছে, রাজধানীর পশ্চিম নাখালপাড়ায় রুবি ভিলা নামের ছয় তলা ভবনের পঞ্চম তলার একটি ফ্ল্যাট ভুয়া পরিচয়ে ভাড়া নিয়েছিল জঙ্গিরা। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে ওই বাসায় অভিযান চালায় র‌্যাব। এসময় তিন জঙ্গি নিহত হয়। আহত হয় র‌্যাবের দুই সদস্য।
গত শুক্রবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজির আহমদ জানান, গত চার জানুয়ারি জাহিদ নামের এক তরুণের জাতীয় পরিচয়পত্র দেখিয়ে ফ্ল্যাটটি ভাড়া নেয়া হয়। তবে ভেতর থেকে একই ছবি সম্বলিত সজিব নামের আরেকটি জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়া গেছে। অভিযানকালে জঙ্গিরা বাসার গ্যাসের চুলায় গ্রেনেড রেখে তা বিস্ফোরণের মাধ্যমে বড় ধরণের নাশকতার চেষ্টা চালিয়েছিলো বলেও জানান র‌্যাব মহাপরিচালক।
অভিযান শেষে ঘটনাস্থল থেকে বিস্ফোরক ও অস্ত্র উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাদের জন্য বাড়ির মালিক ও কেয়ারটেকারকে র‌্যাবের হেফাজতে নেয়া হয়।
এর আগে গত বছরের ২৩ মার্চ থেকে সিলেটের দক্ষিণ সুরমার শিববাড়ি-পাঠানপাড়ার পাঁচতলা আবাসিক ভবন আতিয়া মহলের নিচতলায় জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে ভবনটি ঘিরে ফেলে পুলিশ। পরদিন ২৪ মার্চ ঢাকা থেকে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট সোয়াট অভিযানে অংশ নেয়। সোয়াট অভিযানে ব্যর্থ হওয়ায় ২৫ মার্চ সকাল থেকে সেনাবাহিনী অভিযান শুরু করে। ২৫ মার্চ সকাল থেকে ২৮ মার্চ সন্ধ্যা পর্যন্ত আতিয়া মহলে ‘অপারেশন টোয়াইলাইট’ পরিচালনা করে সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো দল।
এদিকে ২৫ মার্চ অপারেশন টোয়াইলাইট চলাকালে জঙ্গি আস্তানার অদূরে দুই দফা বোমা বিস্ফোরণে নিহত হয় পুলিশ কর্মকর্তাসহ ৭ জন। এ আলোচিত ঘটনার পর হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা করে পুলিশ। দীর্ঘ ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও দুই মামলার কোনো অগ্রগতি হয়নি। সুষ্ঠুভাবে দ্রুততম সময়ে তদন্তের জন্য পুলিশের হাত থেকে পিবিআই’র (পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশন) কাছে হস্তান্তর হলেও সেই পুরোনো অবস্থাতেই আছে তদন্ত কাজ। মামলা দুটি পুলিশের হাতে থাকাবস্থায় ডিএনএ টেষ্টের পর এক জঙ্গিকে সনাক্ত করা হয়।
এছাড়া ২০০৬ সালের ২৭ ফ্রেব্রুয়ারি রাত ১২টায় সিলেট নগরীর টিলাগড় শাপলাবাগের সূর্য্য দীঘল বাড়িটিকে ঘিরে অভিযান শুরু হয়। শায়খের সঙ্গে ওই বাড়িটিতে মোট ১২ জন ছিল। পরের দিন সকালে গ্যাস প্রয়োগ করার পর বাড়ির ভেতরে শিশুদের কান্নার শব্দ শোনা যায়। প্রাণহানি ঘটা রুখতে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাড়িটির গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানীয় জলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর মহিলা ও শিশুরা বেরিয়ে আসে।
ওইদিন বিকেল থেকে বাড়িটির দেয়াল ও ছাদ ফুটো করে ভেতরের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয়। ভেতরের চারটি ঘরে কাউকে দেখা যায়নি। এরপরে ওই বাড়ির দেওয়ালের ফুটো দিয়ে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের সদস্যরা ভিডিও ছবি তুলতে হান্টার লুকিং ডিভাইস ব্যবহার করেন। রাতেই অনুমান করা হয় যে তেমন বিধ্বংসী কিছু বাড়িটিতে নেই। শায়খ রহমানের কাছে বোমা ছিল। যাতে সে আত্মঘাতী কিছু না করতে পারে সেজন্য তার ওপর বল প্রয়োগ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অভিযান চলার সময় যাতে শায়খকে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে না হয় সেইজন্য বার বার তাকে বাইরে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়। সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ২ মার্চ ঠিক সকাল সোয়া ৭টায় তৎকালীন সময়ে দেশের মোস্ট ওয়ানটেড শীর্ষ জঙ্গি নেতা শায়খ রহমান আত্মসমর্পণে বাধ্য হন।
তবে এর আগে র‌্যাব-এর সদস্যরা সারারাত ওই বাড়িটি ঘেরাও করে জলকামান আর টিয়ার গ্যাসের সেল ছোড়ে। পরদিন ভোর সোয়া ৬টায় এই অভিযান তীব্র করা হয়। আর ঠিক তখনই শায়খ রহমান তার দুই সহযোগীকে নিয়ে দক্ষিণ দিকের বারান্দায় বেরিয়ে এসে আবার ভেতরে ঢুকে যান। তখন র‌্যাবের সদস্যরা বাড়িটির চারদিক ঘেরাও করে মাইকে আবারও তাকে আত্মসমর্পণ করার জন্য আহ্বান জানান। র‌্যাবের আহ্বানে সাড়া দিয়ে শায়খ রহমান উত্তর দিকের ঘরের জানালার কাছে গিয়ে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত জানান।