জমে ওঠেছে দুইশ বছরের ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা

53

শিপন আহমদ, ওসমানীনগর ::
সিলেট বিভাগের মিলনস্থল ওসমানীনগরের সীমান্তবর্তী শেরপুরে ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা জমে ওঠেছে। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার শেরপুরের ব্রাক্ষণগ্রামের অঙ্ঘিাট এলাকায় কয়েক একর ভূমির উপর এবছরও তিন দিনব্যাপী এই মেলার আয়োজন করা হয়েছে। গত শুক্রবার থেকে মেলা শুরু হলেও গতকাল শনিবার সন্ধ্যার পর থেকে মাছের বাজার জমে ওঠেছে। মেলা চলবে আগামীকাল সোমবার ভোর পর্যন্ত। এছাড়া মাছ ব্যতিত অন্যান্য পণ্য সামগ্রী সপ্তাহব্যাপি বেচা-বিক্রী চলবে। এবছর মেলায় কোনো অশ্লীল নৃত্য, (পুতুল নাচ) জুয়ার আসরের প্রস্তুতি না থাকলেও স্থানীয় জুয়াড়ীসহ একটি সঙ্গবদ্ধ চক্র মেলাস্থলের আশেপাশে জোয়াসহ নানা অসামাজিকতার প্রস্তুতি নিচ্ছে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এছাড়া মেলায় প্রতি বছরই সরকারীভাবে দোকান প্রতি টোল হার নির্ধারণ করে থাকলেও বিগত দিনের মেলাগুলোতে দোকানদারদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ ওঠেছিল। এবারও মেলায় আসা ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত টোলের বোঝা পড়তে পারে বলে ব্যবসায়ীরা শঙ্কিত রয়েছেন। গত শুক্রবার বিকেলে সরজমিন মেলাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, মেলাস্থলে এক-দুদিন আগে থেকেই বসানো হচ্ছে ইমিটেশন, খেলনা, গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় নানা জিনিসপত্রের দোকান। আর বাদ যায়নি মুড়ি-মুড়কি আর মন্ডা-মিঠাইসহ কত কি মুখরোচক খাবারের আয়োজন।
মাছের মেলাটি এখন এ অঞ্চলের আনন্দ উৎসবের অন্যতম খোরাক। মেলাস্থল শেরপুর হলো মৌলভীবাজার জেলা সদর থেকে প্রায় ২৩ কিলোমিটার দূরে সদর উপজেলার একেবারেই শেষভাগে। পশ্চিমে হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলা উত্তরে কুশিয়ারা নদী। নদী পাড় পেরুলেই সিলেট জেলার ওসমানীনগর ও বালাগঞ্জ উপজেলা। হবিগঞ্জ, সিলেট ও মৌলভীবাজার এই তিনটি জেলার মোহনা হলো শেরপুর। মৎস্য ব্যবসায়ী আর স্থানীয়দের জোর দাবি এটিই দেশের সবচেয়ে বড় মাছের মেলা। যদিও মেলাটি এ অঞ্চলে মাছের মেলা নামে পরিচিত। তারপরও মাছ ছাড়া বিভিন্ন দ্রব্যের কয়েক হাজার দোকান বসে কুশিয়ারা নদীর তীরজুড়ে। মেলায় মাছ ছাড়া বেত-বাঁশ, কাঠ, লোহা ও মাটির তৈরি নানা রকম পণ্য, শিশুদের খেলনা, সবজি-আনাজ অনেক ধরণের লোকজ পণ্য, ফার্নিচার, কৃষিপণ্য, গৃহস্থালিসামগ্রী, নানাজাতের দেশি খাবারের দোকানসহ থাকে গ্রামীণ ঐতিহ্যের নানা রঙঢঙ আর প্রয়োজনীয় দ্রব্যের সহ¯্রাধিক দোকান বসেছে। মেলায় আসা মাছ বিক্রেতা (আড়ৎদার) ও স্থানীয় বাসিন্ধারা জানান, শুক্রবার দিনের মধ্য ভাগ থেকে মেলায় ওঠতে শুরু করেছে সিলেটের স্থানীয় বিভিন্ন হাওর ও নদীর মাছ। কুশিয়ারা, সুরমা ও মনু নদী, হাকালুকি, কাওয়াদিঘি, হাইল ও টাঙ্গুয়ার হাওর ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মৎস্য ব্যবসায়ীরা বাঘ, রুই, কাতলা, মৃগেল, চিতল, বোয়াল, গজার, আইড়সহ নানা জাতের দেশীয় প্রজাতির বিশাল বিশাল মাছ নিয়ে পসরা সাজাবেন। তবে মাছের মেলাকে ঘিরে দেশীয় প্রজাতির নানাজাতের মাছের এমন সমারোহে যেনো ফিরে আসবে মাছের সেই হারানো সোনালি অতীত এমন মন্তব্য অভিজ্ঞজনের। মূলত; ওখানে দু’রাত আর দু’দিনই ধুম পড়ে মাছ কেনাবেচার। মেলায় বিক্রি হয় কয়েক কোটি টাকার মাছ। আর সমাগম ঘটে দেশের নানা প্রান্তের ভোজনবিলাসী লক্ষাধিক মানুষের।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হিন্দু সম্প্রদায়ের পৌষ সংক্রান্তিকে ঘিরে আয়োজন হয়েছিল এ মাছের মেলার। প্রায় দুইশ’ বছর আগে মৌলভীবাজারের শেরপুরে কুশিয়ারা নদীর তীরজুড়ে শুরু হয়েছিল এই মাছের মেলা। ঐতিহ্যের টানে যা এখনো স্থানীয়রা ধরে রেখেছেন। তাই প্রতিবছরই মৌলভীবাজার সদর উপজেলার সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের পাশে শেরপুরে কুশিয়ারা নদীর তীরে এ মাছের মেলার আয়োজন করে স্থানীয়রা। মেলা চলে রাত দিন।
স্থানীয়রা জানান, মেলা উপলক্ষে প্রবাসী অধ্যুষিত এ অঞ্চলের শেরপুর, নবীগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেটর ওসমানীনগর ও বালাগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরসহ আশপাশের শৌখিন লোকদের মেলায় আগমন ঘটে। এসব এলাকার প্রবাসীরাও মেলা উপলক্ষ্যে জন্য দেশে আসেন। এছাড়া মেলাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের আত্মীয় স্বজনরাও আসেন তাদের বাড়িতে। নানা স্বাদের মাছ আর নানাজাতের পিঠা তৈরিতে উৎসবের আমেজে জমে ওঠে পুরো এ অঞ্চল। মেলায় প্রতি বছর কয়েক সহ¯্রাধিক দোকান বসানো হয়।
শেরপুর পুলিশ ফাড়ির ইনচার্জ এসআই আবু সাঈদ বলেন, এলাকার প্রথা অনুযায়ী সুষ্ঠুভাবে মেলা অনুষ্টিত হওয়ার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব রকমের প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে। মেলাকে কেন্দ্র করে যাতে কোনো ধরণের অসামাজিক কার্যকলাপ না নয় সে জন্য পুলিশ প্রশাসন তৎপর রয়েছে।