নির্বাচনকালীন সরকার : এখনই কিছু ভাবছে না আওয়ামী লীগ

49

প্রতীক ইজাজ ::
সরকারের চার বছর পূর্তিতে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনের আগে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের কথা বলেছেন। তিনি এমনও বলেছেন, কীভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, তা সংবিধানে স্পষ্টভাবে বলা আছে। নির্বাচনকালীন সরকার সর্বতোভাবে নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন পরিচালনায় সহায়তা দিয়ে যাবে। সেই থেকে দেশে শুরু হয়েছে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে নতুন ভাবনা। রাজনীতিতেও এ নিয়ে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ।

বিশেষ করে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে বিএনপির ব্যাপারে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কী ভাবছে—ঘুরেফিরে সে প্রসঙ্গই গুরুত্ব পাচ্ছে সবচেয়ে বেশি। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনকালীন সরকার গঠন হলে সে মন্ত্রিসভায় বিএনপিকে রাখা হবে কি না, নির্বাচনকালীন সরকার বিএনপির চাওয়া সংলাপে সরকার রাজি হবে কি না, নাকি নির্বাচনকালীন সরকার ও সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ন্যূনতম কোনো ছাড় দেওয়ার ইচ্ছে ক্ষমতাসীনদের নেই—এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সর্বত্র।

নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ ঘিরে গত কয়েক দিনে কয়েকটি বিষয় সামনে চলে এসেছে। সংবিধানে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা না থাকায় প্রধানমন্ত্রী ঠিক কী ধরনের বা কোন প্রক্রিয়ায় এ ধরনের সরকার গঠন করতে চান, সে নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন উঠছে। প্রধানমন্ত্রীও তার ভাষণে এ ধরনের সরকারের বিষয়টি স্পষ্ট করেননি। কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা জানিয়েছেন, সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচন এবং সে সময় গঠিত একটি ছোট আকারের মন্ত্রিসভা রুটিনওয়ার্ক করবে। প্রধানমন্ত্রীই সরকার প্রধান থাকবেন। নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকেই গঠিত হবে নির্বাচনকালীন সরকার। সংসদে প্রতিনিধিত্ব না থাকায় সাংবিধানিকভাবে সে সরকারে থাকার কোনো সুযোগ নেই বিএনপির।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছে বিএনপি। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের সমালোচনা করে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে সংকট আরো ঘনীভূত হয়েছে। এমনকি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এ প্রসঙ্গে বলেন, সংবিধানে নিরপেক্ষ সরকার বলে যেমন কিছু নেই, তেমনি নির্বাচনকালীন সরকার বলেও কিছু নেই। প্রধানমন্ত্রী আসলে কি বোঝাতে চাইছেন তা তাকে আরো স্পষ্ট করে বলতে হবে। এসব দিক তুলে ধরে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে আলোচনার জন্য দলের পক্ষ থেকে সংলাপের আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে নির্বাচনকালীন সরকার ও বিএনপির সংলাপ আহ্বান নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের পর গত কয়েক দিনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মনোভাব ব্যক্ত করেছেন দলের শীর্ষনেতারা। সরকারের সেতুমন্ত্রী ও দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে। তখন নির্বাচনকালীন সরকার থাকবে, এটা সংবিধানেই আছে। ওই ক্যাবিনেটের কাজ ও আকার কমে আসে। তারা সরকারের রুটিন কাজ পালন করবে। নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো ইসির অধীনে চলে যায়। নির্বাচন কমিশনের যে যে সহযোগিতা দরকার, নির্বাচনকালীন সরকার তাই করবে।

একইভাবে বাণিজ্যমন্ত্রী ও দলের জ্যেষ্ঠ নেতা তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সরকারই হবে নির্বাচনকালীন সরকার। অন্য কিছু না। অন্য দল থেকে লোক নিয়ে সরকার গঠন করতে হবে—এমন কথা প্রধানমন্ত্রী বলেননি। নির্বাচনকালীন সরকার বলতে বর্তমান সরকারকেই বোঝায়। এই সরকার হবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার; যারা শুধু দৈনন্দিন কাজগুলো করবে। এই নেতার মতে, এই ক্যাবিনেটই থাকবে, হয়তো বড়-ছোট হতে পারে এই। নির্বাচনকালীন সরকার বলার অর্থ হলো, সংবিধান অনুসারে যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তার অধীনেই সাধারণত নির্বাচন হয়ে থাকে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন এই সরকারই হবে নির্বাচনকালীন সরকার, প্রধানমন্ত্রী এটাই ‘মিন করেছেন’ বলে মত দেন তিনি।

বিএনপি যে সংলাপ চেয়েছে, সে ব্যাপারেও দলের মনোভাব ব্যক্ত করেছেন আওয়ামী লীগের শীর্ষনেতারা। সেক্ষেত্রে তারা সংলাপ নিয়ে দলের একটি মাঝামাঝি অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের যদিও বলছেন, নির্বাচন নিয়ে বিএনপির সঙ্গে সংলাপের প্রয়োজন নেই। তবে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সংলাপের সম্ভাবনা একেবারে নাকচ করে দেয়নি আওয়ামী লীগ। দলের সাধারণ সম্পাদক এ কথাও বলেছেন, ‘প্রয়োজন হলে সংলাপ হবে, এখন সংলাপের কোনো প্রয়োজন আমরা দেখছি না। সে রকম কোনো সংকট দেখা দিলে পরিস্থিতি বলে দেবে।’ সেক্ষেত্রে কোনো ধরনের পরিস্থিতির কথা বলছেন—জানতে চাইলে এই নেতা বলেন, চিরদিনের জন্য সংলাপের দরজা বন্ধ নয়।

প্রকাশ্যে এমন কথা বললেও নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে দলের ভেতরে এক ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন দলের নীতিনির্ধারণী সূত্রগুলো। তবে বিএনপি ‘নির্ভর’ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ভাবনা নেই ক্ষমতাসীন দলের। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা খর্ব বা ছুটিতে যাওয়া বা সংসদ ভেঙে বা সংবিধান সংশোধন করে নির্বাচনকালীন সরকার বা নির্বাচনের প্রশ্নে ন্যূনতম কোনো ছাড় দেবে দলটি। দল এ ক্ষেত্রে কঠোর যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচন হবে।

দলীয় সূত্রমতে, নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রিসভায় বিএনপি থেকে কোনো প্রতিনিধি রাখা হবে কি না, তা নির্ভর করছে ওর দলের আগামীর রাজনীতির ওপর। বিএনপি সমঝোতায় এলে শেষ পর্যন্ত মন্ত্রিসভায় টেকনোক্র্যাট কোটায় সর্বোচ্চ দু-তিনজন প্রতিনিধির জায়গা হতে পারে। তবে তা বিএনপিকে আদায় করে নিতে হবে। সে ক্ষেত্রে কোনো ধরনের জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলন করার সুযোগ দেবে না ক্ষমতাসীনরা। তবে চেষ্টা থাকবে বিএনপিকে নির্বাচনকালীন সরকারের বাইরে রেখেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের ও বিএনপিকে নির্বাচনে অংশ নিতে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের এক শীর্ষনেতা বলেন, বিএনপি বাড়াবাড়ি করলে সে ক্ষেত্রে বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে কোনো ধরনের উদ্যোগ নেবে না আওয়ামী লীগ। প্রয়োজনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট সংকোচন করে ও জোটবহির্ভূত অন্যান্য রাজনৈতিক দলকে নিয়ে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে যাবে। দলের মতে, আন্দোলনের মাধ্যমে নির্বাচন বানচাল বা দাবি আদায়ের প্রেক্ষাপট বিএনপির নেই। তবে দল চাইছে বিএনপি নির্বাচনে আসুক।

দলের নেতারা মনে করেন, বিএনপির শর্ত মেনে নিয়ে তাদের নির্বাচনে নিয়ে আসার অর্থই হচ্ছে সংবিধানের বাইরে যাওয়া। সংবিধান অনুযায়ী কোনো রাজনৈতিক দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে বাধা নেই। সেক্ষেত্রে সংবিধানের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

দলের নীতিনির্ধারকরা এমনও মনে করছেন, কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করানোর জন্য কোনো প্রকার বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণের ভাবনায় আওয়ামী লীগ নেই। নির্বাচন কমিশন নির্বাচন পরিচালনা করবে, রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ সেই নির্বাচন পরিচালনায় কমিশনকে সব ধরনের সহযোগিতা করবে। নির্বাচনকালীন সরকার রুটিনওয়ার্ক করবে। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে বিভিন্ন মহলের দাবি পাত্তা না দেওয়ার কৌশল নিয়েই এগোবে দলটি।

এর আগে ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে মন্ত্রিসভার সদস্য সংখ্যা কমিয়ে নতুন-পুরনো মিলিয়ে ‘নির্বাচনকালীন সরকার’ গঠন করে আওয়ামী লীগ। এই সরকারে জাতীয় পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ ও জাতীয় পার্টিকে (জেপি) রাখা হয়েছিল। অন্য দল থেকে তিনজনকে উপদেষ্টা হিসেবে রাখা হয়, যারা নির্বাচিত ছিলেন না। সে সময় গঠিত নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভায় ২১ জন মন্ত্রী ও সাতজন প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগের নেতারা নির্বাচনে অংশ নিলে বিএনপিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ পাঁচটি মন্ত্রণালয় ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু বিএনপি অংশ নেয়নি। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংলাপের জন্য খালেদা জিয়াকে গণভবনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি যাননি।

দলের নীতিনির্ধারণ মহল মনে করছে, এবার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। বিএনপি সংসদে নেই। সুতরাং সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা হলে সেখানে বিএনপিকে রাখা সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে বিএনপিকে সংবিধান মেনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচনে অংশ নিতে হবে। তবে প্রধানমন্ত্রী চাইলে টেকনোক্র্যাট বা উপনির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি থেকে মন্ত্রিসভায় সদস্য নিতে পারেন। সেক্ষেত্রে সবকিছুই নির্ভর করবে প্রধানমন্ত্রীর ওপর।

এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ বলেন, আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিয়ে গণতন্ত্রকে আরো সুসংহত করতে এগিয়ে আসবে। বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নিলে তা অংশগ্রহণমূলক হবে না—এমন ধারণা ঠিক নয়। নির্বাচনে বিএনপি এলো, অন্য দলগুলো এলো না-তাহলে কি অংশগ্রহণমূলক হবে? নিশ্চয়ই নয়। এক-আধটা দল এলো কী এলো না, সেটা আওয়ামী লীগ ভাবছে না। তবে দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান বলেন, বিএনপির বাইরেও যেসব রাজনৈতিক দল আছে, রাজনৈতিক শক্তি আছে নিশ্চয়ই তারা এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। এ নির্বাচন কমিশনের ওপরও তাদের আস্থা আছে এবং নির্বাচনকালীন সরকারের ওপরও তাদের আস্থা থাকবে। সুতরাং সেই নির্বাচন অবশ্যই অংশগ্রহণমূলক, অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে।