লাখ টাকায় স্কুলে ভর্তি

93

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেধা ও মননের চর্চা হয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এখান থেকেই আদর্শ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশের হাল ধরে। এ কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও হতে হয় আদর্শস্থানীয়। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাকালে কি তেমন মনে হয়? বরং উল্টোটাই সত্য বলে মনে হয়। প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ শিক্ষার সনদ নেওয়া পর্যন্ত অনিয়ম-দুর্নীতির অন্ত নেই। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিভাবে আদর্শ মানুষ তৈরি করবে? জাতির মেরুদ-ের কী হবে? প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, ঢাকার নামিদামি স্কুলগুলোতে ভর্তি বাণিজ্য ফুলেফেঁপে উঠেছে। স্কুলভেদে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীপ্রতি ঘুষ নেওয়া হয় সাত লাখ টাকা পর্যন্ত। একটি-দুটি নয়, প্রায় সব কটি নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরই একই হাল। প্রথম শ্রেণিতে লটারির মাধ্যমে ভর্তি করার নিয়ম রয়েছে। বাস্তবে দেখা যায়, লটারিতে যতসংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি হয়, ঘুষের মাধ্যমে ভর্তি হয় তার কয়েক গুণ। এভাবে শিক্ষার পরিবেশ ও মান রক্ষা না করেই দেদার শিক্ষার্থী ভর্তি করা হচ্ছে। এসব স্কুলে সেকশনের পর সেকশন খোলা হচ্ছে। নতুন নতুন ক্যাম্পাসও খোলা হচ্ছে। বিশেষ কারণে শিক্ষা প্রশাসন এসব দেখেও না দেখার ভান করে থাকে। অনেক অভিভাবকও হুমড়ি খেয়ে পড়েন এসব নামিদামি স্কুলে, সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তা থেকে খুব সহজেই আপোশ করেন দুর্নীতি-অনিয়মের সঙ্গে। ফলে এসব স্কুলের ভর্তি বাণিজ্য ক্রমেই আরো ফুলেফেঁপে উঠছে।
শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য শিক্ষিত ও চরিত্রবান করে শিক্ষার্থীদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। অনিয়ম দিয়ে যে বিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রমের শুরু, সেখানে সুনাগরিক গড়ে তোলার কোনো সুযোগ থাকে কি? এই অবস্থা এক দিনে তৈরি হয়নি। দেখভালের দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্র ও প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দীর্ঘ অবহেলায় গোটা শিক্ষাব্যবস্থায়ই আজ এমন পচন ধরেছে। এখনো যদি শিক্ষাব্যবস্থার পচন সারানোর উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তাহলে কোনো দিনই হয়তো আর সে পচন সারানো যাবে না। প্রতিবেদন অনুযায়ী, নামিদামি এসব স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সদস্যরাই মূলত দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। তাঁদের অনেকে ক্ষমতাসীন রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত। লাভজনক হওয়ায় কমিটির সদস্য নির্বাচনে তীব্র প্রতিযোগিতা হয়। কোনো কোনো প্রার্থী জয়ী হতে ৩০ লাখ থেকে ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচও করে থাকেন। জয়ী হলে তাঁরা সেই টাকা সুদে-আসলে উসুল করে নেন। আর এই সুযোগে ভর্তিসংশ্লিষ্ট অন্যরাও যে যতটা পারেন কামিয়ে নেন।
কি সরকারি, কি বেসরকারিÑপ্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই আজ অনিয়ম-দুর্নীতির জয়জয়কার। কিছুদিন আগে বিনা মূল্যের বই বিতরণে অর্থ আদায় করার অভিযোগ উঠেছে। প্রশ্ন ফাঁস, কোচিং-টিউশনি আজ ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে সনদ বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। এই শিক্ষাব্যবস্থায় সুনাগরিক গড়ে তোলা সম্ভব কি? আমরা আশা করি, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক ও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা সবাই দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আবার সুস্থতা দিতে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা প্রদর্শন করবেন।