থেমে নেই পাথরখেকো চক্র : লোভাছড়ায় অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনে ‘সর্বদলীয় জোট’

91

আমিনুল ইসলাম, কানাইঘাট ::
প্রশাসনকে ম্যানেজ করে লোভাছড়া কোয়ারীতে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন চলছে। পাথরখেকো চক্রের কবল থেকে কোয়ারী এলাকা ও তার বাইরে গো-চারণ ভূমিসহ বসত বাড়ি রেহাই পাচ্ছে না। এ সব স্থান থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার ঘন ফুট পাথর উত্তোলন করে রাতারাতি কোটিপতি হচ্ছেন গুটিকয়েক লোক। আর চক্রকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির নেতারা। যারা স্থানীয়ভাবে ‘সর্বদলীয় জোট’ হিসেবে পরিচিত।
জানা যায়, রাতের আঁধারে এস্কেভেটর দিয়ে নদীরপাড় কেটে দীঘির মতো গর্ত তৈরী করা হয়। আর এসব গভীর গর্ত থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাজার হাজার শ্রমিক পাথর উত্তোলন করছেন। সাড়ে ৩শ থেকে ৪ শ টাকা মজুরীতে শ্রমিকদের ঝুঁকিতে ঠেলে দিয়ে আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হচ্ছেন অসাধু পাথর ব্যবসায়ীরা।
জানা যায়, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও জেলা পরিষদের ১৫ নং ওয়ার্ডের সদস্য আলমাছ উদ্দিন, ১ নং লক্ষীপ্রসাদ পূর্ব ইউনিয়ম আওয়ামী লীগের সভাপতি নাজিম উদ্দিন, উপজেলা যুবদলের সহ সাধারণ সম্পাদক ফখরুল ইসলাম, পৌর জাতীয় পার্টির সাবেক সভাপতি বাবুল আহমদ, ফয়েজ উদ্দিন, আব্দুল মজিদ, আব্দুস ছাত্তার, ছয়ফুল আলম, শাহিদ আহমদসহ ২ শতাধিক ব্যবসায়ী কোয়ারী এলাকার পরিবেশ মারাত্মক বিপর্যের মুখে ঢেলে দিচ্ছেন। তাদের মধ্যে একটি চক্র প্রশাসনকে ম্যানেজ করার নাম করে প্রতিদিন ঐসব গর্ত থেকে কয়েক লক্ষ টাকা আদায় করছেন বলে বিশ^স্থ সূত্রে জানা গেছে। কোয়ারীর পরিবেশকে রক্ষা করতে অনেকের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও প্রভাবশালী এই মহলের ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছে না। তারা অবৈধভাবে রাতের আঁধারে গভীর গর্ত করার জন্য এস্কেভেটর, ফেলুডার ও লিস্টার মেশিন ব্যবহার করে, যা দিনের বেলায় সরিয়ে ফেলেন। বিশেষ করে সাউদগ্রাম ও ভাল্লুক মারার অবস্থা বেহাল দশায় পরিণত হয়েছে। যেন পাথর খেকোদের হিং¯্র থাবায় আজ প্রাকৃতিক সৌন্দের্যের লীলাভূমি ক্ষতবিক্ষত। যে যার মতো করে পারছে পাথর উত্তোলন করছে। সেখানে দিঘীর মত ৪০ থেকে ৫০ ফুট গভীর গর্ত দেখলে গা শিউরে উঠে। সেখানে স্থানীয় প্রশাসনের একাধিক অভিযান হলেও রহস্যজনকভাবে পাথরখেকোরা থেমে নেই। প্রতিটি অভিযানের পূর্বেই মালিক ও শ্রমিকরা তাদের ভালো যন্ত্রপাতি নিয়ে সেখান থেকে ছিটকে পড়ায় সচেতন মহলে ক্ষোভ বিরাজ করছে। তাদের প্রশ্ন পাথরখেকোরা অভিযানের খবর পায় কি ভাবে? এসব অভিযানে কাজের কাজ কিছু না হওয়ায় বরং পাথরখেকোরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তাদের মতে ইজারা শর্ত আবার কী? একটি কথা পাথর চাই। যেন প্রশাসনের অভিযানকে তারা বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে অবাধে নদীর তীর, পার্শ্ববর্তী টিলা ও ফসলী জমিতে গর্ত করে পাথর উত্তোলন করেই চলছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এমন কয়েকজন জানান, প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও প্রভাবশালী মহলকে ম্যানেজ করার জন্য তারা প্রতিদিন টাকা দিয়ে থাকেন। তবে কোয়ারীর ইজারাদার মস্তাক আহমদ পলাশের মাধ্যমে প্রশাসনকে ম্যানেজ করার জন্য প্রায় দুই কোটি টাকা উত্তোলন করে স্থানীয় ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সরেজমিনে জানা যায়, ক্ষমতাসীন দলের অনেক নেতার নামে গর্ত থেকে পাথর উত্তোলন করা হয়। তবে গত ৭ নভেম্বর বাংলাটিলায় ৬ জন নিহত হওয়ায় টনক নড়ে প্রশাসনের। এতে করে অবৈধ উপায়ে পাথর উত্তোলনে বেকায়দায় পড়ে যায় পাথরখেকোচক্র। ঐ সময় জরুরী ভিত্তিতে উপজেলা মিলনায়তনে পাথর ব্যবসায়ীদের নিয়ে এক সভায় ইজারা শর্ত মেনে কোয়ারী এলাকা থেকে পাথর উত্তোলনের কথা বলা হয়। এই সুযোগে নদীর জলসীমা থেকে যারা সেইভ মেশিনের সাহায্যে বারকি নৌকা দিয়ে পাথর উত্তোলন করছে তাদের কাছ থেকে পুলিশ ও প্রশাসনকে বখরা দেওয়ার নাম করে মেশিন প্রতি ১ হাজার টাকা করে তুলছে একটি চক্র।
পাথর দানবদের হিং¯্র থাবায় লোভাছড়ার পরিবেশ মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। যে কোন মূহুর্তে প্রাণহানীসহ ঘটে যেতে পারে বড় ধরণের পরিবেশ বিপর্যয়। বিলীন হতে পারে বিশাল এলাকার অসংখ্য ঘরবাড়ি। হুমকির মধ্যে রয়েছে সাউদগ্রাম, ভাল্লুকমারা, সতিপুর, কান্দলা, খুকোবাড়িসহ কয়েকটি গ্রাম। ইতোমধ্যে প্রাচীনতম ঐতিহ্যবাহী মুলাগুল মূল বাজারটি নদীর সাথে বিলীন হয়ে গেছে। বিলীন হয়ে গেছে নয়াবাজার জামে মসজিদ ও নদীর তীরবর্তী শত শত ফসলী জমি।
এদিকে বিজিবির উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ লোভাছড়ার সীমান্তের যেসব স্থানে দীর্ঘদিন ধরে লাল পতাকা পুতে রেখেছে সেখানকার পরিবেশ রক্ষার্থে স্থানীয় বিজিবি জোয়ানরা কঠোর নজরদারীতে রেখেছেন। যাতে করে কোন পাথরখেকোরা ঐ এলাকা থেকে পাথর উত্তোলন করতে না পারে।
লোভাছড়া পাথর কোয়ারীর ইজারাদার মস্তাক আহমদ পলাশ বলেন, ইজারার শর্ত মেনেই পাথর উত্তোলনের জন্য স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সাথে বার বার আলোচনা করা হচ্ছে। প্রশাসনকে ম্যানেজ করার কথা অস্বীকার করে তিনি বলেন ব্যবসায়ীদের সাথে তার কোন অনৈতিক লেনদেনের প্রশ্নই উঠে না। যারা শর্ত অমান্য করে পাথর উত্তোলন করছেন তাদের বিরুদ্ধে তিনি মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। যারা ইজারার শর্ত অমান্য করে পরিবেশ ধ্বংস করছেন তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তিনি বার বার প্রশাসনকে অনুরোধ জানাচ্ছেন।
কানাইঘাট থানার ওসি আবদুল আহাদ বলেন, লোভাছড়া কোয়ারি থেকে পুলিশ কোনো টাকা পায় না কিংবা টাকা পুলিশের নামে তোলা হয় না।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানিয়া সুলতানা জানান, আমরা সেখানে ঘন ঘন অভিযান দিচ্ছি, আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। কেউ প্রশাসনকে ম্যানেজ করার নামে টাকা উত্তোলন করলে সেটা তারাই জানে। আর যারা প্রশাসন ম্যানেজ করার ধারণা করে তাদের সেই ধারণা ভুল।