বিছনাকান্দিতে অভিযান থামছে না তান্ডব : গো-চর চিহ্নিত করলো প্রশাসন

86

আবদুল্লাহ আল নোমান, বিছনাকান্দি থেকে ফিরে  ::
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার বিছনাকান্দি পাথর কোয়ারীতে তান্ডব থামছে না পাথরখেকোদের। একদিকে প্রশাসনের অভিযান, পাশাপাশি চলছে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন। পাথরখেকোদের থাবা থেকে রক্ষা পাচ্ছে না নদী তীর, গো-চারণ ভূমিসহ ফসলী ভূমি। যান্ত্রিক পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা মানছে না প্রভাবশালীরা। তিন গ্রামের পঞ্চায়েতের নামে উজাড় করা হচ্ছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম লীলাভূমি বিছনাকান্দি। লিস্টার ও পেলুডার এবং এক্সেভেটর মেশিন দিয়ে বিলীন করে দেয়া হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। যান্ত্রিকভাবে পাথর উত্তোলনের ফলে তৈরী হচ্ছে বড় বড় গর্ত। আর এসকল গর্তে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে কয়েক হাজার শ্রমিক। অতীতের মতো যেকোনো সময় বড় ধরণের দূর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, বিছনাকান্দি এলাকার বাদেপাশা, কলমছরারপাড়, বিছনাকান্দি (কান্দি) ও বিছনাকান্দি (কোপা) গ্রামের প্রভাবশালীসহ গোয়াইনঘাট উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক জয়নাল আবেদীন, জেলা বিএনপির সদস্য জসিম উদ্দিন, জেলা ছাত্রদল সদস্য দেলোয়ার হোসেন, আওয়ামীলীগ নেতা বোরহান মিয়া, আওয়ামীলীগ নেতা হেলাল, বিএনপি নেতা আব্দুল্লাহ, ময়না মিয়া, সিরাজ, সজিব, রুস্তমপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহবুদ্দিন শিহাব, পাবলু মেম্বারদের নিয়ন্ত্রণে বিলীন করে দেয়া হচ্ছে কয়েকটি গ্রাম। তাদের প্রভাবের করণে স্থানীয় মানুষ ও পুলিশ এবং প্রশাসন নিরব ভূমিকা পালন করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ব্যক্তি জানান, অভিযানের সময় জীবনঝুঁকি নিয়ে শ্রমিকরা কাজ করছেন। ঝুকিপূর্ণ এসব গর্ত বন্ধ না করে পাশের একটি গ্রাম থেকে প্রায় ৫ লক্ষ টাকা পাথর বিক্রয় করেই এই অভিযান শেষ হয়েছে। এসময় অবৈধ পাথর উত্তোলনের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
তিনি আরো জানান, স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসন এবং খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোর নামে প্রতিদিন আলাদা আলাদাভাবে প্রতিটি গর্ত থেকে প্রকার ভেদে ৫ থেকে ৯ হাজার টাকা পর্যন্ত টাকা আদায় করা হয়। সেই কালো টাকার প্রভাবে বিছনাকান্দি এলাকায় অবৈধভাবে পাথর তোলে বিলীন করে দেয়া হচ্ছে একের পর এক গ্রাম। সেখানে তৈরী হয়েছে বড় বড় গর্ত।
এদিকে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার বিছনাকান্দি পাথর কোয়ারিতে গতকাল রোববার বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে উপজেলা টাস্কফোর্স কমিটি। রোববার দুপুরে গোয়াইনঘাটের সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুমন চন্দ্র দাশের নেতৃত্বে এ অভিযান চালানো হয়।
এ সময় অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোর সহকারি পরিচালক মো. আব্দুল আলিম, আলমগীর কবির, গোয়াইনঘাট থানার ওসি (তদন্ত) হিল্লোল রায়সহ সঙ্গীয় পুলিশ সদস্যবৃন্দ। অভিযান পরিচালনা কালে বিছনাকান্দি গ্রামের রাস্তার নিকটবর্তী বগাইয়া মৌজায় অবস্থিত জিয়া উদ্দিন, ইউনূস মিয়া, রাসেল আহমদ, সহিদ আহমদ, মাসুক মিয়া ও পাবলুর মালিকানাধীন পাথর উত্তোলনের ঝুঁকিপূর্ণ ২টি গর্ত স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের গর্ত থেকে উত্তোলনকৃত ৭৭ হাজার টাকার পাথর উন্মুক্ত নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করে সরকারের কোষাগারে জমা করা হয়।
বিকেল ৩টায় বিছনাকান্দি গো-চর ভূমি সংলগ্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে টাস্কফোর্স প্রতিনিধি দল। এ সময় লাল নিশান টাঙিয়ে ওই এলাকা থেকে পাথর উত্তোলন সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা হয়।
এ ব্যাপারে সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুমন চন্দ্র দাশ বলেন, বিছনাকান্দি পাথর কোয়ারি এলাকায় টাস্কফোর্সের অভিযান চালিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ২টি পাথর উত্তোলনের গর্ত বন্ধ ও উত্তোলিত পাথর জব্দ করে নিলামে বিক্রি করা হয়েছে। একই সঙ্গে গো-চর সংলগ্ন এলাকায় পাথর উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞারোপ করে লাল নিশান টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওই নির্দেশনা অমান্য করে কেউ পুনরায় পাথর উত্তোলনের পাঁয়তারা করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম কিম বলেন, এসব অভিযান লোক দেখানো ছাড়া আর কিছু নয়। অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ দরকার তা না হলে ভূমিকম্পে ভারতের পাহাড়ের নিচে তলিয়ে যাবে গোটা সীমান্ত অঞ্চল।
গোয়াইনঘাট থানা পুলিশের তদন্ত পরিদর্শক হিল্লোল রায় জানান, বিছনাকান্দি এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে। খনিজসম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো ও উপজেলা প্রশাসনের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সহকারি কমিশনার (ভূমি) সুমন চন্দ্র দাস জানান, সেখানে যান্ত্রিকভাবে পাথর উত্তলন হয়না। আমরা অভিযানের সময় কোন যন্ত্র পাই নাই। গো-চরের পাশে একটি গ্রাম থেকে কিছু পাথর জব্দকরে লিলামে ৭৭ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রয় করা হয়েছে।
গোয়াইনঘাট উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা বিশ্বজিত কুমার পাল জানান, বিছনাকান্দিতে এসিল্যান্ড ও খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো নিয়ে অভিযান চালানো হয়েছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে ।
পরিবেশ অভিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় অফিসের উপ-পরিচালক আলতাফ হোসেন জানান, পরিবেশের ব্যপারে পরিবেশ অধিদপ্তর তৎপর রয়েছে। সেখানে ৩৩ ফুটের বেশি গর্ত থাকলে পরিবেশ অধিদপ্তর মামলা দায়ের করবে। এছাড়া পরিবেশের ক্ষতি যারা করছে তাদের ছাড় দেয়া হবেনা। উপজেলা প্রশাসনের মধ্যমে অভিযান অব্যাহত থাকবে।