উন্নয়নের সঙ্গে সুশাসনও দরকার

58

মো. মইনুল ইসলাম ::
স্বল্পোন্নত বাংলাদেশ উন্নয়ন ও অগ্রগতি চায়। কয়েক দিন আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁদের বর্তমান মেয়াদের চার বছরপূর্তি উপলক্ষে এক ভাষণে উন্নয়নের মহাসড়ক ধরে দেশ এগিয়ে চলেছে বলে দাবি করেছেন। এটা সত্য যে গত ৯ বছরে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে। অর্থনীতির এই উন্নয়নের ফলে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে আমরা পরিণত হয়েছি। আশা করা যায়, ‘স্বল্পোন্নত’ দেশের পর্যায় থেকে দু-এক বছরের মধ্যে আমরা ‘উন্নয়নশীল দেশের’ পর্যায়ে উন্নীত হব। আমরা বিশ্বের দরবারে সম্মানজনক আসনে অধিষ্ঠিত হতে চলেছি, তা কম গৌরবের কথা নয়। আমাদের এই অগ্রগতি আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসা কুড়িয়েছে।
আমাদের বড় ধরনের অগ্রগতি ঘটেছে কৃষি, খাদ্য, ভূমি ও পল্লী উন্নয়নে। চার বছর আগে যেখানে খাদ্য উৎপাদন ছিল প্রায় তিন কোটি মেট্রিক টন, সেখানে বর্তমান বছরে খাদ্যশস্য উৎপাদন প্রায় চার কোটি টনে দাঁড়িয়েছে। গেল বছর হঠাৎ বন্যার কারণে বোরোধানপ্রধান পাঁচটি জেলায় ব্যাপক ফসলহানির ফলে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন অনেকটা ব্যাহত হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগপূর্ণ বাংলাদেশে অবশ্য খাদ্যে দীর্ঘমেয়াদি স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন কঠিন ব্যাপার। তা ছাড়া আছে ক্রমাগত বাড়তি জনসংখ্যা। তা সত্ত্বেও এ খাতে অর্জিত সাফল্যকে ছোট করে দেখার অবকাশ নেই।
শিল্পক্ষেত্রে উন্নয়নও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার অন্যতম পূর্বশত হচ্ছে শিল্পায়ন। এর ফলে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং বেকারত্ব হ্রাস পাবে। এ উদ্দেশ্যে ভৌত অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা হ্রাস, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের মতো শিল্পায়নবান্ধব নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া শিল্পায়নসহ সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি খাতের উন্নয়নে বর্তমান সরকারের সাফল্য অসামান্য বললে অত্যুক্তি হবে না।
এসব ভৌত অবকাঠামোর ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের সাফল্য যেমন প্রশংসনীয়, তেমনি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো সামাজিক অবকাঠামোর ক্ষেত্রেও তাদের অবদান উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে শিক্ষার উন্নয়নে সরকার বড় ধরনের প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। উন্নয়নের মূল নায়ক যে মানুষ এবং মানুষকে শিক্ষিত না করলে যে সত্যিকার উন্নয়ন সম্ভব নয়, এ কথাটি সরকার আন্তরিকভাবে উপলব্ধি করেছে বলে আমাদের বিশ্বাস। শিক্ষার সঙ্গে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যাপারেও তাদের উন্নয়নমূলক কর্মকা- প্রশংসার দাবি রাখে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যই যে একটি দেশের মানবসংখ্যাকে মানবসম্পদে পরিণত করে, তার উপলব্ধি ও প্রতিফলন দেখা যায় বর্তমান সরকারের নানা উদ্যোগে। অর্থনীতির নানা ক্ষেত্রে বড় ধরনের সাফল্যের ফলে দারিদ্র্য নিরসনে বর্তমান সরকার প্রশংসনীয় অগ্রগতি অর্জন করেছে।
তবে অর্থনৈতিক এই সাফল্যের সঙ্গে বিশেষ কিছু রাজনৈতিক অসাফল্যের কথাও বলতে হয়। রাজনৈতিক অসাফল্য বলতে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অনগ্রসরতার কথাই বলা হচ্ছে। এ ব্যাপারে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। আইনের শাসন ও সুশাসন এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়ন গণতন্ত্রের অন্যতম দুটি বৈশিষ্ট্য। আওয়ামী লীগের গত নির্বাচনী ইশতেহারে এ দুটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এ ব্যাপারে তেমন কোনো উন্নতি পরিলক্ষিত হয়নি। বরঞ্চ কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবনতি ঘটেছে। দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের হার লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বেতন-ভাতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও (যা ১৩১ শতাংশ) সরকারি কর্মচারীদের দুর্নীতির মাত্রা মোটেই কমেনি।
দুর্নীতির ব্যাপকতা শুধু সরকারি কর্মচারীদের দ্বারাই সৃষ্টি হয়নি। এর সঙ্গে রাজনীতিকরাও যুক্ত। যখন যে দল ক্ষমতায় আসে দুর্নীতিবাজরা সে দলের নেতাকর্মী সেজে যায়। এমনকি কেউ কেউ সংসদ সদস্যও হয়ে যায়। তাদের আসল উদ্দেশ্য থাকে ক্ষমতা ও সম্পদ অর্জন, জনগণের ভাগ্যোন্নয়ন নয়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘রাজনীতিকরা ভালো হলে দেশে দুর্নীতি ৫০ শতাংশ কমে যাবে।’
উন্নয়ন ও গণতন্ত্রকে দরিদ্রবান্ধব এবং জনগণের ক্ষমতায়নের হাতিয়ার করতে হলে দুর্নীতিবিরোধী যুদ্ধকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। অন্যদিকে সন্ত্রাস তথা গুম, খুন, অপহরণ, মুক্তিপণ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর অন্যায়-অবৈধ কাজ ও জুলুম-নির্যাতনকে শক্ত হাতে দমন করতে হবে। এসব সুশাসন ও আইনের শাসনের অভাব প্রমাণ করে।
মানুষ চায় অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল সবাই যেন পায়। সেটা সমান না হোক, অন্তত যেন ন্যায়সংগত হয়। ধনবৈষম্য গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। দেশবাসী চায়, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক অভিযান বা সংগ্রাম পরিচালিত হোক। অন্যদিকে দেশের শিক্ষিত, সচেতন ও সুধীসমাজ সুশাসনের পক্ষে এবং ঘুষ, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলুক। আমাদের বিশ্বাস, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ দেশের মানুষের কল্যাণের ব্যাপারে যথেষ্ট আন্তরিক। তাঁর মতো দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রনায়কের নেতৃত্বে অর্থনৈতিক উন্নয়নযজ্ঞের সঙ্গে সুশাসন ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়নের মতো গণতন্ত্রায়নের লড়াইটাও সমভাবে চলুক। দেশবাসী উন্নয়নের সঙ্গে গণতন্ত্রের প্রসারও চায়।