মাতৃভাষার জন্য রক্তদান ইতিহাসে বিরল 

144
এ.কে.এম শামছুল হক রেনু ::
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ভারতবর্ষ থেকে পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের জনগোষ্ঠির ভাষা, কৃষ্টি ও সভ্যতার সাথে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশ) জনগোষ্ঠির ভাষা, কৃষ্টি, সভ্যতা ও সাংস্কৃতির মধ্যে ছিল বিশাল ব্যবধান। তাদের ভাষা ছিল পাঞ্জাবী, বেলুচি, পশতু, সিন্ধি এবং বেশীর ভাগ লোকেরই ভাষা ছিল উর্দু। আর  তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশ) ভাষা ছিল বাংলা। তন্মধ্যে বাংলাদেশে বসবাসকারী বিহারী এবং পুরান ঢাকায় বসবাসকারী হাতে গোনা মুষ্টিমেয়দের ভাষা ছিল আধা উর্দু এবং বাংলা।
 পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানিদের ভাষার মধ্যে ছিল বিরাট ফাড়াক। যে কারণে ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হওয়ার পর থেকে ১৯৪৮, ১৯৪৯, ১৯৫০, ১৯৫১ ও ১৯৫২ সাল থেকেই বাংলা ভাষা আন্দোলনের প্রস্তুতি পর্ব তৈরী হয়েছিল। ৫২-র ভাষা আন্দোলন, ৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯-র গণ অভ্যুথান, মওলানা ভাসানীর ১৪ দফার আন্দোলন, ৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা অর্জন একই সূত্রে গাঁথা। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের মতো বিশ্বের কোন জাতি, গোষ্ঠি তাদের মাতৃভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য রাজপথে যেমনি শাসক গোষ্টির বেয়নেট, বুলেটের কাছে বুকের তাজা রক্ত বিলিয়ে দেয়নি, তেমনি কারাগারে অমানষিক, অমানবিকভাবে নির্যাতিতও হয়নি। এই ভাষা আন্দোলনকে ঘিরে রয়েছে সুবিন্যস্থ হৃদয় বিদারক ও মর্মান্তিক ইতিহাস। যাদের ত্যাগের কথা আজো দেশের মানুষ গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে থাকে বলেই ৫২-র ২১শে ফেব্রুয়ারীকে (বাংলা ৮ই ফাল্গুন) আজো মানুষ ভুলে যায়নি।
২১শে ফেব্রুয়ারীর প্রত্যুষে ছাত্রছাত্রী, তরুন, যুবক, বৃদ্ধ, বৃদ্ধাসহ দেশের ছোট বড় সহ সর্বশ্রেণীর মানুষ “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো ২১শে ফেব্রুয়ারী আমি কি ভুলিতে পারি” সমবেত কন্ঠে এই অমর সংগীতের মধ্য দিয়ে শহীদ মিনারের বেদীতে পুষ্পার্ঘ্য দানে সমবেত হয়। আজ বাংলা ভাষা যেমনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা, তেমনি গৌরব ও অহংকারের বিষয়। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘের ইউনোস্কোর (টঘঊঝঈঙ) এক ঘোষণায় ২১শে ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে থাকে। যে কারণে এ দিবসটিকে দুনিয়ার অন্যান্য দেশও যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে পালন করে থাকে।
ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই পাকিস্তানি শোষকদের কাছ থেকে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে ছিনিয়ে আনা হয়েছে লাল সবুজের পতাকাবাহী বাংলাদেশের স্বাধীনতা। যে কারণে ৫২-র ভাষা আন্দোলনকে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে সামনে নেয়ার সুযোগ কারো কল্পনাতেও আসেনা।
বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি” এর প্রতিটি অক্ষরের সাথে যেমনি মিশে রয়েছে দেশপ্রেমিক স্বাধীনতাকামী ছাত্র, যুবক, কৃষক, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবি, পেশাজীবি, মুক্তিযোদ্ধা, মা, বোন, জাতি, ধর্ম, গোত্র, রাজনৈতিক দলসহ সকলের অবদান, তেমনি রয়েছে ৫২, ৬২, ৬৯-র আন্দোলনকারী, জীবন উৎস্বর্গকারীদের অপরিসীম অবদান ও ত্যাগের মহিমার উজ্জ্বল নিদর্শন। ভাষা আন্দোলনে শুধু সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার ও শফিকই শহীদ হননি। তাতে রয়েছে তদানীন্তন শাসক গোষ্টির বেয়নেট, বুলেট ও নির্যাতনে নিহত, আহত আরো নাম জানা, না জানা অনেকেরই অপরিসীম অবদান ও স্মৃতির তর্পন। তাছাড়া ভাষার জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে কারাগারের নির্মম প্রকোষ্টে থাকা অনেকেরই রয়েছে অমানবিক নির্মমতার ইতিহাস। এসবের পেছনে ছিল মায়ের ভাষা, মুখের ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করার আন্দোলন। কারাগারের প্রকোষ্টে নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করায় যেমনি অনেকেই ভাষা আন্দোলনের সফলতা দেখে যেতে পারেনি, তেমনি ১৯৭১ সালের অপরাহ্ন থেকে বিশ্বের মানচিত্রে স্থান পাওয়া সুশোভিত লাল সবুজের পতাকাকেও দেখে যাওয়ার আগেই অনেকেই নির্মম, নিষ্ঠুরভাবে আহত নিহত হয়ে প্রাণ দিতে হয়েছে। তাহারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা এ স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখে যেতে না পারলেও দেশ মাতৃকার সূর্য সন্তান ও দেশ প্রেমিকদের এ সমস্ত অবদানের স্মৃতি তর্পন ও ইতিহাস অম্লান, চিরভাস্কর, চিরস্মরণীয় ও চিরঞ্জিব। তাই কবি জীবনানন্দ দাস লেখেছেন “বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে চাইনা আর”।
যত দিন বাংলাদেশ থাকবে, কিয়ামত না হওয়া পর্যন্ত এদেশের মানুষের ললাটে স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস ও ২১শে ফেব্রুয়ারী একই সূত্রে গ্রথিত ও উচ্চারিত হবে আমরা তোমাদের ভুলবনা, ভুলতে পারিনা। উচ্চারিত হবে, তোমরা আমাদের অহংকার, স্বাধীনতা ও মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠার চিরঞ্জিব দেশপ্রেমিক। তোমরা মরিয়াও অমর, অব্যয়, অক্ষয় ও শ্বাসত।
১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ তদানীন্তন পাকিস্তানের বড় লাট (গভর্ণর) মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় কার্জন হলে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, টৎফঁ ধহফ ড়হষু টৎফঁ ংযধষষ নব ঃযব ংঃধঃব ষধহমঁধমব ড়ভ চধশরংঃধহ অর্থাৎ উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এ বক্তব্যের পর অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবদুল মতিন (ভাষা সৈনিক) চীৎকার করে বলে উঠলেন, নো- নো- বাংলাই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। একথা শোনার পর জিন্নাহ তড়িঘড়ি বক্তৃতা শেষ করে তার সিকিউরিটিসহ স্থান ত্যাগ করেন। তারপর আব্দুল মতিনসহ অন্যরা সভাস্থল থেকে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে মিছিল নিয়ে বেড় হয়ে পড়েন। ৫২-র ২১শে ফেব্রুয়ারী ভাষা আন্দোলনের সময় রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার, শফিকসহ আরো অনেকেই আহত, নিহত (শহীদ) হলেও এর অনেক আগ থেকেই ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয়ে থাকে।
জানা যায়, সেই সময় পুলিশের বুলেট ও বেয়নেটের আঘাতে অনেকেই মুমূর্ষ অবস্থায় হাসপাতালে গিয়ে যেমনি সু-চিকিৎসার সুযোগ পায়নি, তেমনি বাড়ীতে গিয়েও পুলিশের হয়রানীর শিকার ও গ্রেফতার হয়ে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়। তাছাড়া ভাষা আন্দোলন নিয়ে রয়েছে প্রথিতযশা লেখক, প্রাবন্ধিক, নিবন্ধক, সাংবাদিকসহ বেঁচে থাকা ভাষা সৈনিকদের স্মৃতির নিরিখে অনেক বইপুস্তক অনেক কথা, স্মৃতি তর্পন ও বর্ণনা যা অনেকেই তা জানে না এবং তা সংগ্রহের ব্যাপারে এ পর্যন্ত কোন সরকারেরই তেমন সন্তোষজনক উদ্যোগও লক্ষ্য না করার মতই বলে অনেকেই মনে করে থাকে। তাছাড়া এ ব্যাপারে তথ্য, তত্ত্ব, উপাত্ত সংগ্রহ করে আজকের প্রজন্ম ও জাতিকে অবহিত করার মতো তেমন উদ্যোগও চোখে না পড়ার মতই বলা চলে। যাকে জাতির দুর্ভাগ্য হিসেবে মনে করার মতো কারণকেও ফেলে দেয়া যায়না।
প্রতিবছর ২১শে ফেব্রুয়ারী আগমনের আগে ভাগে এবং ঐ দিনে এ নিয়ে একটু সরব দেখা গেলেও বাস্তবে ২১শে ফেব্রুয়ারীর পর থেকেই সব যেন কিছু ঢিলেঢালা ও স্থিমিত হয়ে যেতে দেখা যায়। এ প্রসঙ্গে একটি ছোট উদাহরণ তোলে না ধরলেই নয়। এক সময় একজন প্রথিতযশা সাংবাদিক ভিয়েতনাম সফরে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফিরে এসে তিনি লিখলেন ১৫ দিন ভিয়েতনাম ঘুরে এলাম তাদের দেশের ভাষা ছাড়া ইংরেজিতে লেখা কোথায়ও একটি সাইনবোর্ডও চোখে পড়েনি।
গুরুদয়াল কলেজের শিক্ষার্থী হিসেবে ও ছাত্রজনতা একসাথে মিলিত হয়ে ১৯৭০ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারীর বিকেলে সমস্ত কিশোরগঞ্জ শহর ঘুরে এসডিও, এসডিপিও, সিও (ডেড) অফিস, শিক্ষা অফিস, মুন্সেফী আদালতসহ যে কোন অফিস ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে ইংরেজিতে লেখা সাইনবোর্ড পাওয়া যায় তা যেমনি ভেঙে ফেলা হয়, তেমনি অনেক সাইনবোর্ড একসাথে করে শহীদ মিনারে নিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। সেই দৃশ্যের কথা আমার মতো অনেকেই আজো ভুলতে পারেনি। কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখা যায় স্বাধীনতার ৪৭ বছরেও অফিস আদালত ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অনেক সাইনবোর্ড এখনো যেমনি ইংরেজিতে স্থান পাচ্ছে, তেমনি সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের কথা বলা হলেও অফিস আদালতে আজো বেশীর ভাগ কাজকর্মই ইংরেজিতে পরিচালিত হয়ে আসছে। ২০১৭ সালে ফেব্রুয়ারীর ১ মাস একটি বেসরকারী সংস্থা ও কিছু শিক্ষার্থী একটি পরিসংখ্যানে উল্লেখ করেছে মহান ২১শে ফেব্রুয়ারী মাসে অফিস আদালতসহ সর্বত্র বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই
বাংলার স্থলে ইংরেজি কম গুরুত্ব পায়নি। মহান ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা ও বাংলা ভাষার মূল্যায়ন দিতে গিয়ে অন্ততঃ ফেব্রুয়ারী মাসটিকে মূল্যায়ন করা হলে মানুষের মনে মহান এই মাসের তাৎপর্য বিশেষভাবে স্থান করে নিত বলে অনেকেরই ধারণা। তদোপরি ভাষা আন্দোলনে পাকিস্তানী শাসকদের বুলেটে ও বেয়নেটে যারা শহীদ হয়েছেন, তারপর যে সমস্ত ভাষা সৈনিক এখনো বেঁচে আছেন তারাও যদি বাংলা ভাষার মূল্যায়ন দেখে যেতে পারতেন তবে হয়তোবা তারা যথেষ্ট শান্তনা নিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় হতে পারতেন।
২১শে ফেব্রুয়ারী জাতীয় শহীদ মিনারসহ দেশের জেলা, উপজেলা, স্কুল, কলেজ, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়সহ সর্বত্র শহীদ মিনারে রাত ১২.০১ মিনিট থেকে শুরু করে প্রায় সারাদিন পুষ্পস্তবক অর্পনসহ বিভিন্ন সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠান এ দিনটিকে যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে স্মরণ করে মাসব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ করে থাকে। এ সমস্ত অনুষ্ঠানে বিভিন্ন শ্রেণী পেশা ও রাজনৈতিক ঘরাণার লোকজন বক্তব্য দিলেও বাস্তবে ২১শে ফেব্রুয়ারী দিবসটি অতিবাহিত হওয়ার পর নিজের বক্তব্যের সারমর্ম অনুশীলনতো দুরের কথা পরবর্তী সময় এ বিষয়ে তাকিয়েও দেখা হয়না। যা একগুচ্ছ বক্তৃতা ও পংক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ বলে অনেকেই মনে করে থাকে।
একটু লক্ষ্য করলে দেখা যায়, জাতীয় শহীদ মিনার থেকে শুরু করে দেশের অন্যান্য শহীদ মিনারে কে কার আগে ফুল দিবে এ নিয়ে প্রতিযোগিতা হয়। শুধু তাই নয় শহীদ মিনারের বেদীতে কে কোন নেতার ছবি টাঙ্গাবে এ নিয়েও প্রতিযোগিতার শেষ থাকেনি। যা নিয়ে আইন শৃংখলা বাহিনীর অক্লান্ত পরিশ্রমের দৃশ্যপট এড়িয়ে যাওয়ার নহে। অনেকেই মনে করে থাকে শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পন এবং বেদীতে ছবি টাঙ্গানোর যে প্রতিযোগিতা হয় এমনিভাবে যদি দেশে    অন্ততঃপক্ষে মহান ভাষার মাস ফেব্রুয়ারীতে সর্বক্ষেত্রে বাংলা ভাষা এবং এই দিনটির তাৎপর্য ও ৫২-র ভাষা শহীদদের স্মরণে অফিস আদালত বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান থেকে ইংরেজি সাইনবোর্ড সরিয়ে ফেলা হতো তবে কম হলেও ভাষার এ মাসটিকে যথাযোগ্য মর্যাদা ও স্মরণ করা হয় বলে মনে করা হতো।
এবারের ২১শে ফেব্রুয়ারীর জেলা পর্যায়ের একটি প্রস্তুতিমূলক সভায় যথাযথ কর্তৃপক্ষের চিঠি পেয়ে ০১/০২/১৮ ইং উপস্থিত ছিলাম। সেই সভায় গতানুগতিকভাবে অনেকে কথা বলার মাঝে প্রবীন শিক্ষক ও আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষাগুরু অধ্যাপক প্রাণেশ কুমার চৌধুরী (প্রাণেশ স্যার) ২১শে ফেব্রুয়ারীর প্রস্তুতির লক্ষ্য একটি বাস্তব সম্মত অর্গানোগ্রাম তুলে ধরেছেন। সম্প্রতি একটি কাগজে একজন ভাষা সৈনিক নিবন্ধে বলেছেন, স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে বলা আছে, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। যার মানে জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে বাংলা ব্যবহৃত হবে। ৫২-র শ্লোগানও ছিল সর্বস্তরে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। কিন্তু এর বাস্তবায়ন আজো হয়নি। এদেশে এখনো ঔপনিবেশিক রাজভাষা ও পাকিস্তানী আমলের তকমা ও সংস্কৃতি বহাল তবিয়তেই আছে। ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষায়াতন আজো বিশাল। কিন্ডারগার্টেন থেকে শুরু করে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়েও বাংলা ভাষার উপর সরকারের যেন নিয়ন্ত্রন নেই। দুই এক জায়গা ছাড়া বাংলা পঠনও দৃশ্যমান হয়না। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেছেন তাহলে এটাকে ২১শে চেতনার কথা না বলে অন্য কিছু বললে কী তাতে দোষের কিছু থাকতে পারে? এ বিষয়গুলো এ পর্যন্ত কেন শাসক গোষ্ঠির নজরে আসেনা বলেই মনে করার কারণ না থাকার কথা নয়। কারণ তারা মনে করেন না যে বাংলা ভাষার মাধ্যমে শিক্ষার সমার্পন হোক। তিনি আরো মনে করেন, ঔপনিবেশিক ধ্যান ধারণা ও পাকিস্তানী মন মানসিকতা ও ধ্যান ধারণা থেকে আমাদের মুক্তি আজো হয়নি।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ধান গাছ দিয়ে তক্তা হয় এ কালচার থেকে অনেক বাংলা মায়ের সন্তান সরতে পারেনি। কারণ বিদেশী কালচারে তারা পড়ালেখা করে থাকে। ১ ফেব্রুয়ারী থেকেই মহান ভাষা আন্দোলনের রক্ত ঝরা ভাষা আন্দোলনের সংগ্রামী মাস শুরু হয়ে গেছে। যেখানে যে অনুষ্ঠানে যাওয়া যায় সবখানেই অনেকের মুখ থেকে বাংলা ভাষার জয়গান ও সর্বস্তরে বাংলা প্রচলন নিয়ে যেমন খই ফোটে। তবে বাস্তবে বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ যেমনি বক্তৃতার মধ্যে সীমাবদ্ধ তেমনি এর বাস্তবায়নে ফানুস ও বাতাসে ফোলানো বেলুনের মতই অন্তঃসার শূণ্য।
কথা নয়, এত বছর হলেও, সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু ও যাতে এর প্রতিফলন হয় এবং জ্ঞান তাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর উক্তিতে ধান গাছ দিয়ে তক্তা বানানোর অপ-সংস্কৃতি থেকে বেড়িয়ে এসে বাস্তবতার দিকে ধাবিত ও অনুপ্রাণিত হওয়া যায়, ইহাই হোক আমাদের প্রত্যাশা। বাংলা আমাদের প্রাণের ভাষা, বাংলা আমাদের মায়ের ভাষা, বাংলা আমাদের কৃষ্টি সংস্কৃতি। সর্বস্তরে বাংলা চালু ইহাই হোক মহান স্বাধীনতা ও রক্তের দানে অর্জিত ৫২’র ভাষা আন্দোলনের স্বীকৃতি।
এ.কে.এম শামছুল হক রেনু : লেখক কলামিষ্ট