খালেদা জিয়ার জেলে যাওয়ার পর….

35

সবুজ সিলেট ডেস্ক
৮ ফেব্রুয়ারি বিকাল থেকে বেগম জিয়া কারাবন্দি রয়েছেন। সেদিন থেকেই খালেদা জিয়া টক অব দ্য কান্ট্রি। সকল মিডিয়ায় এখন তিনিই প্রধান খবর। টেলিভিশনের টক শো থেকে পত্রিকার খবরে ও সম্পাদকীয়তে, রাজনৈতিক বক্তব্যে, বাসাবাড়ির ড্রয়িংরুম থেকে চায়ের দোকানে সবখানে সব আলোচনায় এখন প্রধান বিষয় খালেদা জিয়ার কারাবাস। এক কথায় এ মুহুর্তে বাংলাদেশে সপ্তাহব্যাপী অব্যাহতভাবে উচ্চারিত নামটি খালেদা জিয়া। ১৯৯১ সালে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্টিত সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আভির্ভুত হওয়ার প্রথম কয়েক দিন ছাড়া খালেদা জিয়া তার প্রায় পয়ত্রিশ বছরের রাজনৈতিক জীবনে আর কখনো এভাবে দীর্ঘসময়ব্যাপী দেশবাসির একটানা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেননি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়া ও বিএনপির সাথে এদেশের মানুষের সম্পর্ক, আগ্রহ ও বন্ধন ঠিক ততটাই যতটা বিগত এক সপ্তাহে সকল ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাথে সাথে প্রতিটি মানুষের ভাবনায় ও কথায় খালেদা জিয়া ও বিএনপি প্রসঙ্গ এসেছে। এভাবেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়া ও বিএনপি প্রাসঙ্গিক। বিএনপি পক্ষের সকল সহানুভূতি ও প্রতিপক্ষের সকল আক্রোশের বাইরেও খালেদা জিয়াই এখন এদেশের সব মানুষের ‘রাজনীতি’। এরুপ রাজনৈতিক আলোচনায় খালেদা জিয়া ও বিএনপির ভবিষ্যৎ, স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত সকল সরকারের আমলে সংঘটিত দুর্নীতির তুলনামুলক চিত্র ও পরিসংখ্যান এবং আগামী সংসদ নির্বাচন এ তিনটিই প্রধান এজেন্ডা।

বেগম জিয়া জেলে যাওয়ার পর বিএনপি যেন কোন অদৃশ্য শক্তিতে এত দিনের হারানো রাজনীতি ফিরে পেয়েছে। প্রায় চৌত্রিশ বছর একটানা বিএনপির চেয়ারপার্সন থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাস দলটির জন্য নেতিবাচক প্রভাবের পরিবর্তে ইতিবাচক প্রভাব বয়ে এনেছে। দলটির তরুণ সমর্থকদের কাছে তিনি নেত্রী থেকে ‘মা’তে পরিণত হয়েছেন। তাই বেগম জিয়ার জেলে যাওয়ার পর দলটির প্রতিটি স্তরের নেতা, কর্মী ও সমর্থকবৃন্দের মনে তাদের প্রিয় নেত্রীর প্রতি যে সহানুভুতি সৃষ্টি হয়েছে তাতে নেত্রীর পাশাপাশি দলটির প্রতি তাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা বেড়ে গিয়েছে। এরুপ পরিস্থিতিতে তারা এখন দলের জন্য মরিয়া হয়ে যে কোনও ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তত রয়েছেন তা সপ্তাহব্যাপী তাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও তৎপরতায় স্পষ্ট হয়েছে। বিএনপির যারা এতদিন নিষ্ক্রীয় বা কম সক্রিয় ছিলেন তারাও সক্রিয় হয়ে গিয়েছেন। যারা বিভিন্ন কারণে এতদিন দল থেকে দুরে ছিলেন তারাও অনেকে দলটির সাথে আবার একাত্ম হয়ে যাচ্ছেন। জোটের শরিক দলগুলোও সরাসরি কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। সব মিলিয়ে খালেদা জিয়াকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও বিএনপিপন্থী সকলেই এখন একাট্টা। তাই বেগম জিয়া জেলে যাওয়ার পর সাংগঠনিকভাবে দলটি ক্ষতিগ্রস্ত নয়, বরং আরও সুদৃঢ় হয়েছে।

খালেদা জিয়া জেলে যাওয়ার পর সারা দেশে দ্বিতীয় সর্বাধিক উচ্চারিত ও আলোচিত শব্দটি দুর্নীতি। দুই কোটি টাকার দুর্নীতিকেন্দ্রিক একটি মামলায় বেগম জিয়ার পাঁচ বছরের সাজা হয়েছে দুর্নীতি করার অপরাধে নয়, বিশ্বাস ভঙ্গের অপরাধের কারণে। তবে দুর্নীতির এ মামলায় নি¤œ আদালতে বেগম জিয়ার সাজা হওয়ার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুর্নীতির বিষয়টি মিডিয়া থেকে গ্রামের চায়ের দোকান পর্যন্ত সর্বত্র সর্বস্তরের মানুষের কাছে এখন ব্যাপকভাবে আলোচিত বিষয়। বিভিন্ন তথ্য, উপাত্ত ও পরিসংখ্যানের মাধ্যমে স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রীয় সকল দুর্নীতির মাত্রা, ব্যাপকতা, আকার, আয়তন, পরিমাণ ও সংশ্লিষ্টতা এখন মিডিয়ার সাথে সাথে আমজনতার মুখে মুখে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য প্রতিটি পক্ষই পরস্পরের দুর্নীতির হিসাব জনগণের সামনে উদ্ঘাটন করে চলেছেন। দুর্নীতির বিষয় দেশবাসির সামনে স্পষ্টকরণ ও উন্মোচন বিএনপির জন্য এখন রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতায় পরিণত হয়েছে। এটা নিঃসন্দেহে একটা ভালো দিক যে বাংলাদেশে কোন রাজনৈতিক দল দুর্নীতির সাথে এযাবৎকাল কতটা সম্পৃক্ত হয়েছেন এবং কি পরিমাণ দুর্নীর্তি করেছেন তা এখন জনগণের আগ্রহের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বহুমুখী তথ্য প্রবাহের এ সময়ে বিভিন্ন সরকারের দুর্নীতির চিত্র ও অঙ্ক সম্পর্কে দেশবাসি স্পষ্ট ধারণা পেয়ে যাচ্ছেন। এক সরকারের সাথে আরেক সরকারের দুনীর্তির ব্যাপকতার তুলনামুলক পরিসংখ্যানও এখন উঠে আসছে। এসব থেকে খালেদা জিয়ার সাজা কতটা রাজনীতি সংশ্লিষ্ট এবং কতটা দুর্নীতি সংশ্লিষ্ট তা এখন জনগণের কাছে প্রমাণসহ প্রতীয়মান হয়ে যাচ্ছে।

খালেদা জিয়া জেলে যাওয়ার পর সারা দেশে আরেকটি আলোচিত বিষয় হচ্ছে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ। আগামীতে আরেকটি বিএনপিবিহীন নির্বাচন না জনগণের অংশগ্রহণে সর্বদলীয় সংসদ নির্বাচন তা এখন স্পষ্ট নয়। তবে বিএনপির ভবিষ্যৎ এবং এদেশে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ এখন একাকার হয়ে আগামী দিনে যে জনগণের ভোটের সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচন্ড চাপ তৈরি হবে তার লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিএনপি তাদের রাজনীতিকে শুধুমাত্র খালেদা জিয়া কেন্দ্রিক না রেখে যে নির্বাচনকেন্দ্রিক পরিকল্পনায় এগিয়ে যাচ্ছে তা কয়েকদিনের কর্মসূচির ধরণ ও তৎপরতায় স্পষ্ট। এখন এ অবস্থায় বিএনপি নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য বা এক কথায় জনগণের ভোটাধিকারের জন্য তথা জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য যে দাবি সামনে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সে দাবির সাথে এদেশের শতকরা কতজন ভোটারের সমর্থন আছে তার উপর অনেকটা নির্ভর করে আগামী দিনের সংসদ নির্বাচন ও নির্বাচন পরবর্তী রাজনীতি। নিজের ভোট নিজে দিতে চায় না, অন্যের হাতে সমর্পণ করে দিতে চায় এরকম ব্যক্তিত্বহীন, অক্ষম ও অধিকার সচেতনতাহীন নাগরিক এই মহান মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে বিরল। সুতরাং বিএনপির এই নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবির প্রতি জনমত ও সমর্থন দিনে দিনে বৃদ্ধি পাবে।

দুর্নীতি সংশ্লিষ্টতায় বেগম খালেদা জিয়ার কারাদন্ডের পর আগামীতে যেমন সকল দুর্নীতি উন্মোচিত ও আলোচিত হওয়ার মাধ্যমে দুর্নীতিবিরোধী জনমত প্রবল হবে, একইভাবে রাজনৈতিক সকল অনাচারের বিপক্ষেও জনগণ সোচ্চার হবে। যত রকমের রাষ্ট্রীয় অনাচার আছে ভোট দুর্নীতি হচ্ছে তার গেটওয়ে। জনগণ এই ভোট দুর্নীতি আর সহ্য করবে কিনা এবং বিএনপি তার সকল শক্তি নিয়োজিত করে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে জনগণের ভোটাধিকার আদায় করতে সক্ষম হবে কিনা তার উপর নির্ভর করে আগামী সংসদ নির্বাচন কেমন হবে। তবে দেশের প্রধান দুটি দলের একটির চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী একটি টাকাও আত্মসাৎ না করে বিশ্বাস ভঙ্গের অপরাধে কারাদ-প্রাপ্ত হবেন আর অন্যদিকে সংবিধান ও জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে কেউ জনগণের ভোটাধিকার আত্মসাৎ করবেন এটা স্থায়ী হবে না। প্রতিটি দুর্নীতির যেমন বিচার হবে, ভোট দুর্নীতিরও অবসান হবে। জনগণের ভোটাধিকার হরণের চেয়ে বড় রাজনৈতিক অপরাধ আর কি আছে? দুর্নীতি, ভোট আত্মসাৎ ও সকল রাজনৈতিক অপরাধের বিপক্ষে আগামী সংসদ নির্বাচনই টার্নিং পয়েন্ট যা শুরু হয়েছে বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাসের মাধ্যমে। আর আগামী সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনীতির টার্নিং পয়েন্টে এসে এবার মুখোমুখি দুটো পক্ষই ’পয়েন্ট অব নো রিটার্নে। সুতরাং বলা যেতে পারে যে আগামী সংসদ নির্বাচনেই আসছে ‘রাজনীতি’।