প্রাথমিক শিক্ষা

22

কাজী আবু মোহাম্মদ খালেদ নিজাম ::

শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। শিক্ষা ছাড়া কোন জাতি উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছতে সক্ষম হয় না। যে জাতি যত শিক্ষিত সে জাতি তত উন্নত। সব ধরনের শিক্ষার ভিত্তিমূল হলো প্রাথমিক শিক্ষা। মানুষ জীবনের শুরুতে এ শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে। অনেকের পক্ষে এই শিক্ষা গ্রহণও সম্ভব হয় না। প্রাথমিক শিক্ষা আনুষ্ঠানিক প্রচলন কবে থেকে চালু হয় তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন। বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায় আনুমানিক ৩০০০ বছরেরও পূর্বে এ উপমহাদেশে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বীজ রোপিত হয়, যা কালের আবর্তনে বর্তমান অবস্থায় উপনীত হয়েছে। প্রাচীন যুগে শিক্ষার মূল লক্ষ্য ছিল আত্মার উন্নতি সাধন। যার জন্য প্রয়োজন হতো সাধনা, চিন্তা ও আত্মসংযম।

ঐতিহাসিকদের মতে বৈদিক যুগে এদেশে বিশেষ এক ধরনের প্রাথমিক শিক্ষার প্রচলন ছিল। সেক্ষেত্রে শিক্ষাকাল ছিল একাধারে ১২ বছর। এর মধ্যে প্রথম স্তরে শিশু ৫ বছর বয়সে বিদ্যারম্ভ বা হাতেখড়ি নিত। এটা ছিল প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তিস্তর। মধ্যযুগে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর নবুয়ত প্রাপ্তি এবং ইসলাম ধর্মের প্রচার সাত শতকে আরবদের মাঝে এক নব জাগরণের সূচনা করে। খ্রিস্টীয় আট শতকে সিন্ধুরাজ দাহিরকে পরাজিত করে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের মাধ্যমে ভারতভূমিতে প্রথম মুসলিমদের আগমন ঘটে। বখতিয়ার খিলজী কর্তৃক নদীয়া জয়ের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে মসজিদ, মক্তব ও মাদ্রাসা স্থাপন করেন। এর মাধ্যমে মুসলিম শাসকগণ শিক্ষাবিস্তারে অবদান রাখেন। এর মধ্যে মক্তবের শিক্ষা ছিল মুসলিম ধারার প্রাথমিক শিক্ষাস্তর যার চর্চা শুরু হতো ৭ বছর বয়সে। ইংরেজ শাসনামলের প্রথম দিকে এদেশে প্রাথমিক শিক্ষা বিস্তারের তেমন অগ্রগতি হয়নি। তখন প্রাথমিক শিক্ষা বিস্তারে জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে তেমন আর্থিক বরাদ্দ ছিল না।

এখন প্রাথমিক শিক্ষা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত যা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমান সময়ে প্রাথমিক শিক্ষা এক যুগান্তকারী সময়ে প্রবেশ করেছে। নব্বই দশকের গোড়ার দিকে এদেশে প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করা হয়। বাড়ানো হয় নানা সুযোগ সুবিধা। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশাপাশি রয়েছে কে জি স্কুল, ইবতেদায়ী মাদ্রাসাসহ নানা প্রতিষ্ঠান। ভিত্তি যেমন দুর্বল বা সুদৃঢ় না হলে দালানের কাঠামো নড়বড়ে হতে পারে তেমনি জীবনের শুরুতেই প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন সঠিকভাবে না হলে পুরো শিক্ষাজীবনও সুদৃঢ় হবে না। এজন্য প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব সর্বাধিক। দেশের সব মানুষের শিক্ষা গ্রহণের অধিকার রয়েছে। এরপরও অভিভাবকের সচেতনতা কাম্য। কারণ মা-বাবা বা অভিভাবক যদি সচেতন না হলে তাহলে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। জীবন হয়ে পড়ে লক্ষ্যহীন। বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দিচ্ছে সরকার। দেয়া হচ্ছে পুরো সেট নতুন বই, উপবৃত্তি, মিড ডে মিল, নানা ধরনের শিক্ষাসামগ্রীসহ অনেক কিছু। পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষকদের নতুন ও আধুনিক প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হচ্ছে। তবে বেতন বৈষম্য রয়ে গেছে আজো। ধীরগতিতে রয়ে গেছে শিক্ষকদের প্রমোশনের মতো পদক্ষেপগুলো। সবার জন্য মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার কথা বলা হচ্ছে। নতুন, সুবিশাল ও সুদৃশ্যভবন তৈরী, নতুন নতুন প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনসহ নানা ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। জাতীয় উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রাথমিক শিক্ষা সংবিধানের ১৭(ক), (খ) ও (গ) অনুচ্ছেদে বালক বালিকাদের জন্য অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাসহ নিরক্ষরতা দূরীকরণের লক্ষে পদক্ষেপ গ্রহণের কথাও বলা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষাকে আরো বেগবান করতে নানা সংকটের সমাধানসহ উপযুক্ত শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। বাড়াতে হবে প্রাথমিক শিক্ষা ক্ষেত্রে বরাদ্দের পরিমাণ। নতুন নতুন কৌশল ও পদক্ষেপের মাধ্যমে মানোন্নয়ন করতে হবে প্রাথমিক শিক্ষার।
লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক।