নেপালে বিমান দুর্ঘটনা : ওরা মিশেছিলো আমাদের সাথে

51

সৈয়দ বাপ্পী/জুমান আহমেদ ::
নিজ দেশের সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার ব্রত নিয়ে নেপাল থেকে এসেছিলো ওরা। মনের কোনে লালিত সুপ্ত স্বপ্ন যখন পাখা মেলার সময় এলো তারা চলে গেলো না ফেরার দেশে। নিজেদের সংস্কৃতি, সামাজিকতা, ধর্মীয় রীতিনীতি মানতো তারা। ক্লাস রুমেও ছিলো অখন্ড মনোযোগী। একে একে প্রতিটি পরীক্ষায় সাফল্যের ছাপও রেখেছিলো। সাফল্যের শেষ পরীক্ষাও সম্পন্ন করে তারা। ফলাফল পূববর্তী অখন্ড অবসরযাপনে স্বজনদের সাথে মিলিত হওয়ার প্রত্যয়ে আকাশে উড়াল দেয়। কিন্তু কে জানতো দূর্বিসহ বেদনা অপেক্ষা করছে তাদের স্বজনদের জন্য। সিলেটের জালালাবাদ রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১৯তম ব্যাচের ১৩ শিক্ষার্থী গত সোমবার নিজ দেশ নেপালের উদ্দ্যেশ্যে ইউএস বাংলার একটি বিমানে যাত্রী হন। স্বজনদের সাথে মিলিত হওয়ার মানসে তাদের এ যাত্রা স্বজনদের জন্য বিভিষিকাময় যন্ত্রণায় রূপ নেয় বিমানটি দুর্ঘটনায় পতিত হওয়ার সাথে সাথে।
আর এদেশের থাকা সহপাঠীদের জন্যও কষ্টের কারণ হয়ে উঠে। স্বজন হারানোর ব্যথা কেমন, তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছেন সিলেটের জালালাবাদ রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজের নেপালী শিক্ষার্থীরা। একই দেশের বাসিন্দা আর একই ক্যাম্পাসের দীর্ঘদিনের সারথিদের হারিয়ে শোকে মূহ্যমান হয়ে পড়েছে তারা। নেপালী শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি তাদের এদেশিয় সহপাঠীরাও বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। প্রতিটি পদে পদে নেপালে বিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের স্মরণ করছে। তাদের সাথে হাসি, গল্প আড্ডা আর সোনালী স্বপ্নের বুনন আর হলো না। ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনায় তারা চলে গেছে না ফেরার দেশে। প্রিয় শিক্ষার্থীদের অকাল প্রয়াণে যেমন শিক্ষকরা, তেমনি সহপাঠী কিংবা স্বদেশিদের মৃত্যুতে নেপালী শিক্ষার্থীরাও আবেগাপ্লুত। পাশাপাশি ক্যাম্পাস ও আশপাশের জনজীবনেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। কারণ নেপালী এ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসবন্দি জীবনযাপন করেননি। তারা মিশেছিলেন আশপাশের বিভিন্ন মানুষের সাথে। তারা দল বেঁধে যান স্থানীয় কালিমন্দির কিংবা বৌদ্ধবিহারে।
হাসপাতাল সংলগ্ন পল্লবী আবাসিক এলাকার রাধে মল্লিক জানান, নেপালী শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে বেশিরভাগ সময় ব্যয় করতো। তারা মূলত কেন্টিনেই সময় কাটাতো। এছাড়া অনেকে স্থানীয় কালিমন্দির কিংবা বৌদ্ধবিহারেও যায় মাঝে মাঝে। পাশাপাশি স্থানীয় অনেকের সাথেই তাদের সখ্যতা গড়ে উঠে। দীর্ঘদিন একই স্থানে বসবাস করার কারণে তারা অনেকটাই আমাদের সংস্কৃতিতে মিশে গিয়েছিলো। দুর্ঘটনার খবরে নেপালী শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি স্থানীয় অনেকেরও মন খারাপ।
হাসপাতাল সংলগ্ন চা বিক্রেতা আবুল জানান, নেপালী শিক্ষার্থীদের পদচারণায় ক্যাম্পাস সব সময় মুখরিত থাকে। তারা দলবেঁধে চা খেতো। নিজেরা নিজেদের মাতৃভাষায় কথা বললেও বেশিরভাগই ভাঙ্গা বাংলায় কথা বলতে শিখেছিলো। আমাদের সাথে টুকরো টুকরো বাংলায় কথা বলে মনের ভাব প্রকাশ করতো। দীর্ঘদিন এ ক্যাম্পাসে লেখাপড়া করার কারণে তাদেরকে আর বিদেশি মনে হতো না। তারা যেনো এদেশের মানুষে পরিণত হয়ে গিয়েছিলো।
রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজের এমবিবিএস দ্বিতীয় বর্ষের নেপালী ছাত্রী সুদিতা বাড়াল বলেন, ‘বাংলাদেশে পড়তে এসে আমরা ক্যাম্পাসকেই নিজেদের ঘর বাড়ি বানিয়েছি। বিদেশে এসেছি ডাক্তার হয়ে দেশে ফিরে মানুষের সেবা করার জন্য। এখানে আমাদের অনেক স্বদেশী ভাই বোন পড়ালেখা করেন। আবার অনেকে সিলেটের বিভিন্ন মেডিকেল থেকে পড়ে ডাক্তার হয়ে নেপালে ফিরে গিয়ে মানুষকে সেবা দিচ্ছেন।
আরেক নেপালী ছাত্রী কিরতি কুসুম বলেন, ‘ভাই বোনদের এ ধরণের মৃত্যু আমাদের কাঁদাচ্ছে। অনেকের সাথেই গত রোববারও দেখা হয়েছিল। পড়ালেখার কথা, দেশের কথা হয়েছে। কোর্স শেষ হওয়ায় তারা দেশে ফিরছিল। কয়েকদিন পর রেজাল্ট নিতে বাংলাদেশে ফিরতো তারা। অনেকদিন পর নেপাল ফেরার জন্য অনেকে মার্কেটিংও করেছিল। দেশের আত্মীয়-স্বজনরাও তাদের অপেক্ষা করছিল।
জালালাবাদ রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আবেদ হোসেন বলেন, এমবিবিএস চূড়ান্ত বর্ষের পরীক্ষা শেষে সাধারণত রেজাল্ট বের হওয়ার আগ পর্যন্ত কোনো অ্যাসাইনমেন্ট থাকে না। তাই ওই সময়ে সবাই নিজেদের বাড়িতে চলে যায়। তিনি বলেন, নেপালী শিক্ষার্থীরা অনেক মেধাবী। প্রশাসনিক ভবনের ওপরের হোস্টেলে মেয়েরা থাকতো, আর ছেলেরা ক্যাম্পাসের বাইরে হোস্টেলে থাকতো। তারা মনোযোগীও ছিল যথেষ্ট। এতো শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে আমরা শোকাহত।
জালালাবাদ রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজের সহকারী পরিচালক ডা. আরমান আহমদ শিপলু বলেন, আমাদের কলেজে প্রায় আড়াইশ নেপালী শিক্ষার্থী রয়েছে। ১৯তম ব্যাচে ১৬০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪০ জন নেপালী শিক্ষার্থী ছিলো। ফাইনাল পরীক্ষার পর তারা দেশে ফিরছিল। এ দুর্ঘটনা আমাদের শোকাহত করে তুলেছে। বিশেষ করে, নেপালী শিক্ষার্থীদের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। তারা অনেকটা ভেঙ্গে পড়েছে।
এদিকে জালালাবাদ রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নেপালী শিক্ষার্থীদের মৃত্যুতে ৩ দিনের শোক কর্মসূচি পালন করছেন। সকালে কালো পতাকা উত্তোলন, কলেজের পতাকা অর্ধনমিত রাখা ও কালো ব্যাজ ধারণ কর্মসূচি পালন করা হয়। সন্ধ্যায় নিহতদের স্মরণে কলেজ ক্যাম্পাসে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করার কর্মসূচি গৃহীত হয়।