শুভ জন্মদিন মহান শিল্পী চার্লি চ্যাপলিন

22

বিনোদন ডেস্ক::
‘আমি বৃষ্টিতে হাঁটতে ভালোবাসি, কারণ তখন কেউ আমার কান্না দেখতে পায় না।’ এই উক্তিটি হলো সেই খ্যাতিমান ব্যক্তির যিনি নিজের চোখের পানি আড়াল করে শুধু মূকাভিনয় দিয়ে অগণিত মানুষকে আনন্দ দিয়ে গেছেন। জায়গা করে নিয়েছেন অসংখ্য ভক্ত হৃদয়ে। এই যুগেও চলচ্চিত্রের বোদ্ধাদের কাছে তিনি পরম পূজনীয়। তিনি আর কেউ নন, চার্লি চ্যাপলিন। আজ এই মহান শিল্পীর জন্মদিনের এই বিশেষ আয়োজন।

পুরো নাম স্যার চার্লস স্পেনসার চ্যাপলিন জুনিয়র। ছিলেন একজন ব্রিটিশ চলচ্চিত্র অভিনেতা, পরিচালক ও সুরকার। হলিউড সিনেমার শুরুর সময় থেকে মধ্যকাল পর্যন্ত তিনি তার অভিনয় ও পরিচালনা দিয়ে সাফল্যের শিখরে আরোহণ করেন। চ্যাপলিনকে চলচ্চিত্রের পর্দায় শ্রেষ্ঠতম মূকাভিনেতা ও কৌতুকাভিনেতাদের একজন বলেও বিবেচনা করা হয়। চলচ্চিত্র শিল্প জগতে চ্যাপলিনের প্রভাব অনস্বীকার্য। ভিক্টোরীয় যুগে তার শৈশব থেকে ১৯৯৭ সালে তাঁর মৃত্যুর এক বছর পূর্ব পর্যন্ত তাঁর কর্মজীবনের ব্যাপ্তি প্রায় ৭৫ বছর এবং এই সময়ে তার বর্ণময় ব্যক্তিজীবন ও সমাজজীবনে খ্যাতি ও বিতর্ক, দুইই নিম্ন থেকে শীর্ষবিন্দু ছুঁয়ে গেছে।

যেভাবে উত্থান:
এই প্রতিভাধর অভিনেতার জন্ম ১৮৮৯ সালের ১৬ এপ্রিল ইংল্যান্ডের দক্ষিণ লন্ডনের ওয়েলওর্থের বার্লো স্ট্রিটে। তার বাবার নাম চার্লস চ্যাপলিন আর মা হানা চ্যাপলিন। বাবা-মা দুজনই বিনোদন জগতে কাজ করতেন এ জন্য স্বাভাবিকভাবেই চার্লির ভেতরেও শৈল্পিক দিকগুলো কানায় কানায় পূর্ণ ছিল। নাকের নিচে নকল ছোট গোঁফ, মাথায় টুপি, হাতে ছড়ি, ঢিলেঢালা প্যান্ট, আঁটসাঁট কোট, ঢাউস আকারের জুতো তাও আবার উল্টো করে হেঁটে বেড়াচ্ছেন আর তাই দেখে দর্শকরা হাসতে হাসতে লুটোপুটি খাচ্ছে। লোকটি যখন হাসছে, দর্শকদের চোখে তখন জল। আর লোকটি যখন কাঁদছে, তখন দর্শকদের হাসতে হাসতে দম বন্ধ হবার জোগাড়। অত্যন্ত দারিদ্র্য ও কষ্টের মাঝে শৈশব পার করেছেন বলেই হয়তো তিনি খুব ভালো করেই উপলব্ধি করতেন, আনন্দ মানুষের জীবনে কতটা প্রয়োজন।

বাবার অনুপস্থিতিতে পরিবারের আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে তাকে নয় বছর বয়সের আগেই রোজগারে নামতে হয়। আর ১৪ বছর বয়সে মাকে পাগলাগারদে পাঠানো হয়। চ্যাপলিন তার শৈশব থেকেই শিশুশিল্পী হিসেবে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন রঙ্গশালায় সফর করেন এবং পরে একজন মঞ্চাভিনেতা ও কৌতুকাভিনেতা হিসেবে অভিনয় শুরু করেন। ১৯ বছর বয়সে তিনি স্বনামধন্য ফ্রেড কার্নো কোম্পানির সাথে চুক্তিবদ্ধ হন, যারা তাকে যুক্তরাষ্ট্র সফরে নিয়ে যায়। চ্যাপলিন সেখানে হলিউড চলচ্চিত্র শিল্পের সাথে যুক্ত হন এবং ১৯১৪ সালে কিস্টোন স্টুডিওজের হয়ে বড় পর্দায় অভিনয় শুরু করেন। অচিরেই তিনি তার নিজের সৃষ্ট ভবঘুরে ‘দ্য ট্রাম্প’ চরিত্রের মাধ্যমে পরিচিতি লাভ করেন এবং তার অনেক ভক্তকূল গড়ে ওঠে। ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, পর্তুগালে ‘শার্লট’ নামে পরিচিত চ্যাপলিনের ট্রাম্প ভবঘুরে হলেও ব্রিটিশ ভদ্রজনোচিত আদব-কায়দায় সুসংস্কৃত এবং সম্মানবোধে অটুট। শার্লটের পরনে চাপা কোট, সাইজে বড় প্যান্ট, বড় জুতো, মাথায় বাউলার হ্যাট, হাতে ছড়ি আর অদ্বিতীয়তম টুথব্রাশ গোঁফ। চ্যাপলিন শুরুর দিক থেকেই তাঁর চলচ্চিত্রগুলো পরিচালনা করতেন এবং পরবর্তীতে এসানে, মিউচুয়াল ও ফার্স্ট ন্যাশনাল করপোরেশনের হয়েও চলচ্চিত্র পরিচালনা চালিয়ে যান। ১৯১৮ সালের মধ্যে তিনি বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের মর্যাদা লাভ করেন।

নির্বাক চলচ্চিত্র যুগের অন্যতম মৌলিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব চ্যাপলিন নিজের ছবিতে নিজেই অভিনয় করতেন, এবং চিত্রনাট্য ও সংলাপ রচনা, পরিচালনা, প্রযোজনা এমনকি সঙ্গীত পরিচালনাও করতেন। তার চলচ্চিত্রগুলোতে বৈরীতার সাথে দ্য ট্রাম্পের সংগ্রামের করুণ রসের স্ল্যাপস্টিক হাস্যরস বিদ্যমান ছিল। কয়েকটি চলচ্চিত্রে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়বস্তু ছিল এবং কয়েকটিতে আত্মজীবনীমূলক উপাদান ছিল। চ্যাপলিন তার কাজের পুনঃস্বীকৃতি পেলে ‘এই শতাব্দীর চলচ্চিত্রকে শিল্প রূপে দাঁড় করানোর পিছনে তার অপরিমেয় প্রভাবের জন্য’ তাকে ১৯৭২ সালে একাডেমি সম্মানসূচক পুরস্কার প্রদান করা হয়। শিল্পকলায় অবদানের জন্য তাকে ফ্রান্স সরকার ১৯৭১ সালে লেজিওঁ দনরের কমান্ডার ও রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ ১৯৭৫ সালে নাইটহুডে ভূষিত করেন। মৃত্যুর পরও চ্যাপলিন তাঁর নির্মিত দ্য গোল্ড রাশ, সিটি লাইট্‌স, মডার্ন টাইমস ও দ্য গ্রেট ডিক্টেটর চলচ্চিত্র দিয়ে অমর হয়ে আছেন। এই চলচ্চিত্রগুলোকে প্রায়ই মার্কিন চলচ্চিত্রের সর্বকালের সেরা তালিকায় স্থান করে নিতে দেখা যায়।

চার্লি চ্যাপলিনের ৭৫ বছরের দীর্ঘ অভিনয় জীবনে তিনটি বাদে বাকি সব চলচ্চিত্রই ছিল নির্বাক। চলচ্চিত্রে তিনি প্রথম কথা বলেন ১৯৪০ সালে, দ্য গ্রেট ডিকটেটর চলচ্চিত্রে।

জনপ্রিয়তা::
১৯৪০ সালে, দ্য গ্রেট ডিকটেটর চলচ্চিত্রে। চার্লি চ্যাপলিন যখন পৃথিবী বিখ্যাত তখন একবার দুই দিনের জন্য জন্মভূমি ইংল্যান্ডে গেলেন। আর এই সময়ের মধ্যে ঘটে গেল তুঘলকি কাণ্ড। মাত্র দু’দিনে তাঁর কাছে প্রায় ৭৩ হাজার চিঠি আসে।

১৯২৫ সালের ৬ জুলাই প্রথমবারের মতো অভিনেতা হিসেবে টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে আসেন চার্লি চ্যাপলিন। চার্লির ট্রেড মার্ক চরিত্র ভবঘুরে ২৬ বছরে আবির্ভূত হয় ৭০টি পূর্ণ ও স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবিতে। ১৯৮৭ সালে দেড় লাখ ডলারে বিক্রি হয় চার্লির টুপি ও ছড়ি।

সমাজবাদ-পূঁজিবাদ নয়; মানবতাই ছিল আদর্শ::
জীবদ্দশায় নিজের রাজনৈতিক মতবাদ নিয়ে অনেক জলঘোলা হয়েছে রাজনৈতিক অপপ্রচারেরও স্বীকার হয়েছেন এই মহান শিল্পী। ১৯৫২ সালে চার্লি চ্যাপলিনকে তার দেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করে। কারণ হলিউডের সংগঠন ‘মোশন পিকচার্স এলায়েন্স ফর প্রিজারভেশন অব আমেরিকান আইডিয়াল’ চার্লি চ্যাপলিনকে কমিউনিস্ট ঘোষণা করে মামলা ঠুকে দেয়। স্নায়ুযুদ্ধের সেই দিনগুলোতে আমেরিকায় কমিউনিস্ট হওয়া ছিল গুরুতর অপরাধ। কথিত বাক স্বাধীনতার দেশ আমেরিকা তাই চার্লি চ্যাপলিনকে দেশত্যাগে বাধ্য করেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, সেই সময় কমিউনিস্ট হিসেবে পরিচিত সোভিয়েত ইউনিয়নেও চার্লি চ্যাপলিন তখন নিষিদ্ধ। সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদে বিশ্বাসী নন বলে সেখানে তিনি প্রতিক্রিয়াশীল শিল্পী হিসেবে চিহ্নিত। প্রগতি ও প্রতিক্রিয়ার এই দোলাচলে বিরক্ত চার্লি চ্যাপলিন শেষে আশ্রয় নেন সুইজারল্যান্ডের এক নিভৃত গ্রামে। আসলে এই শিল্পী কোনো রাজনৈতিক প্রপাগাণ্ডায় বিশ্বাসী ছিলেন না, তার মূল আদর্শ ছিল মানবতা। কাজ করে গেছেন মানুষের জন্য, মানুষকে ভালোবেসে।

এজন্যই হয়ত চার্লি চ্যাপলিন তার আত্মজীবনীতে লিখে গেছেন, ‘আমার কাছে সৌন্দর্য হচ্ছে নর্দমায় ভেসে যাওয়া একটা গোলাপ ফুল’।

তার কাছে‘শিল্প হচ্ছে পৃথিবীর কাছে লেখা এক প্রেমপত্র।’তার অনবদ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে চার্লি চ্যাপলিন এমন একেকটি প্রেমপত্রই পাঠিয়েছেন পৃথিবীর মানুষের কাছে। সেই প্রেমপত্রগুলো আজকের এই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ পৃথিবীতেও সমান প্রাসঙ্গিক। তার চলচ্চিত্রগুলো দেখতে গিয়ে এখনো প্রাণবন্ত হাসির স্রোতে ভাসতে ভাসতে মহৎ বেদনায় আর্দ্র হওয়া যায়।

চার্লি চ্যাপলিন একাধারে অভিনেতা, গায়ক, চিত্রনাট্যকার, গল্প লেখক, পরিচালক, শিল্প নির্দেশক, সঙ্গীত পরিচালকসহ আরো বিভিন্ন বিশেষণে বিশেষিত। এই মানুষটি একটি দুর্বিষহ শৈশব পার করে এলেও জীবনের কাছে কখনো হার মানেননি। আর অনেক বেশি প্রাণবন্ত ছিলেন বলেই হয়তো তিনিই বলতে পারেন- ‘আমার জীবনে অনেক সমস্যা আছে কিন্তু আমার ঠোঁট তা জানে না তাই সে সব সময় হাসতে থাকে।’

মৃত্যু:
১৯৭৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর চার্লি চ্যাপলিন প্রায় নিঃসঙ্গ অবস্থায় মারা যান সুইজারল্যান্ডে। ১৯৭৮ সালের ৩ মার্চ সুইজারল্যান্ডের করসিয়ার-সার- ভেভে গোরস্তান থেকে চুরি হয়ে যায় চার্লি চ্যাপলিনের মৃতদেহ। অবশেষে ১৮ মার্চ পুলিশ মৃতদেহটি উদ্ধার করে এবং পুনরায় সমাহিত করা হয় চার্লি চ্যাপলিনকে।

এই মহান ব্যক্তির জন্মদিনে জানাই অনেক শুভেচ্ছা আর ভালোবাসা।

তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট; উইকিপিডিয়া