ইলিয়াস আলী নিখোঁজের ৬ বছর : আজও অপেক্ষায় পরিবার, গতিহীন তদন্ত

50

এম. ইলিয়াস আলী নিখোঁজের ৬ বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ মঙ্গলবার। দীর্ঘ ছয় বছর আগে করা ‘সাধারণ ডায়েরি’ এর সর্বশেষ অবস্থা। নিখোঁজ এম. ইলিয়াস আলীর মা ও গাড়িচালক আনসার আলীর মা ছেলের অপেক্ষার কথা বলছেন আর সেসব কথা পাঠকদের জন্য তুলে এনেছেন আমাদের স্টাফ রিপোর্টার আহমদ ইমরান ও বিশ্বনাথ প্রতিনিধি তজম্মুল আলী রাজু।

বিএনপির কেন্দ্রিয় নেতা এম. ইলিয়াস আলী নিখোঁজের ৬ বছর পূর্ণ হচ্ছে মঙ্গলবার। ২০১২ সালের ১৭ মে রাজধানীর বনানী থেকে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হওয়ার ৬ বছর পূর্ণ হলেও অপেক্ষার প্রহর শেষ হয়নি পরিবারের। তার ফিরে আসার প্রতীক্ষায় পরিবার ও অনুসারীদের দিন কাটলেও তারা জানেন না আদৌ তিনি বেঁচে আছেন কী না? তবে তার ফিরে আসার অপেক্ষায় দিন কাটছে তাদের। তবে মায়েদের অপেক্ষার অবসান হচ্ছে না। প্রতিদিনই ইলিয়াস আলী ও তার গাড়ি চালক আনসার আলীর মায়ের দিন শুরু হয় ছেলের পথ চেয়ে।
ইলিয়াস নিখোঁজের পর থেকে বিএনপি অভিযোগ করে যাচ্ছে রাজনৈতিক হীন উদ্যেশ্যে ইলিয়াস আলীকে সরকার গুম করে রেখেছে। পরিবারের আশা এখনো জীবিত আছেন ইলিয়াস। যেকোনো সময় ঘরে ফিরবেন ইলিয়াস আলী। তবে ইলিয়াছ আলীর সন্ধান দাবীতে করা ‘সাধারণ ডায়েরির’ তদন্ত চললে গতিহীন ভাবে।
বনানী থেকে নিখোঁজ হওয়ার সময় বিএনপির তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক ও সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি এম ইলিয়াস আলীর সাথে তার গাড়িচালক আনসার আলী ও নিখোঁজ হন। ইলিয়াস আলী পরিবারের মতো আনসার আলীর মা সহ স্বজনরা প্রতিদিন তার বাড়ি ফেরার প্রতীক্ষায় পথ চেয়ে বসে আছেন।
সিলেট-২ (বিশ্বনাথ-বালাগঞ্জ-ওসমানীনগর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার পর দলীয় কোন্দল- বিবাদে এমন ঘটনার বলে প্রচার হলেও এখনো পুলিশ এ রহস্যের কিনারা করতে পারেনি। এদিকে সিলেটে বিএনপির পক্ষ থেকে নিখোঁজের পর থেকে ব্যাপক আন্দোলন-বিক্ষোভ শুরু হলেও অনেক দিন ইলিয়াস কি নিয়ে দলীয় কর্মসূচি দেখা যায়নি। মাঝে মাঝে মিলাদ ও মাহফিলেই সীমাবদ্ধ রয়েছে এ সকল কর্মসূচি।
এ ব্যাপারে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদ বলেন, ইলিয়াস আলী ও তাঁর গাড়িচালক আনসার আলীকে সরকার রাজনৈতিক ফায়দা নিতে গুম করে রেখেছে।
জিডির তদন্তেই ছয় বছর : ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল থেকে ২০১৮ সালের ১৭ এপ্রিল। দীর্ঘ ছয় বছর। নিখোঁজ বিএনপি নেতা এম ইলিয়াছ আলীর সন্ধান দাবীতে করা ‘সাধারণ ডায়েরি’ তদন্ত চলছে। দীর্ঘ ছয় বছরেও এর কোনো সমাধানে যেতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহীনি। সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন ঢাকার বনানী থানায় করেছিলেন তার স্ত্রী তাহসিনা রুশদী লুনা। ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাজধানীর বনানী থেকে গাড়িচালক আনসার আলীসহ অপহৃত হন ইলিয়াস আলী। রাস্তায় পড়ে থাকা তাঁর গাড়ি উদ্ধার করে বনানী থানার পুলিশ।
নিখোঁজ হওয়ার আগে ভারতের টিপাইমুখে বাঁধ দেওয়ার বিরোধিতা করে সিলেটে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন ইলিয়াস। নিখোঁজ হওয়ার পরে সাধারণ ডায়েরি করা হলে, সেই জিডির তদন্ত চলছে এখনো। এছাড়া উচ্চ আদালত ইলিয়াস আলী নিখোঁজের বিষয়ে তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছিলেন পুলিশকে। একই প্রতিবেদন কয়েক দিন পরপর ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দাখিল করছেন বনানী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কাজী মাইনুল ইসলাম। প্রতিবেদনগুলোতে ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা গাড়ির বিবরণ, ওই দিন সিলেট থেকে ফেরার পরে ইলিয়াসের কর্মকাণ্ডের বিবরণী, রূপসী বাংলা হোটেলে ইলিয়াস যাঁদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তার বিবরণী, ইলিয়াসের বাসার বর্ণনা ইত্যাদিই ঘুরেফিরে এসেছে বারবার। পুলিশের ২০তম ও ২৪তম প্রতিবেদন মিলিয়ে দেখা গেছে, দুই প্রতিবেদনের কিছু অনুচ্ছেদ কেবল ওলট-পালট করে দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে তথ্যগত কোনো ফারাক নেই। ২০১২ সালের ৮ সেপেটম্বর ২০ তম এবং পরের বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি ২৪তম প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।
এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো মামলাও হয়নি। ২৪তম প্রতিবেদনের শেষ প্যারায় বলা হয়, ‘জিডি অনুসন্ধানকালে গৃহীত ব্যবস্থা, প্রাপ্ত তথ্যাবলি বিশ্লেষণপূর্বক ফলাফল আমলযোগ্য অপরাধ সংঘটনের সাক্ষ্য বহন করে। জিডির ফলাফল বাদীকে অবহিত করলেও সে বা তার পরিবারের পক্ষ হতে কোনো প্রকার মামলা দায়েরের বিষয়ে কেউ আগ্রহ প্রকাশ করেন নাই। বিধায় জিডির আলোকে ব্যাপক অনুসন্ধানকার্য অব্যাহত আছে।’
বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বিএম ফরমান আলী বলেন, ‘তদন্ত এখনো চলছে। আমরা নিয়মিত আদালতে প্রতিবেদন দিয়ে যাচ্ছি।

পুলিশ ধরে নিয়েছে বলছি ছয় বছর ধরে, আর কতো?
নিখোঁজ বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াছ আলীর ব্যক্তিগত গাড়ি চালক আনসার আলী। ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল এম. ইলিয়াস আলীর সাথে তিনিও নিখোঁজ হন। তখন তার মেয়ে চাঁদনীর বয়স ছিলো ৩ বছর। সময় গেছে চাঁদনীও বড় হয়েছে। বুঝতে শিখেছে অনেক কিছুই। বর্তমানে চাঁদনী তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে। অনেকের মত বাবাকে দেখেতে না পেয়ে দাদীকে প্রায়ই প্রশ্ন করে। নানান সময় করা ‘বাবা কোথায়’ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন না পরিবারের কেউ। তবুও অবুঝ চাঁদনী বুঝানো হয়েছে তার বাবাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। শীঘ্রই তিনি মুক্ত হয়ে বাড়ি ফিরবেন।
সোমবার দুপুরে বিশ্বনাথ উপজেলার খাজাঞ্জি ইউনিয়নের গুমরাগুল গ্রামে নিখোঁজ আনসার আলীর বাড়িতে বসে তার মা নুরজাহান বিবি পরিবারের বর্তমান অবস্থা, নাতনী চাদনী ও সন্তানের জন্য অপেক্ষার গল্প বলছিলেন।
নুর জাহান বেগম বলেন, আমার ছেলে রাজনীতি করতো না কিংবা কোনো দলের সাথে যুক্ত না ছিলো না। সে শুধু তার চাচা ও স্থানীয় এমপির গাড়ি চালাতো। তারা দুজন একসাথে নিখোঁজ হলো। কেনো দীর্ঘ ছয় বছরেও তাদের খোঁজ পাওয়া গেল না। আমার ছেলে আনসার আলীর মেয়ে চাঁদনী। প্রায় সময়ই আমার কাছে কিংবা তার মায়ের কাছে বাবা সর্ম্পকে জানতে চায়। তখন আমরা কেউই কিছু বলতে পারি না। তখন আমরা তাকে বলি, তোমার বাবাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে, শ্রীঘ্রই ফিরে আসবে। তবুও মেয়েটা ঈদের সময় বাবা কাপড় নিয়ে আসবে এই অপেক্ষায় থাকে। তিনি সরকারের কাছে আবেদন করেছেন, যেনো তার ছেলে ও ইলিয়াস আলীকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
একই রকম অবস্থা পুরো পরিবারের। ছেলের অপেক্ষায় তিনিও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। বয়স আর দুঃচিন্তায় শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা রোগব্যাধি। পরিবারের খরচ আর চিকিৎসার ব্যয় সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে আনসার আলীর ছোট ভাই শাহেব আলীর জন্য। পরিবারের ভরণপোষণের পর মায়ের চিকিৎসায় ব্যাঘাত ঘটছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, নিখোঁজ হওয়ার আগের রাতে ভাইয়ের সাথে আমার কথা হয়। তখন তিনি বলেছিলেন বাড়িতে টাকা পাঠাবেন। পরদিনই শুনি তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। এরপর দীর্ঘ ছয় বছর হয়ে গেলো। এখনো সরকার আমাদের ভাইয়ের বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেনি।

‘আমার মন বলছে, ছেলে ফিরে আসবে’
একজন মা হিসেবে, আমার মন বলছে আমার ছেলে ফিরে আসবে। সরকার চাইলে ও আন্তরিক ভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করলে তা দ্রুত হতে পারে। সরকারে কিংবা রাষ্ট্রের কাছে আবেদন করছি আমার ছেলেকে যেন দ্রুত আমার কাছে ফিরিয়ে দেয়। সোমবার দুপুরে নিখোঁজ বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এম. ইলিয়াছ আলীর গ্রামের বাড়ি বিশ্বনাথের জানাইয়া গ্রামের নিজ বাড়িতে বসে নানা ঘটনার স্মৃতিচারণ ও অপেক্ষার গল্প বলছিলেন মা সূর্যবান বিবি।
ছেলের নানা রকম ঘটনার স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, যখন আমার ছেলে বাড়িতে আসতো তখন বাড়িটি মাতিয়ে রাখতো। নানা ধরণের মানুষ আসতো। তাদেরকে আপ্যায়ন করতে আমার কষ্ট হবে ভেবে অনেক দিন এসেই আবার চলে যেত। বলতে বলতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তিনি। বারবার চোখ মুছে আবার বলতে শুরু করেন। তিনি বলেন, সরকার কিংবা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যখন বলা হয়েছে। আমি ও আমার পরিবার মিলে আমার ছেলেকে লুকিয়ে রেখেছি। তখন সবচেয়ে বেশী কষ্ট পেয়েছি। কারণ প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি কিংবা প্রত্যেক মায়ের কাছেই সন্তান সমান। নিজের সন্তান যতই বড় হোক মায়ের কাছে কখনই তারা বড় হতে পারে না।
আমাদের প্রধানমন্ত্রী কিংবা রাষ্ট্রপতির যখন ছেলে-মেয়ে সাথে থাকেন। তখন আমার ছেলে কেনো আমার কাছে নেই এমন প্রশ্ন তুলে আবার কাদঁতে শুরু করেন সূর্যবান বিবি।
কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে নিয়ে আবার বলতে থাকেন সূর্যবান বিবি। দীর্ঘ ছয় বছর ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আকুতি থাকে কতটা বিধ্বস্ত করে তুলেছে। তিনি বলেন, যখনই খেতে যাই, কিংবা ঘুমাতে যাই তখনই ছেলের কথা বেশী মনে পড়ে। দীর্ঘ ছয় বছরের প্রতিটি মুহুর্ত বাড়িতে থেকেছি। কোথাও যাইনি। যদি ছেলে ফিরে আসে এই আসায়। এছাড়া আমার ছেলের ঘর অন্ধকার করে আমি কোথাও যেতে চাই না।
এম. ইলিয়াছ আলী বাড়িতে গেলে নেতা-কর্মী ও এলাকার মানুষের পদচারণায় মূখর থাকতো। কিন্তু নিখোঁজ হবার পর বাড়িটি এখন শুনসান নিরবতা নিস্তব্দ। তবে স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতাকর্মীরা নানা সময় খোঁজ খবর নেন বলে জানিয়েছেন সূর্যবান বিবি। এছাড়া বিভিন্ন সময় এলাকার মানুষও তাকে দেখে রাখেন। তিনিও যথাসাধ্যে সবাইকে সাদরে গ্রহণ করার চেষ্টা করেন। দেশের সকল মানুষের কাছে নিখোঁজ ছেলেকে ফিরে পাবার জন্য দোয়া কামনাও করেছেন সূর্যবান বিবি।