ঋণশোধ করতেই দলের জন্য কাজ করি

318

বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী শফিকুর রহমান চৌধুরী। তিনি দীর্ঘদিন থেকে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। ছিলেন এমসি কলেজ ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি। ছাত্রলীগ থেকে আওয়ামী লীগে ওঠে আসা শফিকুর রহমান চৌধুরী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ ধারণ ও লালন করে রাজনীতি চালিয়ে যাচ্ছেন। আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে তাঁকে অনেক ত্যাগ শিকার করতে হয়েছে। একাধিক বার জেলও খেটেছেন । ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে থেকে রাজনীতিতে আসা শফিকুর রহমান চৌধুরী সম্প্রতি নগরের টিলাগড়গস্থ বাসভবনে মুখোমুখি হন সবুজ সিলেটের ‘আয়না’র। তিনি জানিয়েছেন, কেমন কেটেছে তাঁর শিক্ষা, বিয়ে-সংসার এবং রাজনৈতিক জীবন। বলেছেন, জাতীর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে কতটা স্নেহ করেন। কীভাবে আজও তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ ও লালন করছেন। জানিয়েছেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে কেমন দেখতে চান আগামীর বাংলাদেশ। তাঁর এই সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার নুরুল হক শিপু

ঋণশোধ করতেই দলের জন্য কাজ করি

শিক্ষাজীবন সম্পর্কে শফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, পারিবারিকভাবেই তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয়। প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেন নিজ জন্মস্থান বিশ্বনাথ উপজেলার রায়খেলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ১০ শ্রেণি পর্যন্ত কয়েকটি বিদ্যালয়ে কটলেও ১৯৭২ সালে মাধ্যমিক পাস করেন বিশ্বনাথের চান্দবরাং উচ্চবিদ্যালয় থেকে। ১৯৭৪ সালে তিনি এমসি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ওই সময় তিনি ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ডিগ্রিতে ভর্তি হলেও পাস করা হয়নি। শফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর পুরো আওয়ামী লীগে নেমে আসে অন্ধকার। নেতাকর্মীদের ওপর চালানো হয় নির্মম নির্যাতন। কারণে অকারণে অনেকেই জেলে যেতে হয়। নিজেকে রক্ষা করতে আত্মগোপনে চলে যান তিনি। কিন্তু জাতির পিতার আদর্শ থেকে এক পা সরেননি। ওই সময়টা তাঁর আর ডিগ্রি পরীক্ষা দেওয়া হয়নি।
আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়ানো সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির অহংকার। বঙ্গবন্ধু সকল কর্মই তাঁকে অনুপ্রাণিত করত। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে থেকে রাজনীতিতে আসেন শফিক চৌধুরী। তখন ছাত্রলীগের একজন সাধারণ কর্মী ছিলেন। এরপর জেলা ছাত্রলীগের সদস্য হন। পরবর্তী সময়ে এমসি কলেজ ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর অনেকেই যখন কেউ মিজান লীগে আবার কেউ খন্দকার মুস্তাকের সাথে চলে যান তখন তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ ধারণ ও লালন করে ছাত্রলীগকে সু-সংগঠিত করার কাজে নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন।’
শফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট হত্যা করা হলেও আওয়ামী লীগ প্রথম হরতাল ডাকে ১৯৮০ সালের ৩ নভেম্বর। হরতাল সমর্থনে মাঠে নামি। হরতাল পালিত হলো। তবে গ্রেপ্তার হয়ে জেলে যেতে হয় আমাকে। ওই সময় পুলিশি নির্যাতন সহ্য করতে হয়। এরআগে ১৯৭৮ সালে যুক্তরাজ্যে চলে যাই। ছয় মাস থেকে দেশে ফিরে আসি। ১৯৮০ সালের নভেম্বর মাসে জেলে গেলেও ডিসেম্বরের শেষ দিকে ফের যুক্তরাজ্যে চলে যাই। দলের জন্য ত্যাগ শিকার করায় পুরস্কার হিসেবে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সদস্য করা হয় আমাকে। এরপর ওই কমিটিতে কোষাধক্ষ্য, সমাজ কল্যাণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক এবং সর্বশেষ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই।

শফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হলেও ওই সময় প্রানে বেঁচে যান আমাদের প্রানের নেত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা। তাঁরা তখন জার্মানিতে ছিলেন। নির্মম এই ঘটনার পর তাঁরা যুক্তরাজ্যে চলে আসেন। ওই সময় তাঁদের সাথে সম্পর্ক আরো দৃঢ় হয়। আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা ভারতে চলে গেলেও তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা যুক্তরাজ্যেই থেকে যান।’
শেখ হাসিনার পরিবারের সাথে সম্পর্ক সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘মূলত আমার মরহুম বাবা আব্দুল মতলিব চৌধুরী ও মরহুম বড় ভাই মতিউর রহমান চৌধুরীর সাথে খুব ভালো সম্পর্ক ছিলো বঙ্গবন্ধুর। বলা যায় পারিবারিক বন্ধন। যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার সময় আমার বাবা ও বড় ভাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার সময় আমাদের দিলশাদ রেস্টুরেন্টে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া ১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধুকে যখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ফাঁসানো হয়, তখন যুক্তরাজ্য থেকে আইনজীবী স্যার উইলিয়াম থমাসকে আইনজীবী হিসেবে পাঠানো হয়। ১৯৭১ সালে আমার বড় ভাই মতিউর রহমান চৌধুরী জাস্টিজ আবু সাঈদ চৌধুরী, জাস্টিজ শামসুদ্দিন চৌধুরী, জাকারিয়া খান চৌধুরী, সুলতান মাহমুদ শরিফ, গৌছ খানসহ অন্যান্যদের সাথে মুক্তিযুদ্ধের স্টিয়ারিং কমিটিতে ছিলেন।’
দেশের রাজনীতিতে নিজেকে জড়ানো সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘যুক্তরাজ্যে থাকাবস্থায় জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের সাথে যোগাযোগ ছিলো তাঁর। সবার সাথে সুসম্পর্কও ছিলো। সেই সুম্পর্কের ওপর আস্তা রেখে দলের আদর্শকে পুঁজি করে ২০০১ সালে দেশে ফিরে সক্রিয়ভাবে দলের জন্য কাজ শুরু করেন তিনি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনার মনোনীত প্রার্থী হিসেবে সিলেট-২ আসনে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন এবং বিপুল ভোটে এমপি নির্বাচিত হন।’
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এম ইলিয়াস আলী বিভিন্ন নির্যাতন থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে ২০০৩ সাল থেকে বিশ্বনাথ, বালাগঞ্জ ও ওসমানীনগর এলাকায় কাজ শুরু করি। ইলিয়স বলেছিলেন, সিলেট-২ আসনে আমার নেত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা নির্বাচনে দাঁড়ালেও নির্বাচিত হতে পারবেন না। কিন্তু আমি ২০০৮ সালে নৌকা প্রতীক নিয়ে এ আসনে নির্বাচনে বিজয়ী হই। এই বিজয় ছিলো গণতন্ত্রের বিজয়, এ বিজয় ছিলো আওয়ামী লীগের বিজয়, এ বিজয় ছিলো শেখ হাসিনার বিজয়।’
২০১১ সালে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়া শফিকুর রহমান চৌধুরী নিজের জীবনে ত্যাগের কথা প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, ২০০৭ সালে ১/১১-এর সময় যখন নেত্রীর বিরুদ্ধে, দেশের বিরুদ্ধে এবং মানুষের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হয়, তখন দেশরতœ শেখ হাসিনা যুক্তরাজ্যের আমাদের দিলসাদ রেস্টুরেন্টে ৭ মে সংবাদ সম্মেলন করে দেশে ফিরেন। ঢাকায় মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, নাছির উদ্দিন খান এবং আমিসহ অন্যান্য নেতারা নেত্রীকে স্বাগত জানাই। পরদিন নেত্রীর সাথে দেখা করে রাতের খাবার খেয়ে ফিরি। ওইদিন দাওয়াতে ছিলেন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। যারা নেত্রীর সফর সঙ্গী ছিলেন। ১৪ মে প্রবাসী সকল নেতা সিলেটে আসেন। তাঁদেরকে আমার বটেশ্বর বাসায় দাওয়াত দেই। ওই বাসা থেকে আমাকেসহ প্রবাসী নেতাদেরকেও গ্রেপ্তার করা হয়। আমার সাথে গ্রেপ্তার ৪০ জনের মধ্যে ছিলেন, মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, নাসির উদ্দিন খান, শফিউল আলম নাদেল, শাহ শামিম, কানাডা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সারওয়ার, কামাল বাজারের ফারুক চৌধুরী, সৈয়দ ফারুকসহ অন্যান্যরা। এ সময় আমি ও মিসবাহ উদ্দিন সিরাজসহ ১৪ জন সাড়ে ৫ মাস কারান্তরিণ ছিলাম।’
২০১৪ সালের নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি না এসে পেট্রোল বোমা হামলার রাজনীতি শুরু করলো। পরে জাতীয় পার্টিকে সাথে নিয়ে আওয়ামী লীগ নির্বাচন করলো। তখন দেশ রক্ষা করাই শেখ হাসিনার মূললক্ষ্য ছিলো। সিলেট-২ আসনে আমি নৌকা প্রতীক নিয়ে মনোনয়ন জমা দিলাম। নেত্রীর নির্দেশে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালাম। আওয়ামী লীগ অক্লান্ত পরিশ্রম করে এ আসনে জাপার প্রার্থীকে নির্বাচিত করলো। কিন্তু জাপার এমপি জনগণ এবং আওয়ামী লীগকে ধোখা দিয়েছেন। আমার বিশ্বাস আমার নেত্রী সিলেট-২ আসনের উন্নয়নের স্বার্থে আগামী সংসদ নির্বাচনে আমাকে ফের নৌকার প্রার্থী করবেন।’
সিলেট-২ আসনের বিএনপির সাবেক এমপি ইলিয়াস আলী প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এম ইলিয়াস আলী এমপি থাকাবস্থায় আমাকে একাধিক মামলা দিয়েছিলেন। ২০০৪ সালে ২১ মে আনুয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলা মামলায়ও আমাকে আসামি করা হয়। আর এর মূল কারণ হচ্ছে, ২০০১ সালের নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী শাহ আজিজকে নির্বাচিত করতে আমার শ্রম দেওয়া। আমি ওই সময় নৌকার পক্ষে শাহ আজিজের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ছিলাম। আর তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন এম ইলিয়াস আলী।’
আপনার জীবনের সবচেয়ে দুঃখের ঘটনা বলেন, ‘১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট আমার জীবনের সবচেয়ে দুঃখের দিন ছিলো। আমার বাবা-মাকে হারিয়ে যেমন কষ্ঠ পেয়েছিলাম ঠিক তেমনি কষ্ঠ পেয়েছিলাম সপরিবারে জাতির পিতাকে হারিয়ে।’
আগামীর বাংলাদেশ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘যোগ্য বাপের যোগ্য সন্তান শেখ হাসিনা। বাবার স্বপ্ন পূরণে কাজ করছেন তিনি। আমি নেত্রীর কাজে সন্তুষ্ট। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারিদের বিচার হয়েছে তাঁর জন্যই। যুদ্ধাপরাধিদের বিচার হয়েছে এবং হচ্ছে। অন্য সরকারের আমলে মানুষ স্বাধীনতার সুফল ভোগ করতে পারেননি। এখন মানুষ স্বাধীন। অধিকারের কথা বলতে পারছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন বাস্তবায়নে তাঁর কন্যা দেশের সফল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। তাঁর পরিশ্রমের এ ধারাবাহিতকা অব্যাহত থাকবে সব সময়। নতুন প্রজন্ম আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হবে। দেশে ব্যাপক উন্নয়ন হচ্ছে, তাও অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশ হবে উন্নত দেশ।’
সর্বশেষ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শুধু আমি নই, ‘আমার পরিবার-পরিজন সবসময়ই বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী। আওয়ামী লীগ আমাকে ব্যাপক সম্মান দিয়েছে। সেই ঋণশোধ করতে আমি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দলের জন্যই কাজ করি।’
শফিকুর রহমান চৌধুরীর তিন মেয়ে। বড় দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। তারা যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন। ছোট মেয়ে যুক্তরাজ্যে পড়ালেখা করছেন। তিনি যুক্তরাজ্য ছাড়াও ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ভ্রমন করেছেন। ৫ ভাই ও এক বোনোর মধ্যে তিনি চতুর্থ।