ঢাবির প্রথম ছাত্রী লীলা নাগের সংগ্রামী জীবন

36

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি::
মৌলভীবাজারের মেয়ে লীলা নাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী। বাংলা ভাষায় মহিলা সম্পাদিত প্রথম পত্রিকা মাসিক জয়শ্রী সম্পাদিকা, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অগ্নিকন্যা বিপ্লবী এই নারীর প্রয়াণ দিবস সোমবার। ১৯৭০ সালের ১১ জুন এই মহিয়সী নারীর জীবনাবসান ঘটে।
১৯২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম এবং একমাত্র নারী শিক্ষার্থী লীলা নাগ ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহ-শিক্ষার প্রচলন ছিল না। কিন্তু মুক্তি ও স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রদূত মাস্টারদা সূর্য সেনের সহযোদ্ধা বিপ্লবী লীলা নাগের অদম্য ইচ্ছা জেদ এবং দৃঢ়তার কাছে হার মানেন প্রতিষ্ঠাতা ইংরেজ ড. হার্টস। সবেমাত্র লীলা নাগ কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে বিএ পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে পদ্মাবতী স্বর্ণপদক অর্জন করেছেন। ড. হার্টস অনেকটা বাধ্য হয়েই প্রথা ভেঙে তাকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের এমএ ক্লাসে ভর্তির সুযোগ করে দেন।
লীলা নাগকে বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই চেনেন না। তিনি ছিলেন উপমহাদেশের স্বাধীনতা ও নারী জাগরণের পথিকৃত, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম ছাত্রী। তার পৈতৃক বাড়ি মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁও ইউনিয়নের পাঁচগাঁও গ্রামে।
এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ, বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে দেখা যায়, উপমহাদেশের প্রথম বাঙালি নারী সাংবাদিক লীলা নাগের জন্ম ১৯০০ সালের ২১ অক্টোবর ভারতের আসাম প্রদেশের গোয়ালপাড়া গ্রামে। তিনিই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএ ডিগ্রিধারী প্রথম নারী। ১৯৩৯ সালে লীলা নাগ বিয়ে করেন বিপ্লবী অমিত রায়কে।
তার বাবা গিরীশচন্দ নাগ আসাম সরকারের জেলা হাকিম হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সেই সুবাদে চাকরি সূত্রে লীলা নাগের পরিবার আসামের বাসিন্দা হয়। মা কুঞ্জলতা নাগ ছিলেন গৃহিণী। ১৯০৫ সালে আসামের দেওগর বিদ্যালয়ে লীলা নাগের শিক্ষাজীবন শুরু। সেখানে দুই বছর অধ্যায়নের পর ভর্তি হন কোলকাতার ব্রাহ্ম গার্লস স্কুলে। ১৯১১ সালে ঢাকার ইডেন হাইস্কুলে ভর্তি হন। ১৯১৭ সালে ওই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। ১৯১৬ সালে লীলা নাগের বাবা গিরীশচন্দ নাগ চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর স্থায়ীভাবে সপরিবারে মৌলভীবাজারের রাজনগরে চলে আসেন।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা লীলা নাগ বাঙালি নারীদের মধ্যে শিক্ষাবিস্তারে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি ঢাকার আরমানিটোলা বালিকা বিদ্যালয়, কামরুন্নেসা গার্লস হাইস্কুল এবং শেরে বাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। ভারত বিভাগের পর লীলা নাগ কলকাতায় চলে যান এবং সেখানেও কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়েন।
লীলা নাগ ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন নেত্রী ছিলেন। এ জন্য কয়েকবার তাকে কারাবরণ করতে হয়। তিনি নারী সমাজের মুখপত্র হিসেবে ‘জয়শ্রী’ নামে একটি পত্রিকা বের করেন। লীলা নাগ ছবি আঁকতে, গান গাইতে এবং সেতার বাজাতে পারতেন।
শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিকাশ এবং বিস্তার একই সঙ্গে সমাজ সংস্কার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে নীলা নাগ ইতিহাসের পাতায় আজও চির ভাস্বর। এক আলোকবর্তিকা, আলোর দিশারী। ১৯৭০ সালের ১১ জুন কলকাতায় মারা যান এই বিপ্লবী নেত্রী।
বর্তমানে নীলা নাগের পৈতৃক বাড়িটি দখল করে রেখেছে একাত্তরের কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী রাজাকার মো. আলাউদ্দিন চৌধুরীর উত্তরসূরীরা। ওই প্রভাবশালী মহল বাড়িটি দখলে নিয়ে লীলা নাগের স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলছে। লীলা নাগের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে বাড়ির কিছু অংশ জরাজীর্ণ অবস্থায় এখনো টিকে আছে। তাও ময়লা-আবর্জনায় পরিপূর্ণ। যেকোনো সময় ওই প্রভাবশালী মহলটি লীলা নাগের শেষ স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলতে পারে। বাড়িটি প্রভাবশালী মহলের হাত থেকে দ্রুত উদ্ধার ও সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের তত্ত্বাবধানে লীলা নাগের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
এ ব্যাপারে রাজনগর উপজলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌসি আক্তার বলেন, আমি রাজনগরে সদ্য যোগদান করেছি। নীলা নাগের বাড়ির ব্যাপারে আমি আন্তরিকতার সঙ্গে খোঁজ নিয়েছি। বাড়িটি দখল উচ্ছেদ করে নীলা নাগের স্মৃতি রক্ষা করতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেয়া হবে।