মা কারাগারে থাকলে সন্তান শান্তিতে থাকতে পারে না

22

এককালের তুখোড় ছাত্রদল নেতা আলী আহমদ। বর্তমানে সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তিনি। ছাত্রদলের রাজনীতি থেকে ওঠে আসা আলী আহমদ জীবনে অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতি অতিক্রম করে এসেছেন বর্তমান অবস্থানে। দক্ষিণ সুরমা উপজেলার কামালবাজার ইউনিয়নের নভাগ গ্রামের আব্দুর রহিম ও চম্পা খানমের ছেলে আলী আহমদ ১৯৬৮ সালের পয়লা জুন জš§গ্রহণ করেন। ছাত্রদল থেকে বিএনপিতে এসে রাজনীতির জন্য অনেক ত্যাগ শিকার করেছেন তিনি। একাধিক বার জেলও খেটেছেন। কারণে অকারণে মামলার আসামি হলেও পিছ পা হননি রাজনীতি থেকে।
গতকাল নগরের জিন্দাবাজারস্থ ব্লু-ওয়াটার শপিং সিটিতে তাঁর অফিসে তিনি মুখোমুখি হন সবুজ সিলেটের ‘আয়না’র। তিনি জানিয়েছেন, কেমন কেটেছে তাঁর শিক্ষা, বিয়ে-সংসার এবং রাজনৈতিক জীবন। বলেছেন, কীভাবে আজও তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক রাষ্ট্রপতি মরহুম জিয়াউর রহমান ও বিএনপিকে কথটা ভালোবাসেন। জানিয়েছেন, বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে কেমন দেখতে চান আগামীর বাংলাদেশ। তাঁর এই সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার নুরুল হক শিপু

মা কারাগারে থাকলে সন্তান
শান্তিতে থাকতে পারে না

শিক্ষাজীবন সম্পর্কে আলী আহমদ বলেন, ‘পারিবারিকভাবেই তাঁর শিক্ষা জীবন শুরু হয়। বাবা-মায়ের কাছ থেকে শিখেছেন মানুষকে সম্মান করা আর প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেন কামালবাজারের তালিবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। এরপর ১৯৮৩ সালে একই এলাকার হাজি রাশিদ আলী উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। ১৯৮৬ সালে সিলেট সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ১৯৮৮ সালে এমসি কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করেন।’
রাজনীতিতে আসা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যখন ৮ম শ্রেণিতে তিনি অধ্যয়নরত ছিলেন তখন সদর উপজেলার টুকেরবাজারে একটি খনন কাজ পরিদর্শনে এসেছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তখন তিনি তাঁর স্কুল থেকে অন্য শিক্ষার্থীদের সাথে সেখানে গিয়েছিলেন। তখন একটু দূর থেকে নিজ চোখে দেখেছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে। তখন তিনি রাজনীতি বুঝতেন না। তবে ওই সময় জিয়াউর রহমানকে তাঁর মনে ধরে। এরপর তিনি ১৯৮৩ সালে সিলেট সরকারি কলেজে ভর্তি হয়ে ছাত্রদলের রাজনীতিতে জড়িত হন। দায়িত্ব পান কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক পদে। ওই সময় ছাত্রদলের অবস্থা ছিলো খুবই দুর্বল। ৫ থেকে ৭ জন কলেজ ছাত্রদলের দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৮৫ সালে জেলা ছাত্রদলের সম্মেলন হয়। ওই সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি করা হয়। ওই কমিটিতে আলী আহমদ ধর্ম ও সমাজ সেবা বিষয়ক সম্পাদক নির্বাচিত হন। ওই পদে থাকাবস্থায় শহর ছাত্রদলের আহ্বায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকে। ১৯৮৯ সালে জেলা ছাত্রদলের সম্মেলন হলে ওই কমিটিতে সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসলে জামায়ত শিবিরের সাথে সংঘর্ষের অভিযোগে এবং মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান। এ সময় টানা ৪ মাস কারাভোগ করেন। পরবর্তী সময়ে এসব মামলা থেকে অব্যাহতিও পান।’
আলী আহমদ বলেন, ‘আগে ছাত্রদলের দুটি গ্রুপ ছিলো। একটি জিন্দাবাজার গ্রুপ আর অপরটি সাপ্লাই গ্রুপ। দুই গ্রুপে প্রায়ই সংঘর্ষ হতো। তিনি জিন্দাবাজার গ্রুপের ছিলেন। ১৯৯৪ সালে তৎকালীর শহর ছাত্রদল নেতা এনামুল হক মুন্না রাজনৈতিক সংঘাতে খুন হন। গ্রুপিং রাজনীতির কারণে বিনা অপরাধে ওই মামলায় আসামি হন আলী আহমদ। গ্রেপ্তার হয়ে টানা ১ বছর কারাভোগ করেন তিনি। ওই সময় তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। পরে এ মামলা থেকেও বেকসুর খালাস পান। বহিষ্কার থাকাবস্থায় দলীয় সকল কর্মসূচিতে তিনি অংশগ্রহণ করেন। এক সময় যুবদল নয়; সরাসরি বিএনপিতে তাঁকে টেনে নেওয়া হয়।’
ছাত্র রাজনীতি করার সময় হামলার শিকার হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছেন তিনি। এরমধ্যে অন্যতম হচ্ছে, এমসি কলেজে ডিগ্রি পড়াবস্থায় ছাত্র শিবিরের হামলার শিকার এবং ১৯৮৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি জাসদ ছাত্রলীগের হামলায় রক্তাক্ত জখম হন তিনি। এ সময় দীর্ঘদিন ওসমানী হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপানো হয়। এরপর ২০০৯ সালে যখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায়, তখন কোর্ট পয়েন্ট থেকে বিএনপি একটি মিছিল বের করে। ওই মিছিলে পুলিশ হামলা চালায়। হকিস্ট্রিক দিয়ে পিটিয়ে তাঁর হাত ভেঙে দেওয়া হয়। এমএ হক, দিলদার হোসেন সেলিমসহ তাঁকে কোমড়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। অবশ্য এ ঘটনার কয়েক ঘন্টা পর আমাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। ২০১৪ সালে অবরোধ চলাকালে দক্ষিণ সুরমার রশিদপুরে র‌্যাব ও পুলিশ কর্তৃক নির্যাতনের শিকার হন তিনি।’
আলী আহমদ জানান, ‘১৯৮৩ সাল থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ছাত্রদলের অবস্থা ছিলো খুবই দুর্বল। এরশাদ সরকার তখন ক্ষমতায়। এ সময় তিনিসহ ২৫-৩০ জন শহরে মিছিল দিতেন। সেই মিছিল তাঁদের কাছে অনেক বড় মিছিল মনে হতো।’
বিএনপির রাজনীতি কীভাবে আসা জানতে চাইলে সাবেক এ ছাত্রনেতা বলেন, ‘দীর্ঘ একবছর কারাভোগের পর বেরিয়ে আসেন। তখন তিনি দলের বহিষ্কৃত নেতা। ছাত্র রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ালেন। কিন্তু রাজপথ ছাড়েননি। যখনই কোনো সভা, সমাবেশ কিংবা মিছিলের খবর পেতেন ছুটে আসতেন দলীয় কার্যক্রমে। এভাবেই কাটলো কিছু দিন। এ ত্যাগের পুরস্কার হিসেবে ১৯৯৯ সালে বিএনপিতে স্থান পেলেন আলী আহমদ। তখন জেলা বিএনপির সম্মেলন হয়। ওই সম্মেলনে ৭ জন যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ যুগ্ম সম্পাদক। ওই কমিটিতে এমএ হক ছিলেন সভাপতি আর বর্তমান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী ছিলেন সাধারণ সম্পাদক। ওই কমিটিতে থাকাবস্থায় ২০০০ সালে যুক্তরাজ্য চলে যান তিনি। ২০০৩ সালে ফিরেন। এরপর ২০০৬ সালে এম ইলিয়াস আলীর নেতৃত্বে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটিতে আলী আহমদকে নির্বাহী সদস্য করা হয়। ২০০৯ সালে ফের এম ইলিয়াস আলীকে আহ্বায়ক করে জেলা বিএনপির কমিটি করা হয়। ওই কমিটিতে আলী আহমদকে যুগ্ম আহ্বায়ক পদ দেওয়া হয়। একই বছরের নভেম্বর মাসে জেলা বিএনপির সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে এম ইলিয়াস আলী সভাপতি, অ্যাডভোকেট আব্দুল গফফারকে সাধারণ সম্পাদক এবং আলী আহমদকে সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। ২০১৪ সালে এম ইলিয়াস আলীর নেতৃত্বাধিন কমিটি ভেঙে দেয় কেন্দ্রীয় বিএনপি। ওই সময় অ্যাডভোকেট নুরুল হককে আহ্বায়ক করে কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটিতে যুগ্ম আহ্বায়ক পদ দেওয়া হয় আলী আহমদকে। ২০১৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি জেলা বিএনপির সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনে কাউন্সিলরদের রায়ে বিপুল ভোটে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি।’
দলের জন্য ত্যাগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দলের কর্মী হিসেবে কম-বেশি সব নেতারই ত্যাগ থাকে। তিনি বলেন, স্বৈারাচার বিরোধী আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিলেন। তখন এরশাদ সরকারের পুলিশ বাহিনী নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করেছে। শুধু বিএনপি, ছাত্রদল নয়; আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও গ্রেপ্তার হয়েছেন। তখন আত্মগোপনে যেতে হয়েছে তাঁকে। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আন্দোলন করতে গিয়ে একাধিক মামলা খেতে হয়েছে। এখনও মামলার আসামি তিনি।’
রাজনীতি করার কারণে কোন বিষয়টি আপনাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেয় জানতে চাইলে আলী আহমদ বলেন, ‘মানুষের ভালোবাসাই সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেয়। যদি রাজরীতি করতাম না তাহলে মানুষের ভালোবাসা পেতাম না। মানুষকে কাছে থেকে বুঝতে পারতাম না। মানুষের ভালোবাসা আছে বলেই আজ এ অবস্থানে আসতে পেরেছি।’
কোন বিষয়টি আপনাকে বেশি পীড়া দেয়, ‘আজ দেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় কারাভোগ করছেন-এর চেয়ে বেশি দুঃখের কী হতে পারে। আমরা যারা ছাত্রদলের রাজনীতি করেছি আমরা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মায়েরমতো শ্রদ্ধা করি। আমাদের নেত্রী আমাদের মায়েরমতো। মা কারাগারে থাকলে কোনো সন্তান শান্তিতে থাকতে পারে না।’
সর্বশেষ প্রশ্নের জবাবে আলী আহমদ বলেন, ‘বিএনপির দেশ পরিচালনা এ দেশের মানুষ দেখেছেন। বেগম খালেদা জিয়া একজন সফল প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। দেশ পরিচালনায় বিএনপির পাশে অন্যদলের কোনো তুলনা করার সুযোগ নেই। বিএনপি গণমুখি ও জনমুখি দল। তিনি বলেন, আমরা নিরপেক্ষ নির্বাচন চাই। মানুষকে ভোটের অধিকার দেওয়া হোক। দেশে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা পাক। দেশ হোক গণতন্ত্র মুখি এবং সমৃদ্ধ। তিনি বলেন, এমন দেশ অন্য কারো পক্ষে গড়া সম্ভব নয়। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াই পারেন মানুষকে এমন দেশ উপহার দিতে। এখন মানুষ শান্তিতে নেই। দেশে অবিচার চলতে। দেশনেত্রীকে কারাগারে রেখে দেশকে আওয়ামী লীগ নিজের মুঠোবন্দি করতে নীল নকশা তৈরি করেছে। জনগন সব বুঝেন, কোনো স্বপ্নই বাস্তবায়ন হবে না। মানুষের ভালোবাসায় আবারও দেশ পরিচালনা করবে বিএনপি।’
তিন ছেলে সন্তানের জনক আলী আহমদের বড় ছেলে তানভীর আহমদ মাহী, তাসলিম আহমদ অয়ন এবং ফারহান আহমদ তাহা পড়ালেখা করছে।