পাহাড়ি ঢলে সিলেটে ঈদ আনন্দ ম্লান

59

স্টাফ রিপোর্টার ::
দু দিনের টানা বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি টলে সিলেটের চার উপজেলা প্লাবিত হয়েছে। গোয়াইনঘাটের সারী নদীর পানি স্বাভাবিকের চেয়ে বিপদসীমার .১৫ সেন্টি মিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া ভারতের বরাক নদীর পানি প্রবল বেগে বাংলাদেশের সুরমা-কুশিয়ারায় প্রবেশ করছে। এই তিন নদীর উৎসমূখ আমলশীদ পয়েন্টে বিপদসীমার ১ দশমিক ৬১ সেন্টি মিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
এছাড়া সুরমা নদীর কানাইঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ২ দশমিক ০৬ সেন্টি মিটার, কুশিয়ারার শেওলা পয়েন্টে বিপদসীমার .৯১ সেন্টি মিটার, সিলেটে সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার .২৩ সেন্টি মিটার উপর দিয়ে প্রভাহিত হচ্ছে। এতে পান্দিবন্দি হয়ে পড়েছেন চার উপজেলার মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কয়েক হাজার মানুষ। উজান থেকে নেমে আসা ঢলে পানিবন্দি হয়ে পড়ায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোতে নেই ঈদের আনন্দ। হঠাৎ বন্যায় ডুবে গেছে ঘরবাড়ি ফসল ও গবাদিপশু। বিস্তীর্ণ জনপদ প্লাবিত হওয়ায় ঈদের নামাজ আদায় করার জায়গাও নেই অনেক এলাকায়। অথচ চরম দুর্ভোগে থাকা এলাকাগুলোতে এখনও পৌঁছায়নি ত্রাণ।
জৈন্তাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এখলাছুর রহমান বলেন, মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তাদের অবস্থা সরেজমিনে দেখেছি। পানিবন্দি লোকজনকে সরকারি সহায়তা প্রদান করা না হলে ঈদে তারা কষ্টে পড়বেন।
চারিকাটা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহ আলম চৌধুরী তোফায়েল বলেন, এবার হঠাৎ করে পানি বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ কষ্টে পড়েছেন। আমি পানিবন্দি মানুষের দুঃখ দুর্দশা দেখেছি। উপজেলা প্রশাসনের সাথেও সহায়তা প্রদানের জন্য আলোচনা করেছি।
নিজপাট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মঞ্জুর এলাহী স¤্রাট বলেন, আমার নিজের ঘরেও কোমর পানি। পাশাপাশি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম তলিয়ে গেছে। হতদরিদ্ররা খুব কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। পানিবন্দি মানুষের ঈদের আনন্দ ম্লান হয়ে গেছে।
জৈন্তাপুর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা মুনতাসির হাসান পলাশ বলেন, বন্যা কবলিত ৩ ইউনিয়ন উপজেলা প্রশাসন থেকে পরিদর্শন করেছি। আমরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ও হতদরিদ্রদের তালিকা করছি। যাতে দ্রুত সহায়তা পৌঁছানো যায়।
জকিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিজন কুমার সিংহ জানিয়েছেন, ভাঙন কবলিত বিভিন্ন এলাকার বেঁড়ী বাঁধের উপর বালুর বস্তা ফেলা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ বেঁড়ী বাঁধগুলোও রক্ষা করতে স্থানীয়দের সহযোগীতায় চেষ্ঠা চালানো হচ্ছে। যে স্থানগুলোতে ভাঙন দেখা দিয়েছে সেই স্থানের ভাঙন নিয়ন্ত্রনের বাইরে। যেখানে যেখানে তীর উপচে পানি আসছে সেই স্থানগুলোতে বস্তায় মাঠি ও বালু ভরে বাঁধ দেয়া হচ্ছে।
এদিকে বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন কানাইঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানিয়া সুলতানা। এসময় তিনি বলেন, পাহাড়ী ঢলের কারণে সুরমা নদীর ডান তীর এলাকায় বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ ভাঙ্গনের ফলে অনেক এলাকায় পানি ঢুকে পড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে।
এদিকে, ঈদের আমেজ নেই মৌলভীবাজারের ৩ উপজেলার লাখো মানুষের জীবনে। হঠাৎ বন্যায় ডুবে গেছে ঘরবাড়ি ফসল ও গবাদিপশু। বিস্তীর্ণ জনপদ প্লাবিত হওয়ায় ঈদের নামাজ আদায় করার জায়গাও নেই অনেক এলাকায়।
কমলগঞ্জের কিছু যায়গা থেকে পানি নামলেও রাজনগর ও কুলাউড়া উপজেলায় প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। অথচ চরম দুর্ভোগে থাকা এলাকাগুলোতে এখনও পৌঁছায়নি ত্রাণ।
তবে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তোফায়েল ইসলাম জানিয়েছেন, প্লাবিত উপজেলাগুলোর জন্য ১১৫ টন খাদ্য এবং ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে বিতরণও শুরু হয়েছে। আজ বিকেলের মধ্যে বিতরণ শেষ হবে।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে যানা যায়, স্থানীয় প্রশাসনের ঈদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ প্রশাসন, ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় অফিস, উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের ছুটিও বাতিল করা হয়েছে।
প্লাবিত ৩টি উপজলা প্রশাসনের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, আজ দুপুর পর্যন্ত প্লাবিত গ্রামের সংখ্যা শতাধিক। এরমধ্যে রাজনগরে ৪২টি, কুলাউড়ায় ৬০টি ও কমলগঞ্জে ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানদের নিজ নিজ এলাকায় উঁচু জায়গায় ঈদের নামাজের আয়োজন করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
স্থানীয় এলাকাবাসী জানিয়েছেন, কমলগঞ্জের কিছু এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু করেছে তবে নতুন করে প্লাবিত হয়েছে রাজনগরের ২২টি এবং কুলাউড়ার ৪০টি গ্রাম।
গত ৩ দিনের টানা বর্ষণ এবং উজানে ভারতের ত্রিপুরা এবং মেঘালয়ে প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণে মৌলভীবাজারের মনু নদ ও ধলাই নদীর পানি বেড়ে ১৩ স্থানে প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয় জেলার কুলাউড়া, রাজনগর ও কমলগঞ্জ উপজেলার ১৩২টি গ্রাম।
কমলগঞ্জ উপজেলা রহিমপুর ইউনিয়নের মৌলানা আব্দুল বাছিত জানান, এক মাস সিয়াম সাধনার পর আনন্দের ঈদ আসে। কিন্তু এ বছর এই সময়ে ঘরবাড়ি ডুবে যাওয়ায় সে আনন্দ নেই।
রাজনগরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌসি আক্তার জানান, রাজনগরে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ পানিবন্দি। এদেরকে সাহায্য করছে প্রশাসন।
কমলগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমদুল হক জানান, কমলগঞ্জের বেশীরভাগ এলাকা প্লাবিত। গতকাল থেকে ত্রাণ দেয়া হচ্ছে।
কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী মো. গোলাম রাব্বানী জানান, শুকনো খাবার ইতোমধ্যে এলাকাগুলোতে পাঠানো হয়েছে। তবে বৃষ্টির জন্য বিতরণ করা সম্ভব হচ্ছে না হয়তো।
এছাড়া হবিগঞ্জে খোয়াই নদীর পানি এখনও বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টায় শহরের মাছুলিয়া পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ১৩৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। তবে ৮ ঘণ্টায় নদীর পানি কমেছে ৯৩ সেন্টিমিটার। সকাল ৮টায় একই পয়েন্টে পানি ছিল বিপদসীমার ২২৮ সেন্টিমিটার উপরে।
এ অবস্থায় শহররক্ষা বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো হুমকির মুখে পড়েছে। সাধারণ মানুষের মাঝেও দেখা দিয়েছে আতঙ্ক।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, খোয়াই নদীর উৎপত্তিস্থল ভারতের ত্রিপুরায় অতি বৃষ্টির কারণে নদীতে হঠাৎ করে মঙ্গলবার পানি বাড়তে থাকে। রাতে পানি বিপদসীমা ছাড়ায়। বৃহস্পতিবার সকাল ৮টায় শহরের মাছুলিয়া পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ২২৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। বিকেল ৪টায় নদীর পানি কমে বিপদসীমার ১৩৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। একই সময় খোয়াই নদীর বাংলাদেশে প্রবেশস্থল বাল্লা পয়েন্টে পানি বিদসীমার নিচে অবস্থান করছিল।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তাওহীদুল ইসলাম জানান, পানি খুব দ্রুতই কমছে। আশা করা যাচ্ছে রাতেই পানি বিপদসীমার নিচে নেমে যাবে।