জমকালো আয়োজনে শুরু ফুটবল মহাযজ্ঞ

19

সুবজ সিলেট ডেস্ক ::
সারা বিশ্বের সবগুলো পথ এসে মিশে গেছে যে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে। চার বছরের অধীর অপেক্ষা, রেড স্কয়ারে চলতে থাকা ঘড়িটার কাঁধা ধীরে ধীরে এসে মিশে যাচ্ছে শূণ্যের ঘরে। তার আগে লুঝনিকি স্টেডিয়ামে হয়ে গেলো বিশ্বকাপের বর্ণিল উদ্বোধন। যেখানে আধুনিকতার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে রাশিয়ার সমাজ, সংস্কৃতি এবং রূপকথার সমাহার। সর্বশেষ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন এবং ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনোর স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে উম্মোচিত হয়ে গেলো, দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ রাশিয়া বিশ্বকাপের।
বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে আটটায় শুরু হয় বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসরের এ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। লুঝনিকি স্টেডিয়িামের অনুষ্ঠানের পুরো মঞ্চটিই তৈরি করা হয় ফুটবলের আদলে।
ফুটবল খচিত মঞ্চে শুরুতেই পুরো স্টেডিয়াম কাঁপাতে আসেন আসবেন ব্রিটেনের বিখ্যাত পপ স্টার রবি উইলিয়ামস। তার ‘লেট মি এন্টারটেন ইউ’ গানের সাথে সাথে মাঠে প্রবেশ করেন ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কিংবদন্তী রোনালদো নাজারিও ডি লিমা। রাশিয়া বিশ্বকাপের মাস্কটের হাত ধরেই মাঠে প্রবেশ করেন দু’বারের বিশ্বজয়ী এ ফুটবলার। ববি উইলিয়ামসের সাথে তাল মেলাতে রূপকথার পাখির ডানায় ভর করে মাঠে প্রবেশ করেন রাশিয়ান বিখ্যাত উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শিল্পী এইডা গারিফুলিনা।
জমকালো আয়োজনে পর্দা উঠলো ফুটবলের মহাযজ্ঞ, বিশ্বকাপ ফুটবলের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী স্নায়ু যুদ্ধ ও ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়ার পর বিশ্ব অর্থনীতিতে ভালোভাবে দাঁড়াতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দেশ রাশিয়াকে। ভেঙে ১৫টি ভাগে ভাগ হওয়ার পরও, রাশিয়া পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ দেশ। সেই দেশেই প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর।
ভøাদিমির লেনিনের ‘মাঝে মাঝে ইতিহাসকে একটু ধাক্কা দেওয়ার প্রয়োজন আছে’- এই উক্তি ধরেই রাশিয়া নাম লেখিয়েছে ইতিহাসে। ফ্যাসিজমকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ১০ দিনের অক্টোবর বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক যে সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠিত হয়েছিল সেই দেশেই প্রথমবারের মতো আয়োজিত হচ্ছে ফুটবলের মহাযজ্ঞ, বিশ্বকাপ ফুটবল।
টেকো মাথার লেনিনের সঙ্গে অনেকটাই মিল রয়েছে বর্তমান রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের। নামের প্রথমেও যেমন দুজনের ভ্লাদিমির রয়েছে তেমনি কাজেও অনেকটা একই রকম। পশ্চিমা বিশ্বকে টপকে ২০১০ সালে রাশিয়াতে বিশ্বকাপ নিয়ে আসতে বেশ ভালোই প্রভাব ছিল পুতিনের; কিন্তু সবকিছু পেছনে ফেলে আট বছর পর বিশ্বকাপের পর্দা উঠলো রাশিয়ায়। এরসাথে চার বছরের অপেক্ষার অবসান হলো।
যদিও লুঝনিকির হিম শীতল আবহাওয়া বাংলাদেশ সময় রাত ৯টায় স্বাগতিক রাশিয়া ও সৌদি আরবের মধ্যকার ম্যাচ দিতে শুরু হয়েছে সেই বিশ্বযজ্ঞের। ৩২টি দল ৮ গ্রুপে ভাগ হয়ে ৬ কেজি ওজনের সোনায় মোড়ানো বিশ্বকাপ ট্রফির জন্য লড়বে দীর্ঘ এক মাস। হাসি-কান্নার মিশেলে হওয়া বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টে এবারও যে রোমাঞ্চ ছড়াবে সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না।
উদ্বোধনের দিনের আগ পর্যন্ত মস্কোয় বোঝা যায়নি এখানে বিশ্বকাপ নিয়ে মেতে উঠেছে রাশিয়ানরা। শুধুমাত্র রেড স্কোয়ারে একদিন আগে বিশ্বকাপ নিয়ে কিছুটা আমেজ আঁচ করা গিয়েছিল। কিন্তু গত এক সপ্তাহে বিমান বন্দর থেকে শুরু করে রাশিয়ার রাজধানী শহরটিতে বোঝাই যায়নি, বিশ্বকাপের আমেজ স্বাগতিকদের মাঝে ভর করেছে। যতটা ছিল বিদেশিদের আনাগোনা।
তবে উদ্বোধনের দিনই বোঝা গেছে, রাশিয়ানরা বিশ্বকাপ নিয়ে কতটা উন্মাদনায় মেতেছে। উদ্বোধনী ম্যাচেই যেহেতু তাদের নিজেদের দেশ নামছে মাঠে, এ কারণে দুপুর ২টায় লুঝনিকি স্টেডিয়ামের প্রবেশ পথের গেট খোলার আগেই পুরো চত্ত্বর ভরে যায় রাশিয়ানদের ভিড়ে। হাজার হাজার রাশিয়ান ভিড় করেছে লুঝনিকির পাশ-পাশে। টিকিটধারীরা জড়ো হয়েছে স্টেডিয়ামে প্রবেশ করার জন্য। জার্সি, ব্যানার, ফেস্টুন কিংবা স্টিকার নিয়ে দলে দলে তারা হাজির হয়েছে স্টেডিয়ামের প্রবেশ পথে।
রাশিয়ানদের উৎসাহ দেখে মনে হচ্ছে, সত্যিই রাশিয়ায় বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। উদ্বোধনী দিনে রাশিয়ার ম্যাচ হওয়ার কারণেই স্বাগতিকদেও উৎসাহ ছিলো বেশী।
ব্রাজিলের ‘হেক্সা’ নাকি জার্মানির পঞ্চম? নাকি আর্জেন্টিনার দীর্ঘ ৩২ বছরের ট্রফিখরা ঘোচাবেন লিওনেল মেসি? সবকিছুর উত্তরই পাওয়া যাবে, ১৫ জুলাই, এই লুঝনিকিতেই। তার আগে একমাস পুরো রাশিয়া চষে বেড়াবে বিশ্বকাপ। ১১টি শহরের ১২টি ভেন্যুতে, ফাইনাল বাদে মোট ৬৩টি ম্যাচের মধ্যদিয়ে।
বিশ্বকাপের ২১তম আসরে গ্রুপ পর্বসহ মোট ম্যাচ ৬৪টি ম্যাচ হবে ১১টি ভিন্ন শহরের ১২টি ভিন্ন ভিন্ন স্টেডিয়ামে। যেখানে খেলোয়াড়দের এপাশ থেকে ওপাশ মিলিয়ে অতিক্রম করতে হবে ১৮০০ মাইল। বিশ্বকাপের ড্রতেও ছিল চমক। যেখানে র্যাংকিংয়ের শীর্ষ ৭ দলের সঙ্গে ছিল স্বাগতিক দেশ রাশিয়া।
রাশিয়ার এখানে থাকাটাই বড় আশ্চর্যের, কেননা বিশ্বকাপে অংশ নেয়া দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বাজে র্যাংকিং যে তাদেরই! সোভিয়েত ভাঙার পর চারবার বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে একবারও গ্রুপ পর্বের গণ্ডি পেরুতে পারেনি। এবারও যে পারবে সেই স্বপ্নও এখন ধূসর। রাশিয়ার ৫ভাগেরও কম মানুষ মনে করে, রাশিয়া বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হতে পারবে।
স্বাগতিকদের এই যখন অবস্থা তখন আশায় স্বপ্ন বুনছে, ‘এ’ গ্রুপে থাকা ১৯৩০ ও ১৯৫০ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে। লুইস সুয়ারেজ, কাভানি, গোডিনদের নিয়ে গড়া উরুগুয়ে দল অন্য যে কোন বারের চেয়ে এবার বেশ পরিণত। আর ডাগআউটে থাকা বুড়ো হেড মাস্টার অস্কার তাবারেজের অধীনে দলটির প্রত্যাশার পাল্লাও বেশ ভারি।
সুয়ারেজদের মতো উচ্ছ্বাস নেই রোনালদোর পর্তুগাল দলে। বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ সাফল্য দুবার সেমিফাইনালে খেলা। যার একটিতে হয়েছিল তৃতীয় অন্যটিতে চতুর্থ; কিন্তু এবারের পর্তুগাল যে অন্যবারের চেয়েও ভয়ঙ্কর! সেটা মানতে টিনের চশমা পরা লাগে না। প্রথমবারের ইউরো চ্যাম্পিয়ন জিতেই বিশ্বকাপে পা রাখছে তারা; কিন্তু বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার দৌড়ে কতটুকু তাদের টেনে নিয়ে যেতে পারবেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, সেটাই দেখার বিষয়।
রোনালদোদের সুখের দিনে ফেবারিটদের ভেতর সবচেয়ে বাজে অবস্থানে রয়েছে স্পেন। বিশ্বকাপ শুরুর একদিন আগে কোচ হুলেন লোপেতেগুইর বহিষ্কারে তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়েছে স্পেনের খেলোয়াড়দের মনোবল। যতই পেশাদারিত্বের দোহাই দিক, এমন সময়ে কোচ ছাঁটাই একটা দলের জন্য কতটা হুমকি হতে পারে সেটারই আভাস পাওয়া যাচ্ছে স্প্যানিশদের কথাতে। এক কোচ বহিষ্কার ২০১০ সালের চ্যাম্পিয়নদের বিশ্বকাপ স্বপ্ন ফিকে হওয়ার অপেক্ষায়; কিন্তু দুর্দান্ত একটি দল থাকার কারণে স্পেনকে এখনই বাজির দর থেকে বাদ দেওয়া যাচ্ছে না।
ইউরোপের আরেক দেশ ফ্রান্স রয়েছে বেশ ফুরফুরে মেজাজে। বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম দাবিদারও ফ্রান্স। তারুণ্যের জয়গানে এবারের ফ্রান্স দলে রয়েছে এক ঝাঁক তারকা। পগবা, গ্রিজম্যান, এমবাপে, কান্তেদের ফ্রান্স বিশ্বের যে কোন দলের জন্যেই যে হুমকি, এটা মানেন সবাই। এছাড়াও দলটির দায়িত্বে রয়েছেন দিদিয়ের দেশম। যার অধীনে দুর্দান্ত খেলছে ’৯৮ এর চ্যাম্পিয়নরা।
বিশ্বকাপ জয়ের দিক থেকে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। তিতের অধীনে যেন আবারো সেই ‘জোগো বনিতো’ময় ব্রাজিল দলের ছায়া দেখতে পাচ্ছে এবারের সেলেসাওদের মাঝে। নেইমার-কৌতিনহো-হেসুসদের নিয়ে গড়া ব্রাজিল দল যে এবারের যোগ্য দাবিদার সেটা তারা প্রতিনিয়ত ম্যাচ জিতে প্রমাণ করছে। সবার আগে প্রথম দেশ হিসেবে রাশিয়া বিশ্বকাপে সুযোগ করে নেওয়াটাও প্রমাণ করে, কতটা ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের মাধ্যমে একটি দল হয়ে গড়ে উঠেছে ব্রাজিল।
ব্রাজিলের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনাতে এবারও সেই ‘অপেক্ষার প্রহর’ শেষ করার প্রত্যয়। ২০১৪ সালের রানার্সআপ দলটি খেলবে এবার মেসির অধীনে। টানা তিনটি মেজর টুর্নামেন্টের ফাইনালের হারে মানসিকভাবে ভেঙে পড়া আর্জেন্টিনা দলের ট্রফি খরা ঘোচানোর এটাই সম্ভবত মোক্ষম ও শেষ সময়। লিওনেল মেসি, আগুয়েরো, ডি মারিয়া, দিবালা, হিগুয়াইনদের নিয়ে গড়া আক্রমণভাগ যে কোন প্রতিপক্ষের জন্যেই আতঙ্কের; কিন্তু আবারও কি স্বপ্ন ভাঙবে মেসির? ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে গোল্ডেন বল হাতে মেসির মলিন চেহারা এখনো আর্জেটাইনদের মনে কাঁটা হয়ে বিঁধে।
যে জার্মানির কাছে হেরে স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছিল আর্জেন্টিনার, তারাই এবার ইতিহাস গড়ার পথে একধাপ এগিয়ে। ব্রাজিল ও ইতালিই কেবল টানা দুবার বিশ্বকাপ জিততে পেরেছে। সেই তালিকায় নাম লেখানোর এবারও সুবর্ণ সুযোগ জার্মানদের সামনে। প্রতিবারের মতো এবারও জার্মানি দলে প্রতিভার ছড়াছড়ি। জার্মানদের বড় শক্তি, একটা দল হিসেবে খেলে তারা; কিন্তু বিশ্বকাপের আগে গুনডোগান ও ওজিল বিতর্কে কিছুটা টালমাটাল জার্মান দল। তবুও এই জার্মান দল যে বাজির দরে অন্য সব দলের চেয়ে এগিয়ে, সেটি অনুমেয়।
কিন্তু বিশ্বকাপ মানেই যে ফেবারিটদেরই শুধু জয়, তা নয়। বিশ্বকাপ মানেই অঘটন। এখানে ৩২টি দলই সমান। কেউ কারোর চেয়ে কম নয়। এশিয়া কিংবা আফ্রিকার দেশগুলো শক্তিও সামর্থ্যে পিছিয়ে থাকলেও যে কোন বড় দলের স্বপ্ন চুরমার করে দিতে বেশ পটু তারা। যেমনটা ঘটেছিল ২০০২, ২০১০ ও ২০১৪ বিশ্বকাপে। আগের আসরের চ্যাম্পিয়নদের বিদায় নিতে হয়েছিল প্রথম পর্ব থেকেই।
মেসি-রোনালদো-নেইমারদের সময়ের সেরা ফর্মে থাকা অবস্থায় বিশ্বকাপে খেলতে আসায় সমর্থকদের মনে জেগেছে অন্যরকম উন্মাদনা। এছাড়াও সময়ের সেরা খেলোয়াদের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া মোহামেদ সালাহ, লুইস সুয়ারেজ, রবাট লেওয়ানডস্কি, থমাস মুলাররাও রয়েছেন বিশ্বকাপ মাতানোর অপেক্ষায়। তবে দিনশেষে বুড়ো ইনিয়েস্তার কাঁধে চেপেই আরেকবার বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দ মাততে পারে কিনা স্পেন, সেটি সময়েই বলে দিবে। সে যাই হোক, তারকায় ঠাঁসা এবারের ফুটবল বিশ্বকাপ যে অন্যবারের চেয়েও বেশ আকর্ষণীয় ও জমজমাট হবে, সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না।