দেশে এক ডজন এয়ার লাইনস : টিকে আছে তিনটি

26
সবুজ সিলেট ডেস্ক ::
গত ২০ বছরেরও বেশি হবে, দেশের বেসরকারি খাতে পর্যায়ক্রমে ১২টি এয়ার লাইনস কোম্পানি ব্যবসা শুরু করে। তবে টিকে আছে মাত্র তিনটি। চালু হওয়ার আগেই বন্ধ হয়েছে দুটি বেসরকারি এয়ার লাইনস। আবার এক বছরের মাথায়ও বন্ধ হয়েছে একাধিক বিমান কোম্পানি। প্রায় দুই যুগের এই পথচলায় বেসরকারি খাতে বিমান পরিচালনায় অর্জন কতটুকু— নেপালে দেশীয় ইউএস-বাংলার উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হওয়ার পর বেসরকারি এয়ার লাইনসের ব্যবসায়িক সক্ষমতা এবং যাত্রীসেবা নিয়ে নানামুখী আলোচনা উঠে আসে।
তবে আশার কথা হচ্ছে, চ্যালেঞ্জ ও লোকসান নিয়েও এই ব্যবসায় আসছে নতুন নতুন এয়ার লাইনস। আবার এ খাতে যাত্রী বেড়েছে কয়েক গুণ। স্বাভাবিকভাবেই বড় হয়েছে ব্যবসা। তবে এ খাত বিকাশের ক্ষেত্রে বহু প্রতিবন্ধকতা এখনো রয়ে গেছে, যা দূর করার লক্ষণ নেই বললেই চলে। বিশ্লেষকদের মতে, আকাশসেবায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়াতে জেট ফুয়েলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক জটিলতা দূর করা জরুরি। আর উদ্যোক্তারা চান, দেশীয় বিমান পরিবহন সংস্থার জন্য পৃথক নীতিমালা।
অন্যদিকে বিমান পরিবহন সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণার অভাবেই টিকে থাকতে পারছে না এয়ার লাইনসগুলো। আবার ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও বিমান বন্দরগুলোর অবকাঠামোগত দুর্বলতা, দক্ষ জনবল ও প্রয়োজনীয় অর্থায়নের অভাবে বিমান পরিবহন ব্যবসায় সুবিধা করতে পারছে না দেশীয় এয়ার লাইনস। আন্তর্জাতিক রুটের পরিধি কিছুটা বাড়লেও এখনো ৭৫ শতাংশ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে বিদেশি এয়ার লাইনস। এসব কারণে বেসরকারি খাত হুমকির মুখে পড়ছে। এদিকে উদ্যোক্তারা বলছেন, শুরুর দিকে এই ব্যবসা পরিচালনার অভিজ্ঞতার অভাব, বৈষম্যমূলক নীতিসহ নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে একের পর এক বন্ধ হয়ে যায় বেসরকারি এয়ার লাইনসগুলো।
নভোএয়ার এয়ার লাইনসের প্রধান নির্বাহী (সিইও) ইমরান আসিফ বলেন, দেশের এয়ার লাইনসগুলো যখন চাচ্ছে যে আর একটু বড় হবে, তখন সেটা করতে গিয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে অবকাঠামোগত রিসোর্সগুলো। আকাশপথে বর্তমানে বাংলাদেশের যাত্রী প্রবৃদ্ধির হার গড়ে ৭ থেকে ৮ শতাংশ। যদিও এই মুহূর্তে জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে বেসরকারি এয়ার লাইনসগুলোর অবদান এখন ১ শতাংশ।
দেশের সবচেয়ে বড় অ্যাভিয়েশন কোম্পানি ইউএস-বাংলা এয়ার লাইনস। সংস্থাটির আটটি অভ্যন্তরীণ এবং পাঁচটি আন্তর্জাতিক রুটে বিমান রয়েছে। আর নভোএয়ারের বিমান চলে সাতটি অভ্যন্তরীণ রুট এবং একটি আন্তর্জাতিক রুটে। রিজেন্ট এয়ারের পাঁচটি অভ্যন্তরীণ এবং পাঁচটি আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। নিয়ম অনুযায়ী, এক বছর অভ্যন্তরীণ রুটে উড়োজাহাজ চালানোর পর আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা আয়েটার পূর্বাভাস, এয়ার লাইনস ব্যবসায় এ বছর ২ হাজার ৯৪০ কোটি ডলার মুনাফা হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নীতি সহায়তা পেলে বাংলাদেশও হতে পারে এ মুনাফার অংশীদার।
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ চান উদ্যোক্তারা : সিভিল অ্যাভিয়েশনের তথ্যমতে, বিদেশি এয়ার লাইনস সংস্থার সঙ্গে প্রতিযোগিতা ও অভ্যন্তরীণ ব্যবসায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে দাবি করেছেন এ খাতের প্রাইভেট উদ্যোক্তারা। উড়োজাহাজ পরিবহনে নানা ধরনের খরচের পরিমাণ কমাতে সিভিল অ্যাভিয়েশনের প্রতি দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছে বেসরকারি এয়ার লাইনসগুলো। তারা চান ঠিকে থাকার মতো পরিবেশ।
আন্তর্জাতিক রুটে যাত্রী বাড়ানোর তাগিদ : হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে প্রতিবছর ৮০ লাখ যাত্রী যাতায়াত করে। ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আয়াটা) হিসেব অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ যাত্রী পরিবহনের হার হবে আড়াই কোটি। আন্তর্জাতিক গন্তব্যে যাত্রী পরিবহনের ৬৫ শতাংশই এখনো বিদেশি এয়ার লাইনসের দখলে। ৩৫ ভাগ দেশীয় সরকারি বেসরকারি এয়ার লাইনসের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করলে আন্তর্জাতিক গন্তব্যেও বেসরকারি এয়ার লাইনসগুলোর যাত্রী বাড়ানো সম্ভব।
শুরুটা যেভাবে : ১৯৮৮ সালে বন্যাকবলিত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানোর প্রতিবন্ধকতার অভিজ্ঞতা থেকে ওই বছরই সরকারকে ছোট ছোট দূরত্বে উড়োজাহাজ চালুর ধারণা দেয় বিমানবাহিনী। একইসঙ্গে তৎকালীন সিভিল অ্যাভিয়েশন চেয়ারম্যান এয়ার কমোডর মইনুল ইসলাম ব্যক্তি মালিকানায় এয়ার লাইনস সংস্থা চালুর কথা চিন্তা করেন। তবে সরকারের এ-সংক্রান্ত কোনো নীতিমালা ছিল না। তাই সিভিল অ্যাভিয়েশনের এয়ার নেভিগেশন অর্ডার (এএনও) সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু করেন মইনুল ইসলাম। ১৯৯১ সালে সিভিল অ্যাভিয়েশন-সংক্রান্ত আদেশ সংশোধনের পর উন্মুক্ত হয় বেসরকারি খাতে এয়ার লাইনসের ব্যবসা।
১৯৯৭ সালে ‘এয়ার পারাবাত’ যাত্রা শুরু করে পাঁচ বছরের মাথায় বন্ধ হয়ে যায়। আর ১৯৯৮ সালে চালু হওয়া ‘জিএমজি এয়ার লাইনস’ ২০১২ সালের মার্চে বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৯৯ সালে ‘বেস্ট অ্যাভিয়েশন’ চালু হয়ে তিন বছর পর বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৫ সালে চালু হয় ‘এয়ার বাংলাদেশ’ এবং ২০০৭ সালে ‘রয়েল বেঙ্গল এয়ার লাইনস’। অব্যাহত লোকসানের কারণে এই দুটি এয়ার লাইনসও বন্ধ হয়ে গেছে। এরপর একে একে আসে জিএমজি এয়ার লাইনস, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ, বেস্ট অ্যাভিয়েশন, রয়েল বেঙ্গল এয়ার লাইনস, রিজেন্ট এয়ারওয়েজ, নভোএয়ার এবং ইউএস বাংলা এয়ার লাইনস। বর্তমানে চালু আছে শুধু রিজেন্ট, নভোএয়ার ও ইউএস-বাংলা।
২০১০ সালে রিজেন্ট, ২০১৩ সালে নভোএয়ার ও ২০১৪ সালে ইউএস-বাংলা যাত্রা শুরু করে। এই তিন এয়ার লাইনস সংস্থার ব্যবসায়ী ব্যবসার পরিমাণ বছরে তিন হাজার কোটি টাকা। দেশি-বিদেশি ১৬টি রুটে প্রতিদিন যাত্রী পরিবহন করছে এসব সংস্থার উড়োজাহাজ। তবে ১৯৯৮ সালে জিএমজি এয়ার লাইনস যাত্রা শুরুর মধ্যদিয়ে দৃশ্যপট যেন বদলে যায় পুরো অ্যাভিয়েশন খাতে। উড়োজাহাজ সেবার মান বৃদ্ধি জিএমজিকে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়।
সংস্থাগুলোর সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, বেসরকারি খাতে এই ব্যবসাকে লাভজনক করা ও এর বিকাশে অনেক বাধা আছে। সেগুলো দূর করতে হবে। ২০১০ সালের পর অনেকটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে, বেসরকারি এয়ার লাইনস খাত। রিজেন্ট, নভো ও ইউএস-বাংলা বহরে রয়েছে ছোট বড় আধুনিক প্রজন্মের ২০টি উড়োজাহাজ। দেশি-বিদেশি ১৬টি রুটে ডানা মেলছে বেসরকারি এই তিন এয়ার লাইনস। গত তিন বছরে অভ্যন্তরীণ রুটে এসব এয়ার লাইনসে যাত্রী বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি।
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এবং বিমান বোর্ডের সাবেক পরিচালক ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, প্রাইভেট এয়ার লাইনসগুলোর যাত্রীসেবার মান ভালো হচ্ছে। কারণ, তাদের এখন আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতা করতে হয়।