ট্রেন জার্নি : নিউইয়র্ক টু বাফেলো

58

খলকু কামাল ::

নিউ ইয়র্কের ২য় বৃহত্তম নগরী বাফেলোতে এর আগে দু’বার বাস ও কারে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। ৪০০ মাইল দূরত্ব হাইওয়েতে ৭০/৮০ মাইল বেগে ড্রাইভ করলে সময় লাগবে ৭ ঘণ্টার মতো। ১৯৮৪ থেকে নিউ ইয়র্কে বসবাস করার পরও এখন পর্যন্ত দূরপাল্লার ট্রেন ভ্রমণ করার সুযোগ হয়নি। জরুরি প্রয়োজনে এবার যখন বাফেলো যাবো, তখন সিদ্ধান্ত নিলাম ইনশাআল্লাহ ট্রেনেই যাবো। আমার একটি মাত্র মেয়ে মামণি সাওদাকে বললাম ট্রেনের টিকিট বুক করতে। সে কম্পিউটারে অনেক ঘাটাঘাটি করে ৬৫ ডলারে ওয়ানওয়ে টিকিট পেয়ে গেল। পর দিন ভোর সাড়ে চারটায় ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামাজ আদায় করে সাবওয়েতে ম্যানহাটন গ্রেন্ট সেন্ট্রাল এমট্রাক রেল স্টেশনে গিয়ে পৌঁছি ৬টার সময়। আমার ট্রেন নির্ধারিত প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে। ট্রেনের ভিতরে উঠে বসে পড়ি প্রথম লাইনে। সবাই যার যার পছন্দ মতো সিটে বসে পড়ে। টিকেটে সিট নাম্বার দেওয়া থাকে না।
আমেরিকায় দূরপাল্লার ট্রেনে প্রথম যাচ্ছি। কাটায় কাটায় ৬টা ৪০ মিনিটে ট্রেন ছাড়লো বাফেলোর পথে। চমৎকার আবহাওয়া হাডসন নদীর তীর ঘেঁষে ৭০-৮০ মাইল বেগে ট্রেনটি ছুটে চলছে। আমি বসেছি প্রথম সারিতে। পুরো কামরায় আসন রয়েছে ৬০টি। অথচ যাত্রী সংখ্যা অর্ধেক হবে। মাইকে এলান; ট্রেনের মধ্যখানের কামরায় চা-কফি নাস্তার বগি রয়েছে। যে কেউ ইচ্ছে করলে ওখানে গিয়ে তার ক্ষুদা মিটাতে পারে। বিমানের মতো বড় বড় সিট। পা রাখার পর্যাপ্ত জায়গা আছে। আরামদায়ক সিট। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ২টি বাথরুম। নিজেকে প্রশ্ন করলাম, ইকোনমি ক্লাসের কামরা যদি এতই অত্যাধুনিক হয়, তবে প্রথম শ্রেণীর আসন অথবা পুরো বগীটি কতই না অত্যাধুনিক হবে। গত রাতে পর্যাপ্ত ঘুম হয়নি, ঘুম আসে আর যায়। এমন সময় টিটি এসে টিকিট চেক করে গেলো। আমি দূর কোথায় গেলে আমার নিত্য সাথী পত্রপত্রিকা ও বই সাথে নেই। সময় পার করার জন্য ‘উসমানী খেলাফতের স্বর্ণকণিকা’ নামে একটি বই পড়ছি। বইয়ের লেখক আইনুল হক কাসিমী। হঠাৎ কানে ভেসে আসলো কোরআনের আওয়াজ। পিছনে তাকিয়ে দেখি, এক যুবক। হাই, হ্যালো বলে জিজ্ঞেস করলাম, কোন দেশি। সে বললো, ইয়েমেনী আরব। সে শুয়ে শুয়ে মক্কা শরীফের শীর্ষ ইমাম সুদাইসির তেলাওয়াত শুনছে। পুরো কামরায় কোন টু শব্দ নেই। কেউ ঘুমিয়ে আছে, কেউবা আমার মতো বই পড়ছে আর কেউবা মোবাইল ফোনে টিপাটিপি করছে আর তার মনের খোরাক মিটাচ্ছে। যাত্রাকালীন সময়ে পুরো কামরায় না পেলাম কোন ফেরিওয়ালার উৎপাত, না দেখতে পেলাম বিনা টিকিটকারী যাত্রীদের কাছ থেকে টিটি সাহেব পকেটে মাল ঢুকাচ্ছেন।
ট্রেন ছাড়ার প্রথম ঘণ্টাখানিক সময় সিটে বসে নদীর মনমুগ্ধকর দৃশ্য উপভোগ করার সাথে সাথে ডান দিকে তাকালে চোখ পড়ে গ্রাম-শহরের ছোট ছোট প্রাইভেট ঘরবাড়ি, পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাস্তাঘাট, গমের চাষ, বনজঙ্গলসহ ছোটখাটো অনেক হাওর। তখন মনে পড়ে যায় ঢাকা কমলাপুর রেল স্টেশন থেকে টঙ্গী পর্যন্ত রেল লাইনের উভয় পাশে বস্তিবাসীদের নোংরা পরিবেশে খুপড়ি ঘর তৈরি করে আবর্জনার মধ্যে থাকা-খাওয়াসহ পচা মশা-মাছির আর্তনাদ ও উভয় পাশের দুর্গন্ধ। বগীর ভিতরে প্রবেশ করা মাত্রই যাত্রীরা তাদের রুমাল দিয়ে নাকটি চেপে ধরেন অথবা জানালা বন্ধ করে এ দূরত্ব অতিক্রম করেন। সরকারের উচিত বস্তীবাসীদেরকে অন্য কোথাও স্বল্প বাজেটে পুনর্বাসন করে রেলের উভয় পাশের এলাকাকে ফুলের বাগান অথবা ছোট ছোট গাছ লাগিয়ে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন এরিয়া হিসেবে গড়ে তোলা। এতে যাতায়াতকারী প্রতিটি মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে পাবে। কারণ পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ।
দূরপাল্লার ট্রেন এর আগে ১৯৮৪ সালে কানাডার টরন্টো থেকে আমেরিকার সীমান্ত নগরী উইন্সর এবং দু’যুগ আগে ১৯৯৪ সালে লন্ডনের ভিক্টোরিয়া রেল স্টেশন থেকে ম্যানচেস্টার পর্যন্ত চড়ার সুযোগ হয়েছিলো। কিন্তু নিউইয়র্কের রেলের স্বাদ এর আগে আর পাওয়া হয়নি। অবশেষে ২০১৮ সালে যখন বাফেলো যাওয়ার সুযোগ পেলাম, তখন আমেরিকার দ্রুতগামী ট্রেন জার্নির অভিজ্ঞতা হাতছাড়া করেনি। নিউইয়র্ক ও বাফেলোর মধ্যখানে বড় রেল স্টেশন সিয়ারকোর্সে ৫ মিনিট ছাড়া অবশিষ্ট ১০-১২টি স্টেশনে ১ মিনিট করে যাত্রা বিরতি করে ২৪০ মিনিটে বাফেলো অ্যাক্সেঞ্জ মেইন স্টেশনে পৌঁছেই পেয়ে যাই আমার জন্য অপেক্ষারত বাফেলো কমিউনিটি লিডার, অতি পরিচিত ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব মোহাম্মদ ফখর ভাইকে। পরদিন দুপুরে তারই বাসায় খানার আয়োজন। প্রধান মেহমান সিলেট থেকে আগত এক যুগ আগ থেকে প্রকাশিত সিলেটের সর্বপ্রথম কালার দৈনিক সবুজ সিলেট-এর সম্মানিত সম্পাদক মুজিবুর রহমান ও আমি। যেহেতু আমার আদি নিবাস সিলেট শহরের শেখঘাটে, অতএব সিলেট বিভাগ, বিশেষ করে সিলেট শহর থেকে কোন মেহমান আসলে তার সাথে দেখা-সাক্ষাৎ, আলাপ-আলোচনার উৎসাহ দ্বিগুণ বেড়ে যায়। সিলেটের পত্রপত্রিকা, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদসহ সকল স্থরের খবরাখবরসহ অনেক বিষয়ে তার কাছ থেকে অবগত হই। সিলেটের উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সিলেট তথা সিলেট শহরের অধিকাংশ উন্নয়ন হয়েছে মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জের সাইফুর রহমান ও হুমায়ুন রশীদের কারণে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পরেই সবচেয়ে ক্ষমতাশালী অর্থমন্ত্রী এম এ মুহিত। তার আদি নিবাস সিলেট শহরে। তিনি ইচ্ছে করলে তার নিজ জন্মভূমি সিলেট শহরকে উন্নয়নের জোয়ারে ভাসিয়ে দিতে পারেন।
সিলেটের এ মুহূর্তে প্রধান সমস্যা শহরের যানজট। বিশেষ করে বন্দরবাজার থেকে নিয়ে আম্বরখানা মোড় পর্যন্ত স্থায়ীভাবে যানজট মুক্ত করতে হবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সিলেট এয়ারপোর্টকে দৃষ্টিনন্দন বিমানবন্দরে রূপান্তরিত করে লাখ লাখ প্রবাসীদের সার্থে জরুরি ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন একটি টার্মিনাল নির্মাণ করা দরকার। এতে বহিবির্শ্বের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরো তড়িৎ ও আরামদায়ক হবে। ঢাকা-চট্টগ্রাম ও রাজশাহীর মতো সিলেটে দ্রুত মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, স্বপ্নের সিলেট-আখাউড়া ডাবল রেল লাইন নির্মাণ, সিলেট-ঢাকা ফোরলেন নির্মাণ, সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর, সিলেট শহরে ফায়ার সার্ভিস সদর দফতর স্থাপন ও সুনামগঞ্জ-নেত্রকোনা সড়ক নির্মাণ। ইতিমধ্যে ফখর ভাইর বোন ডজন খানিক আইটেম দিয়ে ডাইনিং টেবিল সাজালেন। মজাদার খানা সেরে আল্লাহর শোকর আদায় করে আবার বেড়িয়ে পড়লাম সিটি দেখতে।
বাফেলো ডাউনটাউন সিটির ওপারে কানাডা, এপারে আমেরিকা, মধ্যখানে নদী। আবার কোথাও সাগরের একটি অংশ। নিরিবিলি শান্ত এ শহর পর্যটনদের আকর্ষণের স্থান হিসেবে পরিচিত। পুরো শহর ঘুরতে ঘণ্টা খানিক সময়ের দরকার।
ওই দিন বিকালে সিলেটের সাবেক বিএনপি নেতা আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু মরহুম আব্বাসের ছোট ভাই মিহিনের বাসায় নাস্তার আয়োজন। আবার হাজির আমি, সবুজ সিলেট সম্পাদক মুজিবুর রহমান ও ফখর ভাই। কয়েক ধরনের নাস্তা খাওয়ার সাথে সাথে সিলেটের মেয়র নির্বাচন থেকে দেশের রাজনীতি, মুসলিম বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতি, সৌদি, মিসর ও আমিরাত মুনাফিক রাজা-বাদশাদের অনেক বিরোধিতার পরও এরদোগান বিপুল ভোজে জয়ী, আমেরিকার ৭২ বছরের শিশু রাষ্ট্রপতিসহ সব কিছুই ছিল টেবিল বৈঠকের আলোচনায়।
মারকাজ মসজিদে মাগরিব পড়তে গিয়ে দেখা হলো তাবলীগ জামাতের মুরব্বি আবুল কাসেম ও রান্নাবান্নার বিশ্ব মানের শেফ সাইদুর রহমান ভাইদের সাথে। প্রতি সামারের মতো এবারও তিনদিনের লোকাল ইজতেমা। মসজিদ ভর্তি মুসল্লি দ্বরা। এ জন্য ব্যস্ত সময় পার করছেন। নামাজ আদায় শেষে পিছনে দেখি হাফিজ গৌছ উদ্দিন ভাই। বললেন, আমাকে দেখা মাত্র ‘আরে খলকু কামাল ভাই, খবর পেয়েছি আপনি আরো ২ বার বাফেলো এসেছেন। এবার নো অজুহাত, এখনই আমার বাসায় যেতে হবে’। নাছোড়বান্দা শেষ পর্যন্ত আমি আর ফখর ভাই যেতে হলো এক ঘণ্টার সফরে। হরেক রকমের নাস্তা দিয়ে আপ্যায়ন করিয়ে তার বিশাল অট্রালিকা ঘুরে ফিরে দেখালেন। মাশাআল্লাহ। বাফেলোর ফিল মোড়ে অবস্থিত কারুকাজ দ্বারা তৈরি অত্যন্ত চমৎকার এ বাড়িটি দেখার মতো।
বাফেলো এ পর্যন্ত যারাই মুভ করেছে তারা বাড়িঘরের মেরামতের টুকটাক কাজ শিখে ফেলেছে। ২ যুগের চলাফেরার সাথী ঘনিষ্ঠ বন্ধু বাফেলোর প্রথম বাংলা সংবাদপত্র ‘বাফেলো বাংলা’ পত্রিকার সম্পাদক নিয়াজ মাখদুম-এর বাসায় হঠাৎ করে হাজির হই। তাকে দেখলাম নিজের ঘরের জানালা মেরামত করছেন। এটা চমৎকার উদ্যোগ। নিজের কাজ নিজেকে করতে হবে। ছোটখাটো কাজের জন্য পর নির্ভরশীল কমাতে হবে। তাকে সাধুবাদ জানাই। সবাই নিজ গরজে সাবলম্বী হতেই হবে। মনে রাখতে হবে দক্ষ জনশক্তির কোন বিকল্প নেই।
সামার সিজনে ৫-৬ মাস পুরাতন বাড়িঘর কেনাবেচা, মেরামত করা, বাড়ির আঙ্গিনায় তরি-তরকারীর বীজ রোপণ ও মাছ ধরার মৌসুম হিসেবে বাফেলোর পরিচিতি। তাই আমাদের নিউইয়র্কের মসজিদের সাবেক ইমাম আমার ঘনিষ্ঠজন মাওলানা মোজাম্মেল হক বর্তমানে বাফেলোতে বাস করে দিনের অধিকাংশ সময় পার করছেন নিজের বাড়ির খালি জায়গায় বিভিন্ন জাতের ফলমূলের গাছ লাগিয়ে। তার ছেলে শিব্বির (আপন ভাতিজার মতো) গাড়ি নিয়ে রেডি আমাকে ঘুরে ফিরে দেখাবে বলে। ভীষণ ব্যস্ত থাকায় তাকে সময় দিতে পারিনি। তবুও বাপবেটার আদর-আপ্যায়ন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
কেউ বলে লম্বা শাহিন, কেউ বলে সিলেট শহরের শাহিন। বাফেলো প্রবাসী বাংলাদেশীদের কাছে এক পরিচিত নাম। বাড়িঘর ক্রয়-বিক্রয়, মেরামত কাজের জন্য শাহিনের সবার কাছে একনামে পরিচিত। পার্ক এভিনিউ উপরে তার বাসা ও অফিসের সামনে প্রতিদিন সকালে সাদা-কালো স্প্যানিশ ডজন খানিক লোকের জটলা বাঁধে। তাদের ২/১ জনের সাথে আলাপ করে জানতে পেলাম, শাহিন তাদের আস্থা ও শেষ ভরসা। শাহিনের নিজস্ব কোম্পানী রয়েছে। শাহিন যেভাবে তাদের ভালোবাসেন তারা সেভাবে ভালোবাসে শাহিনকে।
মজার কথা হলো, এ সমস্ত দিনমজুর শ্রমিকরা অনেক দিন সকালে অফিসের সামনে এসে দেখে শাহিন যথাসময়ে উপস্থিত হতে পারেননি। কিন্তু তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে। তাদের বিশ্বাস শাহিনের দেখা পেলে কাজের ব্যবস্থা হবেই। এ জন্য শাহিনের বন্ধুবান্ধব তাকে পীর ও শ্রমিকদেরকে মুরিদ উপাধি দিয়েছেন। তাই পীর ও মুরীদদের সুসম্পর্ক দেখতে হলে একদিন আপনাকে ভিজিট করতে হবে শাহিনের অফিস বরাবরে।
সবশেষে বাফেলোবাসী আপনাদের সর্বাঙ্গীন কুশল কামনা করছি।

লেখক: নিইইয়র্ক প্রবাসী, গবেষক ও সমাজসেবক।