জমি সংক্রান্ত বিরোধ : প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে শিশু হৃদয়কে হত্যা!

30

আব্দুল্লাহ আল নোমান ::
ভূমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে ৫ থেকে ৬ ঘাতক নৃশংসভাবে হত্যা করে শিশু হৃদয় আহমদকে (১১)। ঘাতকদল লাশ গুম করতে সিলেট সদর উপজেলার বড়গুল গ্রাম সংলগ্ন শ্বেত শাহ মাজার এলাকায় ছড়ায় ফেলে দেয়। প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে ঘাতকরা এ পরিকল্পনা করে বলে জানিয়েছেন এয়ারপোর্ট থানার ওসি গৌসুল হোসেন। তিনি বলেন, আলোচিত এ হত্যা মামলায় ৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আদালতে তাদের রিমান্ড আবেদনও করা হয়েছে। গ্রেফতারের পর তারা পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকান্ডের দায় স্বীকার করেছে। রিমান্ডে এনে তাদের কাছ থেকে বিস্তারিত জানার পর হত্যাকান্ডের রহস্যের জট খুলে যাবে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মানুষের বাসায় বুয়া হিসেবে কাজ করা রেশমা বেগম স্বামী পরিত্যক্তা। একমাত্র ছেলে হৃদয় আহমদকে নিয়ে মা আফতেরা বেগমের সাথে বড়গুল এলাকায় বসবাস করতেন। ওই এলাকার কিছু জমি নিয়ে স্থানীয় দুটি পক্ষের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। ওই পক্ষ দুটির মধ্যে পাল্টাপাল্টি মামলাও চলছে। পুলিশের ধারণা এ বিরোধের বলি হয়েছে শিশু হৃদয় আহমদ।
গতকাল মঙ্গলবার এয়ারপোর্ট থানার এসআই ও হৃদয় হত্যা মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা এসআই আব্দুস সাত্তার জানান, তারা প্রাথমিকভাবে দোষ শিকার করেছে। রিমান্ডে তাদের জিজ্ঞাসাবাদে বিস্তারিত জানা যাবে।
গত ১৪ জুলাই সিলেট সদর উপজেলার বড়গুল শ্বেত শাহ মাজার এলাকায় একটি ছড়ার পাশ থেকে স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যে শিশু হৃদয় আহমদের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় তার দেহে ধারালো অস্ত্রের কয়েকটি আঘাত ও মরদেহ শেয়াল, কুকুরে খুবলে খাওয়ার চিহ্ন পাওয়া যায়। যা সুরতহাল রিপোর্টেও রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের ‘দায়িত্বহীনতার’ জন্য শিশু হৃদয় আহমদ হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে। হৃদয় হত্যার ৩৪ দিন আগে তার উপর নির্যাতনের অভিযোগে জালালাবাদ থানায় মামলা করেন তার মা, বড়গুলের বাসিন্দা রেশমা বেগম। আসামীরা জামিন নিয়ে মামলা তুলে নেওয়া হুমকি দেয়। অন্যথায় মা ছেলেকে হত্যা করা হবে বলে জানায়। এ ঘটনায় আতঙ্কিত মা রেশমা বেগম ৩ জুলাই জালালাবাদ থানায় একটি সাধারণ ডায়রি করেন। যার কোনো তদন্ত না হওয়ায়, ৮ জুলাই পুলিশ কমিশনারের কাছে প্রাণের নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করেন। এতো কিছু করেও পারলেন না আদরের সন্তানকে বাঁচাতে। পুলিশ কমিশনারের কাছে আবেদনের ৫ দিন পরই ঘাতকের ধারালো অস্ত্র কেড়ে নেয় নিষ্পাপ শিশুটির প্রাণ।
জানা গেছে, বাসাবাড়িতে বুয়া হিসেবে কাজ করা রেশমা বেগমের ছেলে হৃদয় আহমদ গত ১৩ জুলাই দুপুরে কালো রং এর প্যান্ট ও আকাশী রং এর গেঞ্জি পরে বের হলেও সেদিন আর ঘরে ফিরেনি হৃদয়। পরে তাকে সকল আত্মীয় স্বজনের বাড়িতেও খুঁজে তাকে পাওয়া যায়নি। পরের দিন ১৪ জুলাই প্রতিবেশি ওসমান মিয়া মোবাইল ফোনে কল করে রেশমা বেগমকে জানায়, বড়গুল শ্বেত শাহ মাজারের পাশে ছড়ায় একটি লাশ পড়ে রয়েছে। তখন রেশমা বেগম সেখানে গিয়ে ক্ষত বিক্ষত শিয়াল কুকুরে খাওয়া লাশটি তার সন্তান হৃদয়ের বলে সনাক্ত করেন। এসময় লাশের শরীরে বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাত দেখতে পাওয়া যায়। নিহতের বাম পা ও পেটের বিভিন্ন অংশ শেয়াল কুকুরে খেয়ে ফেলে। হৃদয়কে অপহরণের পরে হত্যা করে তার লাশ যেন সনাক্ত না করতে পারে সেজন্য তার পরণের জামা পরিবর্তন করে ফেলে ঘাতকরা। লাশের পরণে তখন ছিল বেগুনি রংয়ের ট্র্যাকসুট ও লাল রংয়ের শার্ট। ওইদিনই রেশমা বেগম বাদি হয়ে এয়ারপোর্ট থানায় হত্যা মামলা (নং-১৭) দায়ের করেন।
গত রোববার রাতে এয়ারপোর্ট থানা পুলিশ তিন জন সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃতরা হলো বড়গুল এলাকার ওহাব আলির ছেলে মানিক (৪০), তোতা মিয়ার ছেলে সুজন আহমদ (৪৫), গফুর মিয়ার ছেলে সামছু (৪৬)। গতকাল সোমবার গ্রেফতারকৃতদের ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন জানিয়ে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন এয়ারপোর্ট থানার ওসি গৌছুল হোসেন। তিনি বলেন, শিশু হৃদয় হত্যা মামলায় সন্দেহভাজনদের গ্রেফতার করেছে পুলিশ। হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটনের জন্য জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন রয়েছে। গ্রেফতারকৃতদের ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন জানানো হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার ‘শিশু হৃদয় হত্যা : তদন্তে গতি, সন্দেহভাজন ৩ আসামী গ্রেফতার, ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন’ ও গত সোমবার ‘লাশ গুম করতে পোশাক পাল্টে ফেলে ঘাতকরা’ এবং গত রোববার ‘নিরাপত্তা চেয়েও ছেলেকে বাঁচাতে পারলেন না মা’ শিরোনামে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দৈনিক সবুজ সিলেটে প্রকাশিত হয়। সংবাদ প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসে পুলিশ। হত্যাকান্ডের ১০ দিন পর ৩ সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করে। তবে মামলার এজাহারে উল্লেখিত সিলেট সদর উপজেলার বড়গুল গ্রামের ময়না মিয়ার ছেলে হেলাল মিয়া (৩৬), মনির মিয়া (৪০) ও খালিক মিয়া (৪৫) পলাতক থাকায় তাদের গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।