জলাবদ্ধতা, যানজট আর বিশুদ্ধ খাবার পানিই সিসিকের প্রধান ৩ সমস্যা

12

স্টাফ রিপোর্টার ::
সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচন দোড়গোড়ায়। প্রার্থীরা শেষ সময়ে ভোটারদের মনজয়ের চেষ্ঠা চালাচ্ছেন। অতীতের উন্নয়ন ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বাসযোগ্য মডেল নগরী গড়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন ভোটারদের। আর ভোটাররা হিসেব কষছেন, প্রার্থীদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি কতোটা বাস্তবায়িত হবে তা নিয়ে।
সিলেট নগরীর বাসিন্দারা জানান, জলাবদ্ধতা, যানজট আর বিশুদ্ধ খাবার পানি এই তিন সমস্যাকে যিনি গুরুত্ব দিবেন, তিনিই পরতে পারেন বিজয়মাল্য। এছাড়া নগরীতে রয়েছে সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব, পরিবহন সংকট, হকার সমস্যাসহ অন্যান্য নানা সমস্যা। এ সকল সমস্যা দূরীকরণে মেয়র প্রার্থীরা কে কি করছেন তার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সম্ভাবনার কথাও নগরবাসীর চিন্তায় রয়েছে।
সাধারণ ভোটারদের দাবি, সম্মোহনী বক্তব্য নয়, নগরীর উন্নয়নে আন্তরিক প্রার্থীকে বিজয়ী করা হবে। অনেকে দলীয় প্রতীকের নির্বাচনকে দলের নির্বাচন বললে, সাধারণ ভোটারদের কথা প্রতীক নয়, উন্নয়নে প্রার্থীর আন্তরিকতা দেখেই তারা ভোট দেবেন। সরকারি দল কিংবা বিরোধী দলের প্রার্থী যেই হোক না কেনো বাজেট পাশ করতে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের আন্তরিকতার অভাব নেই। নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী কিংবা আওয়ামী লীগ প্রার্থী বদর উদ্দিন কামরান যেই পাশ করুন না কেনো সিলেটের উন্নয়নে বরাদ্দ দিতে অতীতের মতো এবারো অর্থমন্ত্রীর কার্পণ্য থাকবে না। ২০১৩ সালের নির্বাচনে আরিফ ও কামরান প্রার্থী হয়ে সিলেট নগরীর যানজট নিরসন, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, সাইবার সিটি গড়া, সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানীয় জলের সমস্যার সমাধান, পরিবহন সংকট দূরীকরণ, শিক্ষার উন্নয়ন, হকার পূনর্বাসন, নগর বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, চিত্তবিনোদনের সুযোগ দেওয়া, প্রবাসী সেবাকেন্দ্র স্থাপন ও শিশুদের খেলার মাঠসহ পরিচ্ছন্ন ও আদর্শ সিলেট নগরী উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। জনসমর্থন আদায়ে তাদের সম্মোহনী বক্তব্য মন কেড়েছিল ভোটারের। তবে কামরান দু’মেয়াদে ও আরিফ এক মেয়াদে নগরভবনে আসীন হলেও ভোটারদের দেওয়া প্রধান প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছেন বলে অভিমত ভোটারদের।
এবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে সিসিকের ৪র্থ নির্বাচন। ৩০ জুলাই কে বসছেন সিসিকের মসনদে। কামরান না আরিফ ? এমন প্রশ্ন এখন জনমনে। তাইতো নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করতে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন আওয়ামীলীগের দলীয় প্রার্থী বদর উদ্দিন আহমদ কামরান ও বিএনপির দলীয় প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী। তবে এবার সচেতন ভোটাররাও। আরিফ-কামরানের অতীত পর্যালোচনা করছেন তারা। গত ৩ বারের নির্বাচনে তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়ন করেছেন সে হিসেব কষছেন ভোটাররা।
২০০৩ সালের প্রথম সিটি নির্বাচনের ইশতেহারে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বদর উদ্দিন আহমদ কামরান নগরীর জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, নাগরিকদের সেবা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবা ও চিত্তবিনোদনের সুযোগ তৈরি, হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারসহ নগরীর অন্যান্য মাজার উন্নয়ন, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শশান সংস্কার ও উন্নয়ন, শহীদ মিনার সংস্কার ও নির্মাণ, নগরীর সড়ক নির্মাণ ও সংস্কার, ড্রেন সংস্কার, ফুটপাত নির্মাণ ও সংস্কার, হকার পুণর্বাসন, পানীয়জল সরবরাহ এবং নগরীর সৌন্দর্য বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেন। আর ২০০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নির্বাচনে কারাগারে থাকাবস্থায় কোন ইশতেহার দেননি বদরউদ্দিন আহমদ কামরান।
নির্বাচনের সময় দেওয়া বেশিরভাগ প্রতিশ্রুতিই বাস্তবায়ন করতে পারেননি কামরান; এমনটা অভিমত ভোটারদের। স্থানীয়দের অভিযোগ, পানীয় জলের ব্যবস্থা, চিত্তবিনোদনের সুযোগ তৈরি, যানজট ও জলজট নিরসনসহ বিভিন্ন আশ^াস পুরণে ব্যর্থ হয়েছেন কামরান ।
তবে এ ব্যাপারে বদরউদ্দিন আহমদ কামরান বলেন, আমি নির্বাচিত হওয়ার পর সিংহভাগ প্রতিশ্রুতিই আমি বাস্তবায়ন করতে পেরেছিলাম। যে প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ করা সম্ভব হয়নি তা পূরণ করতে গত নির্বাচনের ইশতেহারে সংযুক্ত করেছিলাম। কিন্তু পরাজিত হওয়ায় তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। তিনি দাবি করেন, বর্তমানে সিসিকের যে উন্নয়ন হয়েছে এর সবই আমার সময়কার পরিকল্পনার অংশ।
এদিকে বিএনপি সমর্থিত আরিফুল হক চৌধুরীর ২০১৩ সালের নির্বাচনে সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মেয়র পদে বিজয়ী হওয়া অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিলো- সিলেটকে সাইবার সিটিতে পরিণত করা। নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও জনবহুল স্থান ওয়াইফাইয়ের আওতায় নিয়ে আসার কথাও দিয়েছিলেন আরিফ। তবে মেয়াদ শেষ হলেও ইশতেহারের এই কথা রাখতে পারেননি তিনি।
আরিফের নির্বাচনে আরিফের ১৪ দফার ইশতেহারে ছিল- সিটি করপোরেশনকে জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়া, নগরীর ব্যক্তিদের সমন্বয়ে উপদেষ্টা পরিষদ গঠন, নিজস্ব আয় বৃদ্ধি, পানীয় জলের সমস্যার সমাধান, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, যানজট ও পরিবহন সংকট দূরীকরণ, শিক্ষা উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন নগরী গঠন ও প্রবাসী সেবাকেন্দ্র স্থাপন।
আরিফুল হক চৌধুরী আরো কথা দিয়েছিলেন তিনি মেয়র নির্বাচিত হলে সিলেট নগরীর জন্য মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করবেন। সিলেট কারাগারের জায়গায় আধুনিক সাইবার সিটি গড়ে তুলবেন। পানীয় জলের সমস্যা সমাধানে প্রয়াত অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের সময় নেয়া উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে নগরীর প্রতিটি ঘরে সুপেয় খাবার পানি পৌঁছে দিবেন। বেসরকারি উদ্যোগে নগর বাস সার্ভিস আরও সম্প্রসারণ এবং বিআরটিসি বাস ও ট্যাক্সি ক্যাব সার্ভিস চালু করবেন। পথচারীদের নিরাপদ পারাপারের জন্য ওভারজ ও গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ফ্লাইওভার নির্মাণ করবেন। নগরীর শিক্ষার উন্নয়ন ও প্রসারে নগর বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করবেন।
এ ছাড়া বিদেশের সঙ্গে লিঙ্ক প্রোগ্রামের মাধ্যমে প্রফেশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট স্থাপন করবেন। স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে স্যাটেলাইট ক্লিনিক স্থাপন করবেন। কিন্তু গত ৫ বছরে তার ইশতেহারে কথা দিলেও সব কথা তিনি রাখতে পারেননি।
এখনো সুপেয় পানি সঙ্কট, জলাবদ্ধতা, যানজট, গণপরিবহন সঙ্কট- নগরীর প্রধান সমস্যা হয়ে রয়ে গেছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে কিছু উদ্যোগ নিলেও অল্প বৃষ্টিতে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। নগর বিশ^বিদ্যালয়, ফ্লাইওভার, ফুটওভার ব্রিজের করার কথা দিলেও বাস্তবায়নে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। ইশতেহারের পূর্ণ বাস্তবায়ন না করতে পারা প্রসঙ্গে আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, আমি মেয়রের দায়িত্ব নেওয়ার পর একে একে সবগুলো প্রতিশ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিন পরই নানা ষড়যন্ত্র আর মামলার মাধ্যমে আমার উন্নয়ন কর্মকান্ড ব্যাহত হয়। প্রায় আড়াই বছর আমাকে কারাগারে আটকে রেখে নগরবাসীকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তারপরও যেটুকু সময় পেয়েছি সেই সময়ে নগরবাসীর জন্য কাঙ্খিত উন্নয়ন করতে চেষ্টা করছি। নগরবাসী আবার আমাকে মূল্যায়ণ করলে বাকীগুলোও বাস্তবায়ন করবো।