বিনা পারমিটে দেশ চললে, বিনা লাইসেন্সে গাড়িতো চলবেই

95

আব্দুল করিম কিম
দেশ যখন বিনা পারমিটে বিনা লাইসেন্সে বা লাইসেন্স রিনিউ না করে চালানো যায় তখন বিনা লাইসেন্স বা লাইসেন্স রিনিউ না করে গাড়ি চালানো খুব হালকা বিষয় হয়ে যায়। কী ধরণের হালকা হয়, তা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বোঝার সুবিধার্থে আমিও হালকা করেই লিখছি। আমাদের এই প্রিয় দেশটা দীর্ঘদিন থেকেই অনিয়মকে নিয়ম বানিয়ে চলছে। দেশের শীর্ষকেন্দ্রেই অনিয়ম চলে। যারা দেশের আইন প্রণয়ন করবেন তাঁদেরকেই আইন ভাঙতে বেশি দেখা যায়। অধিকাংশ আইন প্রণেতা বিভিন্ন আমলে আইনসভার সদস্য হয়েছেন বেআইনীভাবে।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বিনা লাইসেন্স ও বিনা পারমিটে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান দেশের ড্রাইভার হয়ে দেশ চালনা শুরু করেন। হ্যাঁ/না ভোট দিয়ে একটা জাল লাইসেন্স যোগাড় করে আমৃত্যু দেশ চালাতে থাকেন। ১৯৮০ সালে একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় চালক জিয়াউর রহমান-এর মৃত্যু হয়। এরপর লাইসেন্স ও পারমিট ছাড়া এরশাদ বসেন ড্রাইভিং-এ। জোর করে নয় বছর স্টিয়ারিং ধরে ঝুলে থাকেন তিনি। তিনি এসময় অনেক দুর্ঘটনা ঘটিয়েছেন। সে সময়ে গাড়ির তেল চুরি সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়ে। রাতে জায়গা-বেজায়গায় তিনি গাড়ি পার্কিং করতেন। আবার দিনে টুপি লাগিয়ে দেশ চালাতেন ।

অন্যায়ভাবে স্টিয়ারিং ধরে রাখা ও অবৈধ কাজকর্মের জন্য ১৯৯০ সালে এরশাদকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে চালকের আসন থেকে নামানো হয়।

‘৯১ সালে লাইসেন্স নিয়ে দেশ চালানোর পারমিট দেয়া হয় খালেদা জিয়াকে। লাইসেন্স থাকা স্বত্বেও তিনি একাধিক দুর্ঘটনা ঘটান। এর মধ্যে মাগুরার দুর্ঘটনা উল্ল্যেখযোগ্য।

পাঁচ বছর পর পারমিট রিনিউ করার সময় এলে চাতুরীর সাথে পারমিট রিনিউ করেন। ১৫ ফেব্রুয়ারি ‘৯৬ সালে আবারো তিনি ড্রাইভিং সিটে বসে পড়েন। এবার অন্য ড্রাইভারদের কঠিন আন্দোলন শুরু হয়। সেই আন্দোলনের ঠেলায় তাঁকে স্টিয়ারিং ছাড়তে হয়। এবার দেশ চালানোর পারমিট পেয়ে যান শেখ হাসিনা। ছোটখাটো কিছু দুর্ঘটনা ঘটে তাঁর সময়ে। তারপরেও ভালো ছিল তাঁর দেশ পরিচালনা। কিন্তু ২০০১ সালে আবার দেশ পরিচালনার জন্য পারমিট বাছাইকালে খালেদা জিয়াকে পারমিট দিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু তিনি স্টিয়ারিং দিয়ে দেন তাঁর অপ্রাপ্তবয়স্ক পুত্র তারেক’কে। ব্যাস হেল্পারদের সাথে নিয়ে লাইসেন্সবিহীন চালক তারেক জিয়া এমন উল্টাপাল্টাভাবে মুখ ঢেকে দেশ চালাতে শুরু করেন যে, নিয়মিত দুর্ঘটনা ঘটতে থাকে। এর মধ্যে নতুন করে পারমিট রিনিউ করার সময় এলে তারেক জিয়ার বুদ্ধিতে চালক খালেদা জিয়া নানা টালবাহানা শুরু করেন।

একাধিক দুর্ঘটনার জন্য লাইসেন্স রিনিউ হবে না বুঝতে পেরে বিনা পারমিটে দেশ চালানো শুরু করেন খালেদা জিয়া। তাঁর নিজের লাইসেন্স দিয়ে ইয়াজ উদ্দিনকে পারমিট পেপার বুঝিয়ে দেন। কিন্তু এই চালাকি কাজে আসেনি। রাস্তায় সেনাবাহিনী নেমে পড়ে। খালেদা জিয়ার পারমিট ও লাইসেন্স সব বাতিল করে দেয়া হয়। খালেদা জিয়া ও তাঁর পুত্র তারেক জিয়ার নামে মামলা হয়। একাধিক হেল্পারের নামেও মামলা হয়। ১৯৯৬-২০০১ সালে দেশ চালনাকালে কিছু দুর্ঘটনার জন্য সেনা সহায়তায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেও মামলা হয়। তাঁর একাধিক হেল্পার সব দায় শেখ হাসিনার উপর চাপিয়ে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

সেনারা দেশবাসীকে বোঝাতে থাকে হাসিনা ও খালেদা দুই চালকের মধ্যেই আইন ভাঙার প্রবণতা রয়েছে। তবে খালেদা জিয়া নিজের জন্য পারমিট নিয়ে অপ্রাপ্ত বয়স্ক লাইসেন্সবিহীন পুত্রকে দিয়ে দেশ চালাতে গিয়ে চরম অন্যায় করেছেন। তাঁর পুত্রের বালখিল্যতায় যেথায় সেথায় পার্কিং, হাইস্প্রিড, যাত্রীদের সাথে দুর্ব্যাবহার, নিয়ম বহির্ভূত ভাড়া আদায়, অবৈধ মালামাল বহন, গাড়ির যন্ত্রাংশ বিক্রয় ইত্যাদি নানান অভিযোগের জন্য খালেদা জিয়া ও তাঁর পুত্রকে অভিযুক্ত করা হয়। এই অবস্থায় সেনা ব্যাবস্থাপনায় আবারো পারমিট দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হলে ২০০৮ সালে শেখ হাসিনাকে নতুন লাইসেন্সে নতুন পারমিট দেয়া হয়।

শেখ হাসিনা শুরুতে বেশ ভালোভাবেই দেশ ড্রাইভ করছিলেন। সামান্য কিছু দুর্ঘটনা ঘটলেও তা আলোচ্য ছিল না। কিন্তু ২০১৩ সালে এসে তিনি নতুন করে রোড পারমিট আবেদনের প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়ার মত হস্তক্ষেপ করলেন। তিনি আরেক কাঠি সরস হয়ে অন্য কাউকে পারমিটের জন্য আবেদনই করতে দিলেন না। ব্যাস একমাত্র আবেদনকারী হিসাবে আবারো পাঁচ বছরের জন্য দেশ পারমিট নিয়ে নিলেন।

তাঁর পারমিটকে সরাসরি অবৈধ বলা না গেলেও পারমিট লাভের প্রক্রিয়াটি অনৈতিক। যদিও তিনি লাইসেন্স রিনিউ করে দক্ষ হাতেই দেশ চালাচ্ছেন কিন্তু উনার সাথে থাকা অধিকাংশ হেল্পারই চোরের চোর। আজ বেঁচে দেয় তেল। কাল বেঁচে চাকা। যাত্রীদের মালামাল চুরি হতে থাকে। মালামাল তাঁদের দায়িত্বে থাকা অবস্থাতেও গায়েব হয়ে যায়। এছাড়া হেল্পারেরা একদিন ব্যাটারির পানি দিতে ভুলে যায়। এর পাশাপাশি হেড লাইট ফিউজ, হর্ন নষ্ট, এমনকি ব্রেকও খারাপ থাকা নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। বিনা হেড লাইটে, বিনা ব্রেকে বেচারীকে অনেক কষ্টে দেশ চালাতে হয়।

হেল্পারদের বেশি কিছু তিনি বলতেও পারেন না। অনৈতিক কাজ করলে অন্যকে আসলে নীতিজ্ঞান দেয়া যায় না। শেখ হাসিনা হেল্পারদের সবকিছু দেখেন ও বুঝেন। কিন্তু চুপ করে থাকেন। আসলে হেল্পারদের লজ্জা দিয়ে বা ধমক দিয়ে কিছু বললে, এরা বলে বসতে পারে… ড্রাইভার আপা, আপনার দেশ চালানোর পারমিটতো অবৈধ। কেমনে কি করছেন, সবইতো জানি। বিশেষ করে শাহজাহান হেলপারকে-তো কিছুই বলা যাবে না। হেসে হেসে বেয়াদবি করে লোকটা।

এ অবস্থায় বলতেই হয়- বিনা পারমিটে দেশ চললে, বিনা লাইসেন্সে গাড়িতো চলবেই।

লেখক : আব্দুল করিম কিম-সমন্বয়ক সংক্ষুব্ধ নাগরিক আন্দোলন, সিলেট।