সোনা চোরাচালানের নিরাপদ রুট সিলেট ওসমানী বিমানবন্দর

53

                                     ২ কেজি ৭শ ৮৪ গ্রাম ওজনের স্বর্ণের বারসহ নারী আটক

নুরুল হক শিপু
একটা সময় সোনা চোরাচালানের নিরাপদ যাত্রাপথ ছিলো চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও রাজধানীর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। প্রশাসনের কঠোর তৎপরতায় এই দুটি বিমানবন্দরে সোনা চোরাচালান কমলেও সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বেড়েই চলছে এই অপকর্ম। এই বিমানবন্দরকে সোনা চোরাচালানিরা নিরাপদ যাত্রাপথ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। নিরাপত্তা কর্মীদের ফাঁকি দিয়ে এই বন্দর ব্যবহার করে অবাধে মধ্যপ্রাচ্য থেকে অবৈধভাবে সোনা আনছেন। কী পরিমাণ সোনা অবৈধ পথে আসছে এর কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই বিমানবন্ধর কর্তৃপক্ষের কাছে। তবে শুল্ক গোয়েন্দা ও কাস্টমস্ কর্মকর্তাদের তৎপরতায় ধরা পড়ছে বড় বড় চালান। চলতি বছরেই চোরাকারবারিসহ তিনটি বড় চালান জব্দ করা হয়েছে।

সর্বশেষ গতকাল রোববার ইয়াসমিন সুলতানা নামের এক নারী যাত্রীকে সোনার বারসহ আটক করা হয়। বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে দুবাই থেকে আসা ফ্লাইট ফ্লাই দুবাইয়ের এফজেড ৫৯৫-এর ওই নারী যাত্রীকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আটক করে বিমানবন্দর কাস্টমস্। ওই নারীর জুতা ও পেটের ভেতর থেকে ২ কেজি ৭শ ৮৪ গ্রাম ওজনের স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। আটক সুলতানা ইয়াসমিন ঢাকার মিরপুর এলাকার মৃত মোশারফ হোসেনের মেয়ে। তিনি বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে দুবাই থেকে আসা ফ্লাই দুবাইয়ের একটি ফ্লাইটে ওসমানী বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। ওই সময় বিমানবন্দর থেকে তাকে নিতে আসা সাবু মিয়া নামের এক সহযোগিকেও আটক করা হয়েছে।

বিমানবন্দরের শুল্কগোয়েন্দারা জানান, হাঁটাচলার সময় সন্দেহ হলে সুলতানা ইয়াসমিনকে তল্লাশি চালানো হয়। প্রথমে তার হিল জুতার ভেতর থেকে ১৪ টি স্বর্ণের বার এবং পরে পেটের ভেতর থেকে ১০ পিছ স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত স্বর্ণের মূল্য প্রায় সোয়া কোটি টাকা বলে জানা গেছে।

এ ব্যাপারে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাইদুল ইসলাম বলেন, ‘আটক মহিলার জুতার সোলের ভেতরে কৌশলে ১৪টি সোনার বার লুকানো ছিল। এছাড়া তার পেটের মধ্যেও ১০ সোনার বার থাকায় বিশেষ কৌশলে তা বের করে আনা হয়। এ সময় তার সহযোগী সাবু মিয়াকে আটক করা হয়।’

বিমানবন্দর কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা আতিকুর রহমান বলেন, ‘আটককৃত মহিলাকে পরীক্ষা-নীরিক্ষা শেষে জুতা ও পেটের ভেতর থেকে সোনার বারগুলো উদ্ধার করা হয়। এ ব্যাপারে চোরাচালান প্রতিরোধ আইনে মামলা হবে।’

এর আগে গত ৮ জুন ৬ কেজি ৯শ’ গ্রাম ওজনের ৬০টি স্বর্ণের বারসহ একজনকে আটক করেন শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের সদস্যরা। ওইদিন সকাল ১০টা ৫ মিনিটে ওমানের মাসকট থেকে বাংলাদেশ বিমানের বিজি-২২২ নম্বর ফ্লাইটে করে সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরে আসেন মো. ইকবাল হোসেন (২৬) নামের ওই যুবক। তার পাশের সিটের নিচে রেখে ৬০টি স্বর্ণের বার আনেন তিনি। যার বাজারমূল্য ছিলো প্রায় চার কোটি টাকা।

এরও আগে গত ৩০ জুন আড়াই কেজি সোনাসহ সাদিকুর রহমান সামু নামে এক যুবককে আটক করা হয়। আটক সামু সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার প্রভাকরপুর গ্রামের জালাল উদ্দিন আবিরের ছেলে। দুবাই থেকে আসা বিজি-২৪৮ বিমানের ফ্লাইট থেকে ওই যাত্রীকে আটক করা হয়।

সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার পরিতোষ ঘোষ বলেন, ‘ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যাপক নজরদারী রয়েছে। বিশেষ করে শুল্ক গোয়েন্দারা, কাস্টমস্ পুলিশ এবং কাস্টমস্ কর্মকর্তাদের নজরদারীর কারণেই সোনার বারসহ আসামিদের আটক করা সম্ভব হচ্ছে। তিনি বলেন, সোনার বারসহ আটক নারী তার জুতা এবং পেটের ভেতরে করে বার নিয়ে এসেছিলেন। সুতরাং বুঝতে হবে বিমানবন্দরে প্রশাসনের নজরদারী পর্যাপ্ত ছিলো। তিনি বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে আছে, সোনা চোরাচালানিরা যাতে সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরকে নিরাপদ যাত্রাপথ হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে সেজন্য আরো কঠোর প্রদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে স্বর্ণ চোরাচালানিরা এখন নিরাপদ যাত্রাপথ হিসেবে নিয়েছে। এই বিষয়টি থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে কাস্টমন কর্তৃপক্ষকে আরো সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারী বাড়ানো এবং বিমানবন্দরে আরো অত্যাধুনিক মেসিন বসাতে হবে। যাতে কেউ অবৈধ পথে সোনা নিয়ে আসলেই সহজে তাকে সনাক্ত করা সম্ভব হয়।’