নুর চৌধুরীর ফাঁসিতেই কলঙ্কমুক্তি সিলেটের

66

জামিল আহমেদ
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। ইতিহাসের বেদনাবিধুর ও বিভীষিকাময় এক দিন। এইদিনে অতিপ্রত্যুষে ঘটেছিল ইতিহাসের কলঙ্কজনক ঘটনা। সেনাবাহিনীর কিছু উচ্ছৃঙ্খল ও বিপথগামী সৈনিকের হাতে সপরিবারে প্রাণ দিয়েছিলেন বাঙালির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সন্তান, স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

ইতিহাসের এই নৃশংস ঘটনায় কলঙ্ক পড়ে সিলেটবাসীর উপর। স্টেনগান দিয়ে জাতির জনকের বুক ঝাঁঝরা করে দেওয়া ঘাতক নূর চৌধুরীই কলঙ্কিত করেন পূণ্যভূমি সিলেটকে। ইতিহাসের এই নৃশংস খুনি নুর হোসেনের বাড়ি সিলেটের দক্ষিণ সুরমার লাউয়াই (উম্মরকবুল) গ্রামে। বঙ্গবন্ধু হত্যার দীর্ঘ ৪৩ বছর পরও আত্মস্বীকৃত এই খুনির বিচার না হওয়ায় কলঙ্ক মুক্ত হচ্ছেন না সিলেটবাসী। জাতির জনকের এই খুনিকে দেশে এনে ফাঁসি কার্যকর করে কলঙ্কমুক্তি চান সিলেটবাসী। রায় কার্যকরের মাধ্যমে সিলেটসহ সারা দেশ কলঙ্কজনক অধ্যায় থেকে মুক্তি পাবে বলে মনে করছেন তারা। এজন্য কানাডা সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে যত দ্রুত সম্ভব ঘাতক নূর চৌধুরীকে দেশে ফিরিয়ে এনে মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর করার দাবি তাদের।

সিলেটের দক্ষিণ সুরমার লাউয়াই গ্রামে নূর চৌধুরীর পরিবারের স্মৃতি হিসেবে রয়েছে কেবলমাত্র একটি ছোট্ট ঘর। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর ওই বাড়িতে নূর চৌধুরীর পরিবারের আর কারও পা পড়েনি। নূর চৌধুরীকে এলাকার নতুন প্রজন্মরা না দেখলেও তাকে জানেন ইতিহাসের এক ঘৃণিত খুনি হিসেবে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে বিচার শুরু করে আওয়ামী লীগ। এরও ১৪ বছর পর ২০১০ সালের জানুয়ারিতে ফাঁসি কার্যকর হয় পাঁচ ঘাতকের। উচ্চ আদালত ফাঁসির আদেশ দিয়েছিরলেন মোট ১২ ঘাতকের। দণ্ড কার্যকর হওয়া পাঁচ জন বাদে বাকিদের মধ্যে আজিজ পাশা মারা গেছেন বিদেশে। আর আবদুর রশিদ, মোসলেম উদ্দিন, শরীফুল হক ডালিম, রাশেদ চৌধুরী, নুর চৌধুরী এবং আবদুল মাজেদ পলাতক।

এদের মধ্যে নুর চৌধুরী রয়েছেন কানাডায়। এছাড়া রাশেদ চৌধুরীও কানাডায় অবস্থানের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। কিন্তু দেশটি মৃত্যুদণ্ডবিরোধী হওয়ায় তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। আর এই বিষয়টি নিয়েই তাকে ফেরানোর জটিলতা রয়েছে।

এদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অন্যতম খুনি নূর চৌধুরীর বিষয়ে তথ্য দিতে কানাডা সরকারের সঙ্গে আইনি লড়াইয়ে নেমেছে বাংলাদেশ। নূর চৌধুরী কীভাবে কানাডায় বসবাস করছে (লিগ্যাল স্ট্যাটাস) সম্পর্কে তথ্য দিতে কানাডা সরকারকে বাধ্য করতে ফেডারেল কোর্ট অব জাস্টিসের আদালতে আবেদন করেছে বাংলাদেশ সরকার।

গত ৭ জুন দায়ের করা এই আবেদনে কানাডার অ্যাটর্নি জেনারেল (আইনমন্ত্রী) এবং নূর চৌধুরীকে বিবাদী করা হয়েছে। সম্প্রতি কানাডা থেকে প্রকাশিত বাংলা অনলাইন পত্রিকা নতুন দেশ এই খবর প্রকাশ করেছে।

আদালতে করা আবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর মধ্যে নূর চৌধুরীকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আলোচনা হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালের এপ্রিলে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে এ নিয়ে বৈঠক হয়। আলোচনায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত কাউকে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকারের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে কানাডা।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কানাডা সফরেও নূর চৌধুরীকে ফিরিয়ে দেয়ার বিষয়ে ট্রুডোর সঙ্গে কথা বলেন তিনি। আর ট্রুডো জানিয়েছেন, তার দেশ এ বিষয়ে একটি উপায় খুঁজছে।

তবে নূর চৌধুরীর বর্তমান আইনি স্ট্যাটাস বিশেষ করে তাকে প্রি-রিমুভ্যাল রিস্ক এসেসমেন্ট স্ট্যাটাস’ দেওয়া হয়েছিলো কী না- সেই তথ্য জানাতে রাজি হয়নি কানাডা আদালত।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে অটোয়ায় বাংলাদেশের হাই কমিশনার মিজানুর রহমান ঘাতক নূর চৌধুরীর ‘প্রি রিমুভ্যাল রিস্ক এসেসমেন্ট’ এর হালনাগাদ তথ্য জানতে চেয়ে ইমিগ্রেশন মন্ত্রী আহমেদ হোসেনের কাছে চিঠি লিখেন। কিন্তু মন্ত্রী দুই কারণে সেই তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। ইমিগ্রেশন মন্ত্রী বলেন, নূর চৌধুরী তার গোপনীয়তা পেতে পারেন এবং কানাডা বাংলাদেশের মধ্যে কোনো ‘তথ্য বিনিময় চুক্তি’ নেই।

এরপর হাইকমিশনার তথ্য বিনিময় চুক্তি সই করতে আলোচনার প্রস্তাব দিলে কানাডা সরকার সে প্রস্তাব প্রত্যাখান করে। এরপরই বাংলাদেশ বিষয়টি আদালতে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আবেদনে কানাডার ইমিগ্রেশন মন্ত্রীর সিদ্ধান্তকে অযৌক্তিক ঘোষণার আবেদন জানিয়েছে বাংলাদেশ। বলেছে, নূর চৌধুরীর সম্পর্কিত তথ্য প্রকাশের ব্যাপক জনস্বার্থ সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি কানাডার মন্ত্রী অনুধাবন করতে পারছেন না।

আবেদনে বলা হয়, নুর চৌধুরী বাংলাদেশের জনগণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অপরাধে দণ্ডিত এবং বাংলাদেশের নীতিমালা পর্যালোচনা ও কানাডার সঙ্গে আলোচনার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়নের জন্য এই তথ্য জরুরি।

সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এটিএমএ হাসান জেবুল বলেন, সিলেটবাসীকে এ অভিশাপ থেকে মুক্তি দিতে ইতিহাসের নৃশংস ঘাতক নুর চৌধুরীকে দেশে এনে ফাঁসি কার্যকর করতে হবে। এজন্য কানাডা সরকারের সাথে সব ধরণের আইনী লড়াই করা উচিত। আওয়ামী লীগ সরকারকে এ বিষয়টিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তিনি।

সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদ বলেন, যতদিন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু হত্যার পলাতক ৬ ঘাতকের ফাঁসি কার্যকর হবে না; ততোদিন পর্যন্ত বাঙালি জাতি কলঙ্কমুক্ত হবে না। যতদ্রুত সম্ভব তাদের অবস্থান সনাক্ত করে দেশে এনে তাদের ফাঁসি কার্যকর করতে হবে। এছাড়া ঘাতক নুর চৌধুরীকে দেশে ফিরিয়ে আনতে কানাডার সাথে আইনী প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে বর্তমান সরকারকে আহবান জানান। তিনি বলেন, যতদিন পর্যন্ত নুর চৌধুরীর ফাঁসি কার্যকর না হবে; ততোদিন পর্যন্ত সিলেটবাসী কলঙ্কমুক্ত হবে না।