রক্তাক্ত ২১ আগস্ট : এখনো স্মৃতিগুলো তাড়া করে জগদীশ-আজাদকে

103

নুরুল হক শিপু
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। বাংলাদেশের ইতিহাসে ছিলো বিভীষিকাময় একটি দিন। ওইদিন রাজধানীতে ছিলো দেশে গ্রেনেড ও বোমা হামলার প্রতিবাদে আওয়ামী লীগের এক জনসভা। যে সভায় একেরপর এক গ্রেনেড হামলা চালানো হয়েছিলো। এতে ২৪ জন নিহত হন এবং তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাসহ প্রায় ৩০০ লোক আহত হয়েছিলেন। ওইদিন রক্তাক্ত ছিলো বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ের সামন। ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন সিলেট জেলা যুবলীগের তৎকালীন সভাপতি জগদীশ চন্দ্র দাশ এবং সাধারণ সম্পাদক আজাদুর রহমান আজাদ। তাদের মুখ থেকে জানা গেছে রক্তাক্ত দিনটির বর্ননা। দুজনই বলেছেন, দিনটির কথা মনে হলে এখনো আঁতকে ওঠেন তারা। রক্তাক্ত দিনটির স্মৃতি এখনো তাড়া করে তাদের। আওয়ামী লীগ সূত্র জানায়, ‘২১ আগস্ট অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের এই প্রতিবাদ সভার নেপথ্যে ছিলো ৭ আগস্ট সিলেটে গ্রেনেড হামলায় ঘটনা।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য, সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান বলেন, ৭ আগস্ট ও ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা একই সূত্রে গাঁথা। তিনি বলেন, ২০০৪ সালে ৭ আগস্ট নগরীর তালতলাস্থ গুলশান সেন্টারে সিলেট নগর আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির এক জরুরি সভা শেষ হওয়া মাত্র গ্রেনেড হামলায় নিহত হন সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক মো. ইব্রাহিম। ওই ঘটনায় আহত হন আরো অনেকেই। এটি ছিল জোট সরকারের আমলের সিলেটের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায়। এ ঘটনার পর আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা সিলেট আসেন তিনি আহতদের চিকিৎসার খবর নেন এবং নিহত ইব্রাহিমের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।

সূত্র জানায়, ওই ঘটনার পর সিলেটে জঙ্গিদের গ্রেনেড হামলা এবং গোপালগঞ্জে পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগ দলীয় কার্যালয়ের সামনে এক সমাবেশের আয়োজন করা হয়। ওই প্রতিবাদ সভায় সিলেট জেলা যুবলীগের তৎকালীন সভাপতি জগদীশ চন্দ্র দাশ এবং সাধারণ সম্পাদক আজাদুর রহমান আজাদ উপস্থিত হন। তারা ছাড়া সিলেট থেকে সভায় অন্য কোনো নেতা যাননি।

জগদীশ চন্দ্র দাশ ও আজাদুর রহমান আজাদ জানান, সমাবেশের প্রধান অতিথি শেখ হাসিনা অনুষ্ঠানস্থলে ৪টার পরে আসেন। একটি ট্রাকের ওপর সুন্দর করে মঞ্চ সাজানো হয়েছে। আমরা দুপুর ১২টার দিকে সভাস্থলে উপস্থিত যাই। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী যখন আসেন তখন আমরা কেন্দ্রীয় যুবলীগের সাথে মিছিল করে নেত্রীকে অভ্যর্থনা জানাই।

তারা বলেন, নেত্রী ২০ মিনিট বক্তৃতা রাখেন। ওই সময় সিলেটে ৭ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় নিহত ইব্রাহিমের কথা বলেন এবং আহত আওয়ামী লীগ নেতা মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ ও বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের কথা বলেন। ওই সময় জগদীশ মিসবাহ উদ্দিন সিরাজকে ফোন করে বলেন নেত্রী বক্তব্যে আপনাদের নাম বলছেন শোনেন। একটু পরেই বিকট শব্দে গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটে। মঞ্চ লক্ষ্য করে একেরপর এক গ্রেনেড হামলা করা হয়। মাত্র দেড় মিনিটের মধ্যে বিস্ফোরিত হয় অনেক শক্তিশালী গ্রেনেড। আওয়ামী লীগ নেতা ঢাকার সাবেক মেয়র মো. হানিফ ওই সময় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে ধাক্কা দিয়ে ট্রাকে ফেলে দেন সাথে সাথে নেত্রী বিন্দু মানব প্রাচীর করে নেত্রীকে রক্ষা করেন। ওই সময় জগদীশ ও আজাদ মঞ্চ থেকে ২০-২৫ ফুট দূরে ছিলেন। এতে ঘটনাস্থলেই ১২ জন এবং পরে হাসপাতালে আরও ১২ জন নিহত হন। এই হামলায় নিহতদের মধ্যে আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নারী নেত্রী মিসেস আইভী রহমান অন্যতম, যিনি বাংলাদেশের ১৯তম রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী। ওই গ্রেনেড হামলায় নিহত অন্যরা হলেন মোসতাক আহম্মদ সেন্টু, শেখ হাসিনার দেহরক্ষী ল্যান্স করপোরাল (অব.) মাহবুবুর রহমান, রফিকুল ইসলাম, হাসিনা মমতাজ রীনা, রিজিয়া বেগম, রতন শিকদার, মোহাম্মদ হানিফ ওরফে মুক্তিযোদ্ধা হানিফ, লিটন মুন্সি, আবদুল কুদ্দুছ পাটোয়ারী, বিল্লাল হোসেন, আব্বাছ উদ্দিন শিকদার, আতিক সরকার, মামুন মৃধা, নাসির উদ্দিন সর্দার, আবুল কাসেম, আবুল কালাম আজাদ, আবদুর রহিম, আমিনুল ইসলাম, জাহেদ আলী, মোতালেব ও সুফিয়া বেগম।

গুরুতর আহত প্রয়াত রাষ্ট্রপতি (তৎকালীন প্রেসিডিয়াম সদস্য) জিল্লুর রহমান, প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা আবদুর রাজ্জাক, ঢাকার সাবেক মেয়র (প্রয়াত) মো. হানিফ, আমির হোসেন আমু, প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, ওবায়দুল কাদের, অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, ড. মহিউদ্দীন খান আলমগীর, কাজী জাফর উল্লাহ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, নজরুল ইসলাম বাবু, আওলাদ হোসেন, সাঈদ খোকন, মাহবুবা আখতার, অ্যাডভোকেট উম্মে রাজিয়া কাজল, নাসিমা ফেরদৌস, শাহিদা তারেক দীপ্তি, রাশেদা আখতার রুমা, হামিদা খানম মনি, ইঞ্জিনিয়ার সেলিম, রুমা ইসলাম, কাজী মোয়াজ্জেম হোসেইন, মামুন মল্লিকসহ তিন শতাধিক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষ।

জগদীশ চন্দ্র দাশ ও আজাদুর রহমান আজাদ আরো জানান, যখন গ্রেনেড হামলা হয় তখন নেত্রীকে অনেক কষ্ট করে গাড়ি পর্যন্ত পৌছানো হয়। নেত্রী যথন গাড়িতে ওঠেন তখন তাঁর গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছুড়া হয়। আমরা নেত্রীর গাড়ি এগিয়ে দেই। নেত্রীর গাড়ি চাকায় গুলি করায় চাকার বাতাস চলে যায়। নেত্রীর সাহসি চালক গাড়ির রিংয়ের উপর ভরসা রেখে গাড়ি টানতে থাকেন। আমরা নেত্রীকে এগিয়ে দিয়ে ফিরে দেখি লাশ আর লাশ পড়ে আছে। রক্তে রঞ্জিত বঙ্গবন্ধু এভিনিউ। পুলিশ এসে লাছিচার্জ করে। আহত হই আমরা দুজনসহ আরো অনেকেই। এই অবস্থায় আহতদের ঠেলাগাড়ি করে আমরা ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাই। সেখানে দেখতে পাই কোনো চিকিৎসক নেই। শুধু ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা। এক পর্যায়ে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের চিকিৎসকেরা এবং কর্মীরা এসে রোগীদের সেবা দেন। জগদীশ ও আজাদ জানান বলেন, হাসপাতালে শতশত মুমুর্ষ আহতের রক্তের প্রয়োজন হলে তারা দুজনে প্রথমেই রক্ত দেন। তাদের সাথে আরো অনেকেই রক্ত দিতে এগিয়ে আসেন। আমরা রক্ত দেওয়া অবস্থায় মুন্নীসাহা আমাদের সাক্ষাৎকার নেন। এটি এটিএনে প্রকাশ করা হয়।

এরপর তারা সুরঞ্জিত সেন গুপ্তসহ অন্য আহতদের দেখতে যান। দুদিন পর তারা সিলেট ফিরে আসেন। তারা বলেন, আজও ২১ আগস্টের কথা মনে হলে গা শিহরে ওঠে। মনে পরে যায় একাধিক লাশ আর নিজ চোখে দেখা রক্তের বন্যার কথা। ইতিহাস বিএনপি-জামায়াতের এই কলঙ্কের রচনার কথা কখনোই ভুলবে না।

উল্লেখ্য, এ ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক জিয়া, চারদলীয় জোট সরকারের সাবেক উপমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা আব্দুস সালাম পিন্টু, হরকাতুল জিহাদ প্রধান মুফতি হান্নান ও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ২২ জনকে আসামি করা হয়।