কোরবানীর পশুর বর্জ্যে কোটি টাকার হাতছানি

36

নুরুল হক শিপু
কোরবানীর পশুর বর্জ্য অপসারণে প্রতিবছরই সিলেটে নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। কিন্তু সম্ভাবনাময় কোটি কোটি টাকার বর্জ্য সঠিক ব্যবস্থাপনার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় না। যদি কোরবানীর পশুর বর্জ্য সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করে সংরক্ষণ করা যেতে তাহলে তা বিদেশে রপ্তানি করে শুধুমাত্র সিলেট থেকে কোটি কোটি টাকা আয় করা সম্ভব হতো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কোরবানীর পশুর বর্জ্যে কোটি কোটি টাকার হাতছানি থাকলেও পরিকল্পনা এবং সঠিক উদ্যোগের অভাবে তা ব্যাহত হচ্ছে।

জানা গেছে, সিলেটসহ পুরো দেশে সারা বছরে যে পরিমাণ পশু জবাই করা হয়, এক কোরবানী ঈদেই তার থেকে কয়েকগুন বেশি পশু জবাই করা হয়ে থাকে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত কোরবানীর ঈদে এক কোটি পাঁচ লাখ পশু কোরবানী করা হয়েছিল।

সিলেট জেলায় প্রায় ৮৫ হাজার পশু কোরবানী দেয়া হয়। শুধুমাত্র কোরবানীকৃত পশুর চামড়াই সিলেটের ব্যবসায়ীরা একমাত্র মূল্যবান রপ্তানি পণ্য হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। কিন্তু কোরবানীকৃত গরু, মহিষ, উট, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা হাড়, শিং, কান, নাড়িভুঁড়ি, মূত্রনালি, যৌনাঙ্গ, লোম, চর্বি, দাঁত, পায়ের খুর ও জমাট বাঁধা রক্ত রপ্তানিযোগ্য মূল্যবান হলেও তা প্রক্রিয়াজাত করে সংরক্ষণ করা হচ্ছে না। এগুলো সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করলে ভারত, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, চীন, জাপানসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা সম্ভব হতো।

বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির প্রদত্ত তথ্যে জানা গেছে, গতবছর দেশে দেড় থেকে দুই হাজার মণ বর্জ্য রপ্তানি করে ১৭০ কোটি টাকারও বেশি আয় করা সম্ভব হয়েছে। এ বছর তা বৃদ্ধি পেয়ে ২শ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এমনটি হলে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এটি একটি লাভজনক রপ্তানি পণ্য হতে পারে ভবিষ্যতের জন্য। কিন্তু সিলেটে পশুর মূল্যবান বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে নানা প্রচারণা চালালেও এসব বর্জ্য সঠিক প্রক্রিয়ায় প্রক্রিয়াজাতকরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে সিলেটসহ পুরো বিভাগে সম্ভাবনাময় কোরবানীকৃত প্রায় ৪ লাখেরও অধিক পশুর মূল্যবান বর্জ্য সংরক্ষণ না করে ফেলে দেওয়া হচ্ছে।

জানা গেছে, সঠিকভাবে কোরবানীর পশুর বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করলে প্রতি কেজি বর্জ্যে প্রায় ২৫ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সিলেটে যদি বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করণের জন্য যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে এ বিষয়ে দক্ষ জনবল গড়ে তোলা যায় তবে এ খাতের সম্ভাবনা দিনে দিনে বাড়বে। এর মাধ্যমে এক ঢিলে কয়েক পাখি মারার মতো অবস্থা সৃষ্টি করা যেতে পারে। একদিকে রপ্তানি পণ্যের তালিকায় আরো কিছু পণ্য যুক্ত হবে, অপরদিকে এসব বর্জ্য পরিবেশের ক্ষতির কারণ হবে না। এছাড়াও কিছু বেকার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি বিপুল পরিমাণের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হবে।

এ ব্যাপারে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘পুরো বছর পশুর বর্জ্য বিক্রি হয়। যেসকল কসাইরা মাংস বিক্রি করেন তারা সাধারণত বর্জ্যগুলো বিক্রি করেন। আর কোরবানীর সময় যে-সকল বর্জ্য পারাইচকে ফেলে দেওয়া হয়-তা টোকাইরা খোঁজে এনে বিক্রি করে। এখানো বিষয় হচ্ছে, এতে করে টোকাই বা কসাইরা পশুর বর্জ্যে পর্যাপ্ত মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তিনি বলেন, অপরদিকে সকল বর্জ্য তারা বিক্রি করতে পারছেন না। সেক্ষেত্রে বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ সিলেটে শুরু করা জরুরি। সঠিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শুরু করলে সিলেটে অর্থনৈতিক দিক আরো গতিশীল হবে।’

সিলেট চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি সালাউদ্দিন আলী আহমদ বলেন, ‘কোরবানীর পশুর বর্জ্য অতৗন্ত মূল্যবান। সঠিকভাবে তা প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। তিনি বলেন, সিলেটে কোরবানীর বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করতে হলে প্রথমেই সিলেট চেম্বার অব কমার্সকে উদ্যোগ নিতে হবে। তারা চাইলে এ ব্যাপারে একটি সঠিক জনগোষ্ঠী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সৃষ্টি করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। তিনি বলেন, চেম্বার কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে গুরুত্ব দেয়ার দাবি জানাচ্ছি।’