ইন্টারপোলের রেড অ্যালার্টে সিলেটের দুই ‘চৌধুরী’

424

নুরুল হক শিপু
এসএইচএমবি নূর চৌধুরী ও আবদুল হারিস চৌধুরী সিলেটের আলোচিত দুই নাম। বাংলাদেশের ইতিহাসের কলঙ্কিত দুই ঘটনার সাথে জড়িয়ে আছে এ দুটি নাম। দক্ষিণ সুরমার নূর চৌধুরীর নাম জড়িয়ে আছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যাকারী হিসেবে আর কানাইঘাটের হারিছ চৌধুরীর নাম জড়িয়ে রয়েছে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যা প্রচেষ্টা অর্থাৎ ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলায়। সারাদেশে ব্যাপক সমালোচিত পলাতক এই দুই ‘চৌধুরী’ নাম ঝুলছে ইন্টারপোলের রেড অ্যালার্টে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলার ইতিহাসের বেদনাবিধুর ও বিভীষিকাময় এক দিন ছিলো। ওইদিন ঘটেছিল ইতিহাসের কলঙ্কজনক ঘটনা। সেনাবাহিনীর কিছু উচ্ছৃঙ্খল ও বিপথগামী সৈনিকের হাতে সপরিবারে প্রাণ দিয়েছিলেন বাঙালির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সন্তান, স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ইতিহাসের এই নৃশংস ঘটনায় কলঙ্কের দায় পড়ে সিলেটবাসীর উপর। স্টেনগান দিয়ে জাতির পিতার বুক ঝাঁঝরা করে দেওয়া ঘাতক নূর চৌধুরীই কলঙ্কিত করেন পূণ্যভূমি সিলেটকে। এই নৃশংস খুনি নুর হোসেনের বাড়ি দক্ষিণ সুরমা উপজেলার লাউয়াইস্থ উম্মরকবুল গ্রামে। কানাডায় থাকা নূর হোসেনকে নানা কারণেই দেশে ফিরিয়ে আনা যাচ্ছে না। তবে সরকার তাঁকে ফিরিয়ে আনতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। লাউয়াই গ্রামে নূর চৌধুরীর পরিবারের স্মৃতি হিসেবে রয়েছে কেবলমাত্র একটি ছোট্ট ঘর। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর ওই বাড়িতে নূর চৌধুরীর পরিবারের আর কারও পা পড়েনি। নূর চৌধুরীকে এলাকার নতুন প্রজন্মরা না দেখলেও তাকে জানেন ইতিহাসের এক ঘৃণিত খুনি হিসেবে। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে বিচার শুরু করে আওয়ামী লীগ। এরও ১৪ বছর পর ২০১০ সালের জানুয়ারিতে ফাঁসি কার্যকর হয় পাঁচ ঘাতকের। উচ্চ আদালত ফাঁসির আদেশ দিয়েছিলেন মোট ১২ ঘাতকের। দন্ড কার্যকর হওয়া পাঁচ জন বাদে বাকিদের মধ্যে আজিজ পাশা বিদেশে মারা গেছেন। আর আবদুর রশিদ, মোসলেম উদ্দিন, শরীফুল হক ডালিম, রাশেদ চৌধুরী, নুর চৌধুরী এবং আবদুল মাজেদ এখনো পলাতক।

অপরজন আবদুল হারিস চৌধুরী। তার মাথার ওপর ঝুলছে দুদকের মামলা। সাবেক অর্থমন্ত্রী কিবরিয়া হত্যা মামলা এবং আলোচিত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার খড়গসহ অনেক মামলা। সেনাসমর্থিত সরকার দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ঝটিকা অভিযান শুরু করলে আত্মগোপনে চলে যান হারিছ চৌধুরী। প্রথমে কিছুদিন হবিগঞ্জে আত্মগোপনে ছিলেন। এরপর আসেন সিলেটে। সে সময় দুদকের শীর্ষ দুর্নীতিবাজদের তালিকায় ওঠে আসে তার নাম। তখনই দেশ ছেড়ে পালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ২০০৭ সালে ২৯ জানুয়ারি সিলেটের জকিগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে নানারবাড়ি ভারতের করিমগঞ্জে পাড়ি জমান হারিছ চৌধুরী। এর কয়েকদিন পর তার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, বস্তায় করে টাকা উত্তরকূল সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাঠানো হয়। ভারত থেকে তিনি যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। এরপর সেখান থেকে ইরানে তার ভাই আবদুল মুকিত চৌধুরীর কাছে যান হারিছ। আবদুল মুকিত সেখানকার একটি সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত। এরপর মালয়েশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র হয়ে আবার ফিরে যান যুক্তরাজ্যে। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বর্তমানে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে অবস্থান করছেন ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত হারিছ চৌধুরী। শারীরিক অবস্থান অবনতি ঘটায় ও দেশের পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় পরিবারের সদস্যরাও চান না তিনি দেশে ফিরে আসুন।

সর্বশেষ ওয়ান-ইলেভেনের আগে স্ত্রী-সন্তানরা দেশে এসেছিলেন। এরপর আর তারাও দেশে আসেননি। তবে দেশে আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে এখন স্ত্রী-সন্তানরাই যোগাযোগ রাখেন। ঈদ ও বিভিন্ন ধর্মীয় দিবসে বাবার পক্ষ থেকে সিলেটের গ্রামের বাড়িতে শিরনি, মিলাদ ও কোরআন খতম ও দানখয়রাত করে হারিছ চৌধুরীর সন্তানরা। এমন তথ্য পাওয়া গেছে হারিছ চৌধুরীর কয়েকজন আত্মীয়স্বজন ও রাজনৈতিক অনুসারীর কাছ থেকে।

২০১০ সালের ঈদুল আজহার পর দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন হারিছ চৌধুরী। আত্মসমর্পণের জন্য দেশের শীর্ষ এক আইনজীবীর সঙ্গে তিনি যোগাযোগও করেন। ওই আইনজীবী তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সব মামলায় জামিন হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলেন। এরপর হারিছ চৌধুরীর সম্মতিতে ওই আইনজীবী সব কাগজপত্র প্রস্তুত করেন। কিন্তু ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার সম্পূরক চার্জশিটে তাকে আসামি করায় হারিছ চৌধুরী দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। গত নির্বাচনের আগে সিলেট-১ আসনে হারিছ চৌধুরীকে প্রার্থী করার দাবি জানিয়ে পোস্টারিংও করা হয়। ইচ্ছা ছিল নির্বাচন হলে দেশে এসে প্রার্থী হবেন। তবে সে নির্বাচনে বিএনপি অংশই নেয়নি। ফলে দেশে আসাও হয়নি হারিছ চৌধুরীর।

হারিছ চৌধুরীর ঘনিষ্ঠজনরা জানান, আগেও একাধিকবার দেশে ফেরার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। কিন্তু দেশ থেকে গ্রিন সিগন্যাল না পাওয়া, নতুন নতুন মামলায় জড়ানো ও পরিবারের সদস্যদের আপত্তির কারণে আর দেশে ফিরেননি হারিছ চৌধুরী।

উল্লেখ্য, ইন্টারপোলের রেড অ্যালার্টে ঝুলছে ৫৯ বাংলাদেশির নাম। তাদের কেউ আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডন, কেউ গডফাদার। কেউ মানবতাবিরোধী অপরাধী। আবার কেউ চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার আসামি। এ তালিকায় রয়েছে বঙ্গবন্ধুর খুনিরাও। বছরের পর বছর তারা গা-ঢাকা দিয়ে আছে বিভিন্ন দেশে। তাদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনে শাস্তি কার্যকর করতেই বাংলাদেশ থেকে ইন্টারপোলের সাহায্য চাওয়া হয়েছে। ইন্টারপোল তাদের ওয়েবসাইটে এসব অপরাধীর নাম ও ছবি প্রকাশ করেছে। প্রকাশিত তালিকায় রয়েছেন সিলেট দুই চৌধুরী এসএইচএমবি নূর চৌধুরী ও আবদুল হারিস চৌধুরী।

ইন্টারপোলের রেড নোটিশে অন্য যাদের নাম রয়েছে তারা হলেন, রফিকুল ইসলাম, প্রকাশ কুমার বিশ্বাস, আমিনুর রসুল, হারিস আহমেদ, জাফর আহমেদ, আবদুল জব্বার, নবী হোসাইন, জিসান, তৌফিক আলম, মিন্টু, শাহাদাত হোসাইন, আতাউর রহমান, নাসির উদ্দিন রতন, চাঁন মিয়া, প্রশান্ত সরদার, সুলতান সাজিদ, হারুন শেখ, মনোতোষ বসাক, আমিনুর রহমান, গোলাম ফারুক অভি, রাতুল আহমেদ বাবু, হাসন আলী ওরফে সৈয়দ মো. হাছন, সৈয়দ মোহাম্মদ হোসাইন ওরফে হোসেন, জাহিদ হোসেন খোকন, আবদুল জব্বার, আহমেদ কবির ওরফে সুরত আলম, রফিকুল ইসলাম, সাজ্জাদ হোসেন খান, হাসেম কিসমত, শরিফুল হক ডালিম, মোল্লা মাসুদ, মো. ইউসুফ, মো. নাঈম খান ইকরাম, মকবুল হোসাইন, সালাহউদ্দিন মিন্টু, খন্দকার আবদুর রশিদ, মঈন উদ্দিন চৌধুরী, মাওলানা মো. তাজউদ্দিন মিয়া, আশরাফুজ্জামান খান, খোরশেদ আলম, মোহাম্মদ চৌধুরী আতাউর রহমান, ত্রিমতি সুব্রত বাইন, আবুল কালাম আজাদ, সৈয়দ আমান উল্লাহ শফিক, নুরুল দিপু, আহমেদ মঞ্জু, চন্দন কুমার রায়, এএম রাশেদ চৌধুরী, মোসলেহ উদ্দিন খান, নাজমুল আনসার, আবদুল মাজেদ, আহমেদ শারফুল হোসাইন, কালা জাহাঙ্গীর ওরফে ফেরদৌস, খন্দকার তানভীর ইসলাম জয়, শামীম আহমেদ।