‘অ্যাডহক কমিটি’তে বন্দি সিলেট শিল্পকলা একাডেমি

198

পদত্যাগ যদি সমাধান হতো তবে তাই করতাম-ফাত্তাহ

নুরুল হক শিপু
সিলেট শিল্পকলা একাডেমির অ্যাডহক কমিটি নিয়ে ক্ষুব্ধ সংস্কৃতিকর্মীরা। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম চলছে ‘অবৈধ’ অ্যাডহক কমিটির মাধ্যমে। আর এই অ্যাডহক কমিটি পার করেছে নয়টি বছর। দীর্ঘ ২২ বছরেও হয়নি শিল্পকলা একাডেমির কার্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচন। সর্বশেষ ৯ বছর আগে ২০০৯ সালে প্রস্তাব করা হয়েছিল অ্যাডহক কমিটি। কিন্তু সেই কমিটিও অনুমোদন দেওয়া হয়নি। সে হিসেবে অনুমোদনহীন অ্যাডহক কমিটি ৯ বছর ধরে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলে দাবি সংস্কৃতিকর্মীদের।

অ্যাডহক কমিটির মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা এবং দীর্ঘ ২২ বছর ধরে একাডেমির কার্যকরী কমিটির নির্বাচন না হওয়ায় সংস্কৃতিকর্মীদের মাঝে বিরাজ করছে চরম ক্ষোভ আর অসন্তোষ। তাদের দাবি শিল্পকলা একাডেমির অচলাবস্থার জন্য এই অ্যাডহক কমিটিই দায়ি।

সূত্র মতে, সিলেট শিল্পকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার পর ১৯৮৯ সালে কার্যকরী কমিটির প্রথম নির্বাচন হয়। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়। কিছু দিন পরই ওই কমিটি পুনর্গঠন করা হয়। তখন থেকে বিগত ২২ ধরে অ্যাডহক কমিটির মাধ্যমে কার্যক্রম চলছে। সর্বশেষ ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে ফের ৫ সদস্যের অ্যাডহক কমিটির নাম প্রস্তাব করা হয়।

কমিটিতে জেলা প্রশাসককে আহ্বায়ক, সিলেট জেলা কালচারাল অফিসারকে সদস্য সচিব এবং মদনমোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষ ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট সিলেট জেলা কমিটির সভাপতি গৌতম চক্রবর্তী এবং জগন্নাথপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মুক্তাদির আহমদ মুক্তার নাম প্রস্তাব করা হয়। এর কিছুদিন পর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কামাল লোহানী দায়িত্বে থাকতে সিলেটের সংস্কৃতিকর্মীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ওই অ্যাডহক কমিটি স্থগিত করা হয়। পরবর্তীসময়ে কামাল লোহানী অবসরে গেলে পূনরায় ওই তিন সদস্যেকে রেখেই কমিটি বলবৎ রাখা হয়। তবে কীভাবে এই কমিটি পূণরায় বলবৎ হলো এর কোনো রহস্য সংস্কৃতিকর্মীদের জানা নেই। তবে নয় বছর আগের এই অ্যাডহক কমিটির পূর্বের কমিটি তিন মাস দায়িত্ব পালন করছিল।

অভিযোগ রয়েছে, সিলেট জেলা শিল্পকলা একাডেমির নির্বাচিত কার্যকরী কমিটি না থাকার কারণে জেলা সাংস্কৃতিক কর্মকর্তারা অনেকটা স্বৈরাচারী ভূমিকা পালন করেছেন অতীত থেকেই। সেই আব্দুল হান্নানের আমল থেকে অনেকটাই এই কায়দায় পরিচালিত হচ্ছে সিলেট শিল্পকলা একাডেমি। আর বর্তমান জেলা কালচারাল অফিসার অসিত বরণ দাসগুপ্তের প্রতি ক্ষোভ সংস্কৃতিকর্মীদের। অ্যাডহক কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে বিভিন্ন অনুষ্ঠান তিনি পরিচালনার কথা থাকলেও তিনি সভাপতিত্ব করে সভা চালানোর অভিযোগ রয়েছে। সেক্ষেত্রে তিনি জেলা প্রশাসককে সভাপতির চেয়ারে না বসিয়ে তাঁকে করেন প্রধান অতিথি এবং নিজে সভাপতিত্ব করেন বলে দাবি নাট্যকর্মীদের।

অপরদিকে সংস্কৃতিকর্মীদের একেক সময় একেক গ্রুপের পকেটে ছিল একাডেমি। এ নিয়ে সংস্কৃতিকর্মীদের মাঝে এক ধরনের ক্ষোভ তৈরি হয়। যার ফলে কিছুদিন শিল্পকলা একাডেমি ইস্যুতে উত্তপ্ত ছিল সিলেটের সাংস্কৃতিক অঙ্গন।

নাট্যকর্মীদের অভিযোগ, ২০০৯ সালে প্রস্তাবিত ফাত্তাহ-গৌতম-মুক্তাকে নিয়ে গঠিত অ্যাডহক কমিটি দীর্ঘ ৯ বছরেও অনুমোদন দেয়নি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। আর সিলেটে সংস্কৃতি অঙ্গনে আওয়ামী বলয়, বাম বলয়, মধ্যপন্থি বলয়, বিএনপি-জামাত বলয়ের দ্বন্দ্ব থাকায় একদিকে সিলেটের শিল্পকলা একাডেমি শক্তিশালী হতে পারছে না; অপরদিকে ২২ বছর অতিবাহিত হলেও শিল্পকলা একাডেমির কার্যকরী কমিটির নির্বাচন হচ্ছে না। এ সব কারণে সরকারি এই প্রতিষ্ঠানের যেমন অগ্রযাত্রা ঘটছে না; তেমনি সংস্কৃতি চর্চার বিকাশে পিছিয়ে পড়ছে সিলেট।

অ্যাডহক কমিটিতে থাকা মদনমোহন কলেজে অধ্যক্ষ আবুল ফতেহ ফাত্তাহ বলেন, ‘আমি পদত্যাগ করলে কোনো সমাধান হলে অবশ্যই পদত্যাগ করতাম। কিন্ত এতে কোনো সমাধান দেখছি না। তিনি বলেন, সঠিক প্রক্রিয়ায় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নির্বাচন আমিও চাই।’

শিল্পকলা একাডেমির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক আল আজাদ বলেন, শিল্পকলা একাডেমিতে দুই দশক ধরে কোনো নির্বাচন হয়নি। নির্বাচিত কার্যনির্বাহী কমিটি অবশ্যই প্রয়োজন। নির্বাচনী প্রক্রিয়া অব্যাহত না থাকার কারণেই শিল্পকলা একাডেমি নিয়ে নানা জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে।’

সম্মিলিত নাট্য পরিষদের সভাপতি মিসফাক আহমদ মিশু বলেন, ‘৯ বছরের পুরোনো অ্যাডহক কমিটি বাতিল করে নির্বাচিত কমিটি দিতে আমরা সংস্কৃতিকর্মীরা সিলেটের জেলা প্রশাসক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে বারবার কথা বলেছি। কিন্তু তারা নির্বাচন দেবেন, দিচ্ছেন বলে সময় ক্ষেপন করে আসছেন। তিনি বলেন, নির্বাচন না দেয়ার পেছনে কী রহস্য সেটা কারো জানা নেই। মিশু বলেন, আগামী ১ মাসের মধ্যে শিল্পকলা একাডেমির নির্বাচন না দিলে সিলেটের সংস্কৃতিকর্মীরা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবেন।’

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি প্রিন্স সদরুজ্জামান বলেন, ‘শিল্পকলা একাডেমির কার্যনির্বাহী কমিটি হয়নি দীর্ঘ ২২ বছরেও। অ্যাডহক কমিটি পার করেছে ৯ বছর। এজন্য ক্ষুব্ধ সংস্কৃতি অঙ্গনের সকলেই। তিনি বলেন, শিল্পকলা একাডেমি তার গতি হারিয়েছে। গতি ফিরিয়ে আনতে অবিলম্বে নির্বাচন দেওয়া জরুরি।’

সিলেট জেলা কালচারাল অফিসার অসিত বরণ দাসগুপ্ত বলেন, ‘২০০৯ সালে শিল্পকলা গঠিত অ্যাডহক কমিটিতে জেলা প্রশাসক মহোদয়কে সভাপতি, সিলেট জেলা কালচারাল অফিসারকে সদস্য সচিব করে ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির সকল সদস্য গঠনতন্ত্র অনুযায়ী শিল্পকলা একাডেমির সকল কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। কার্যক্রমে কোনো ব্যাঘাত ঘটছে না। তিনি বলেন, ২ বছর আগে অ্যাডহক কমিটির অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হয়। মধ্যখানে দুই বছর আমি সিলেটের বাইরে দায়িত্বে ছিলাম। তাই অনুমোদিত চিঠি এসেছে কী না এই মুহুর্তে বলা যাচ্ছে না। ফাইল দেখে বলতে হবে। তিনি বলেন, আমি বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছি। বিষয়টি আপনাকে পরে জানাবো।’

সিলেটের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক দেবজিৎ সিনহা জানান, ‘নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন কমিটি দেয়ার কার্যক্রম চলছে। সংস্কৃতিকর্মীরা অ্যাডহক কমিটির উপর ক্ষুব্ধ বিষয়টি আমাদের কানে এসেছে। নির্বাচন হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। আর আমরা নির্বাচন দেওয়ার জন্যই কাজ করছি।’