হারিয়ে যাচ্ছে বহু রোগের মহা ঔষধ টুনিমানকুনি পাতা

29

শিপন আহমদ, ওসমানীনগর
প্রাকৃতিক উদ্ভিদ টুনিমানকুনি বা থানকুনি কালক্রমে সিলেট অঞ্চল থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। সিলেটের অঞ্চলের লোকজনের কাছে উদ্ভিদটি টুনিমানকুনি হিসাবে পরিচিত থাকলেও অঞ্চলভেদে এই পাতাটিকে টেয়া, মানকি, তিতুরা, থানকুনি, আদামনি, ঢোলামানি, মানামানি, ধূলাবেগুন, আদাগুনগুনি নামে ডাকা হয়। বহু রোগের প্রতিষেদক এই পাতাটির ইংরেজি নাম Indian Pennywort, ল্যাটিন নাম Centella asiatica, বৈজ্ঞানিক নাম Centella asiatica Urban টুনিমানকুনি মাটিতে লতার মত করে জন্মায়। এক সময় গ্রামের বিভিন্ন স্থানে মহা উপকারী থানকুনি যত্রতত্র দেখা যেত। এখন আগেরকার মত আর তেমন এউদ্ভিদ চোখে পড়েনা। খাল, ছরা, ডোবা, পুকুর ও দিঘীর পাড়ে টুনিমানকুনি বা থানকুনি প্রচুর জন্মাত। রাস্তার ধারে জমির আইলে টুনিমানকুনি ব্যাপক হারে জন্মাত। এ উদ্ভিদের জন্ম এমন ব্যাপক ছিল যে মানুষ চলাচল করতে গিয়ে পায়ের চাপে নষ্ট হয়ে যেত। অনেক অভাবি মানুষ ভাতের সাথে এই পাতা দিয়ে তরকারী রান্না করেও খেত বলে জনশ্রুতি আছে। আবার স্বাদের কারণে অনেক ধনীরাও এই পাতাটিকে ভর্তা করে খান। তখন টুনিমানকুনি বা থানকুনি ছিল এক প্রকার হেলাফেলার বস্তুু হলেও আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে টুনিমানকুনি মানুষের জন্য মহা উপকারী দ্রব্য জানতে পেরে টুনিমানকুনিকে মাহা ঔষধ হিসাবে অখ্যায়িত করেছেন বিজ্ঞজনরা। এক সময় গ্রামের মানুষ প্রাকৃতিক টুনিমানকুনিসহ নানা গাছগাছালির লতা পাতা ও গাছের শিকড় এবং ছালকে ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করত। এসব প্রাকৃতিক উদ্ভিদ খেয়ে অনেকেই সুস্থ হয়ে ওঠার নজিরও ছিল। প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত গাছগাছালি লতা পাতার গুনাগুন উপলব্ধি করে এসব দিয়ে গ্রামে অনেকে লোকজনের চিকিৎসাও করত।

লতা পাতা খেয়ে নিজে সুস্থ হয়ে অন্যকে এসব খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হত। গাছগাছালি ও লতাপাতা দিয়ে মানুষকে চিকিৎসা সেবা দিতে গিয়ে অনেকে কবিরাজ কিংবা ডাক্তার হয়ে যাওযার কথা প্রচারের সাথে সাথে তাদের বাড়ী , ডাক্তার ও কবিরাজ বাড়ী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। সেই সুবাধে এখনও বিভিন্ন গ্রামে কবিরাজ বা ডাক্তার নামে অনেক বাড়ী রয়েছে। সে বাড়ীর লোকজন কবিরাজ বা ডাক্তার বাড়ীর ছেলে হিসেবে অনেকে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করেন। এক সময় কবিরাজ বা ডাক্তার বাড়ীর সাথে আত্মীয়তা করা ছিল গর্বের বিষয়। গ্রামের কবিরাজগন টুনিমানকুনি পাতাকে ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করত। এতে কোন ভেজাল কিংবা কৃত্রিম কোন কিছু মেশানোর সুযোগ নেই। কবিরাজগন টুনিমানকুনি পাতা সংগ্রহ করে এগুলো থেকে রস নিয়ে অথবা পাতা ও শিকড় শুকিযে ঔষধ তৈরী করত। আর কবিরাজি নানা ঔষধের সাথে থানকুনির রস কিংবা পাতা ও শিকড় পিসে দিয়ে ঔষধ সেবনের পরামর্শ দেওয়া হত। থানকুনি পেটের পীড়ার মহা ঔষধ। আমাশয় রোগীদের থানকুনির রস খাওয়ালে পেটের যন্ত্রনা উপসম হয়। তাছাড়া থানকুনি ভর্তা করে গরম ভাত দিয়ে খেলে আমাশয় ও পেটের পীড়া কমে যায়। তাছাড়া থানকুনি সেবনে মুখে রুচি বৃদ্ধি পায়। হজম শক্তি বাড়ে। পেটের অসুখ কমে যায়। মাথাও ঠান্ডা রাখে। মহা উপকারী এ উদ্ভিদ পূর্বে যেভাবে গ্রামের যত্রতত্র দেখা যেত এখন আর তেমন দেখা যায় না।

পরিবেশগত কারনে টুনিমানকুনির উৎপাদন কমে গেছে বলে অনেকের ধারণা। সিলেটের কোন কোন অঞ্চলে থানকুনি পাওয়া গেলেও তা খুবই নগন্য। বিজ্ঞানের যুগে প্রাকৃতিক এ ঔষধী গুনাগুন সর্ম্পকে মানুষ খুব সচেতন হওয়ায় টুনিমানকুনির চাহিদা এখন প্রচুর। চাহিদা থাকা সত্ত্বেও টুনিমানকনির চাষাবাদ কেউ করেনা। তাই উপকারী এ উদ্ভিদ পাওয়া খুব কষ্টসাধ্য।

এখনও অনেকে টুনিমানকুনি কিনে খেতে আগ্রহী কিন্তু পাওয়া যায় না বলে খেতে পারে না। অবশ্য কোন কোন সময় বিশেষ করে রমজান মাস এলে সিলেট অঞ্চলের গ্রাম হাট বাজার গুলিতে টুনিমানকুনি দেখা যায়। তবে দাম চড়া। হেলাফেলার এ টুনিমানকুনিএখন অনেকে বাজারে বিক্রি করতে আনে। এ পাতার ঔষুধী গুনাগুনের বিষয় উপলব্ধি করে কেউ কেউ বাড়ী ঘরের আঙ্গিনায় টুনিমানকুনির চাষাবাদে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।

সচেতন মহল জানান বর্তমান প্রজন্মের অনেকের কাছে টুনিমানকুনি অপরিচিত দ্রব্য। মহা ঔষধ এ টুনিমানকুনি চাষাবাদে আগ্রহী করে তুলতে পারলে অর্থ আয় যেমন হবে তেমনি প্রাকৃতিক এ ঔষধ্য সেবন করে অনেকের রোগ মুক্তির পথ পাওয়া যাবে।

এ ব্যাপারে বালাগঞ্জ কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল মালেক বলেন, ঔষধী জাতীয় গাছ বা গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ মানব দেহের রোগ প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে এগুলো চাষাবাদের জন্য আমারা লোকজনকে প্রণোদনা দিয়ে থাকি। কৃষি দপ্তরের উদ্যোগে এজাতীয় উদ্ভিদের চাষাবাদ করার জন্য আমাদের চেষ্টা আব্যাহত আছে।