জিয়া বলেছিলেন ‘ওয়েলডান মেজর ডালিম’ : কাদের

94

সিলেটে শোকসভায় ওবায়দুল কাদের

নুরুল হক শিপু
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে খুনের পর জিয়াউর রহমান বলেছিলেন ‘ওয়েলডান মেজর ডালিম’-এমন মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি।

গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৫টায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৩ তম মৃত্যুবার্ষিকী এবং জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষ্যে সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ আয়োজিত শোকসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এমন মন্তব্য করেন।

ওবায়দুল কাদের বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর রক্তাক্ত দেহ ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে যখন লুটিয়ে পড়েছিলো তখন জিয়াউর রহমান বলেছিল, ‘ওয়েলডান মেজর ডালিম’। এ থেকেই প্রমাণিত হয় জাতির পিতা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যাকান্ডের সাথে জিয়াউর রহমান জড়িত। কারণ পরবর্তীসময়ে এ বর্বর হত্যাকান্ডের সাথে জড়িতদের পুরষ্কৃত করেছেন জিয়াউর রহমান। খুনিদের নিরাপদে দেশ থেকে বের হয়ে যাওয়া, তাদের পৃষ্ঠপোষকতা, বিদেশি দূতাবাসে চাকরি দেওয়াসহ খুনিদের বাঁচাতে ইনডেমনিটি আইনও পাস করা হয়।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের সভাপতিত্বে ও সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সাবেক এমপি শফিকুর রহমান চৌধুরীর পরিচালনায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ এমপি, জাহাঙ্গীর কবির নানক এমপি, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও সিলেটের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা আহমদ হোসেন, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক আব্দুস সুবহান গোলাপ, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক একেএম এনামুল হক শামীম, খালেদ মাহমুদ চৌধুরী, কেন্দ্রীয় সদস্য রফিকুর রহমান।

সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদের স্বাগত বক্তব্যের মধ্যদিয়ে শুরু হওয়া শোকসভায় রাখেন, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সিলেট জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট লুৎফুর রহমান, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও সিলেট-৪ আসনের এমপি ইমরান আহমদ চৌধুরী, সহসভাপতি ও সিলেট-৩ আসনের এমপি মাহমুদ-উস-সামাদ চৌধুরী।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আরো বলেন, পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে নির্মম হত্যাকান্ড ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সংগঠিত হয়। তিনি বিভিন্ন আলোচিত হত্যাকান্ডের কথা উল্লেখ করে বলেন, জুলিয়েট সিজার, এন্থনী, ইন্দিরা গান্ধী, মহাত্মা গান্ধী, রাজীব গান্ধী হত্যাকান্ডে কোনো শিশু কিংবা অন্তঃস্বত্তা হত্যার শিকার হননি। কিন্তু ১৫ আগস্ট শিশু রাসেলসহ অন্তঃস্বত্তা মহিলাও হত্যার শিকার হয়েছেন। পৃথিবীর ইতিহাসে এটাই সবচেয়ে জঘন্যতম হত্যাকান্ড।

ওবায়দুল কাদের বিএনপিকে উদ্দ্যেশ্য করে বলেন, তারা সংলাপ চায়। কার সাথে সংলাপ? ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা তাদেরকে সংলাপের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। কিন্তু বেগম জিয়া নোংরাভাবে কথা বলেছিলেন। যথন পুত্রশোকে বেগম জিয়া কাতর, তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে শান্তনা দিতে গুলশানে তারা বাসায় গিয়েছিলেন। ওইদিন প্রধানমন্ত্রীকে দেখে গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। পুত্রশোকে কাতর জননীকে শান্তনা দিতে নেত্রীকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। অথচ ওই সময় ব্যারিস্টার রফিকসহ নেতারা ভেতরে ছিলেন।

তারেক রহমানকে হাওয়া ভবনের যুবরাজ উল্লেখ করে সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, হাওয়া ভবনের যুবরাজ তারেকের পরিকল্পনায় ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা হয়। ওই হামলার পরিকল্পনাকারী ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। শেখ হাসিনা সন্ত্রাস বিরোধী সমাবেশে গিয়ে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন ২১ আগস্ট। তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের মদদে এ হামলা হয়। জজ মিয়া নাটক সাজিয়ে ঘাতকদের রক্ষা করার চেষ্টা করা হয়। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় হামলার সব আলামত নষ্ট করে দেওয়া হয়। এফবিআই মামলার তদন্তে এসে ফিরে যায়।

ইভিএম পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি বলেন, এটা সুবিধাজনক প্রক্রিয়া। দ্রুত ভোট গ্রহণ, ভোট গণনাসহ দ্রুত ফলাফল প্রকাশ করা যায়। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন পরীক্ষামূলকভাবে ইভিএমের ব্যবহার করেছে। ইভিএম পদ্ধতির নির্বাচনে রাজশাহী এবং বরিশালে আমরা বিপুল ভোটে জয়ী হই। কিন্তু সিলেটের দুটি কেন্দ্রে আমরা হেরে যাই।

তিনি বলেন, ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ষড়যন্ত্র করেছে। এর পুনরাবৃত্তি হতে দেয়া হবে না। দেশের প্রতিটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। কিন্তু সিলেটে আমরা হেরে গেছি। আমরা অল্প ভোটে পরাজিত হয়েছি। আমরা চাইলে এই অল্প ভোটের ব্যবধান কাটাতে পারতাম। কিন্তু তা আমরা করিনি। প্রধানমন্ত্রীর এ কথা দেশে নির্বাচন হতে হবে অবাদ ও নিরপেক্ষ। কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি কারচুপি করেছে। আওয়ামী লীগ কারচুপির নির্বাচন করে না বলেও জানান তিনি।

সিলেটের নেতাদের ইঙ্গিত করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) নির্বাচনে যারা আত্মবিনাশী কাজ করেছেন তাদের রেহাই নেই। তাদের উপযুক্ত শাস্তি পেতে হবে। আমি সিলেটে কেবল ভাষণ দিতে আসি নাই। সিসিক নির্বাচন নিয়ে যে-সকল অভিযোগ ওঠেছে সেগুলোকে খতিয়ে দেখতে এসেছি।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ বলেন, ‘১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যা করা হয়। ভাগ্যক্রমে দেশের বাইরে থাকায় বেঁচে যান আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা। এরপর নেত্রী যখন দেশে ফিরতে চাইলেন জিয়াউর রহমান বিভিন্নভাবে থাকে দেশে না ফিরতে বাধার সৃষ্টি করেন। অনেক কষ্টে জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরেন। বাবা-মায়ের রুহের মাগফেরাত কামনা করে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে মিলাদ ও দুআ মাফফিল করতে চাইলে ওইদিন শেখ হাসিনাকে বাড়িতে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। পরে শেখ হাসিনা নেতাকর্মীদের নিয়ে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে দুআ করে ফিরেছিলেন। তিনি বলেন, এই বিএনপি-জামায়াত কী না করেছে-তা এদেশের মানুষ জানেন।’

আরেক বিশেষ অতিথি আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, ‘শুধু বঙ্গবন্ধুকে খুন করেই ক্ষান্ত হয়নি শত্রুরা। তারা ২০০৪ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য গ্রেনেড হামলা করে। ওই হামলায় আমাদের নারী নেত্রী আইভী রহমানসহ অনেকেই নিহত হন। ফেরেশতারা আমাদের নেত্রীকে বাঁচিয়েছেন ওইদিন। তিনি বলেন, শুধু তাই নয়; ২০১৪ সালে বিএনপি-জামায়াত দেশে পেট্রোল বোমা মেরে শতশত মানুষ হত্যা করেছে। বিএনপি বোমাবাজি আর হত্যার রাজনীতিতে বিশ্বাসী। তিনি বলেন, সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিরপেক্ষ এবং সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। অথচ বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী প্রথমে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ করে সাংবাদিকদের বলেছিলেন ফলাফল মেনে নেবেন না। সাংবাদিকেরা জিজ্ঞেসও করেছিলেন তিনি যদি বিজয়ী হন তাহলে কী হবে? তখন তিনি বলেছিলেন তবু ফলাফল মানবেন না। কিন্তু বিকেলে দেখা যায় ঠিকই ফলাফল মেনে নিয়েছেন। নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে তিনি কীভাবে বিজয়ী হলেন-বলেও প্রশ্ন রাখেন নানক।’

সভাপতির বক্তব্যে কান্নাজড়িত কন্ঠে বদর উদ্দিন আহমদ কামরান বলেন- ‘আজকে এই মঞ্চে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র হিসেবে আমার বসার কথা ছিল। কিন্তু আমার ভাগ্যে তা নেই। আমি আপনাদের এবং জননেত্রী শেখ হাসিনাকে নৌকার বিজয় উপহার দিতে পারিনি। আমি আপনাদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।

কামরান তখন বলেন, আমি আর কাঁদবো না। কাঁদতে পারিনা, আমি কাঁদলে কর্মীরা কাঁদে, এই সিলেটের মানুষ কাঁদে। আমার জন্য সিলেটের মানুষ অনেক কষ্ট করেছেন। অনেক কষ্ট করেছেন কেন্দ্রীয় নেতারা। আমি আর কেন্দ্রের কাছে মনোনয়ন চাইব না। আমার আর মনোনয়নের দরকার নেই। আমি আওয়ামী লীগের একজন নগন্য এবং ক্ষুদ্র কর্মী হিসেবে আমরণ কাজ করবো। দলের যখন যে সিদ্ধন্ত আসবে সেই সিদ্ধন্ত মতো কাজ করতে চাই। তিনি বলেন, আর সময় নেই সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।’