‘আহত শ্রমিক সাহায্য তহবিল’ নামেই, নেই ব্যাংক একাউন্ট

499

সাড়ে ৩ বছরে ৪০ কোটি টাকা উত্তোলন!


সৈয়দ বাপ্পী
সিলেটের বিভিন্ন সড়কে ‘আহত শ্রমিক সহায়তা তহবিল’ এর নামে রশিদ দিয়ে টাকা উত্তোলন করছে সিলেট জেলা ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়ন। প্রায় সাড়ে ৩ বছর ধরে প্রকাশ্যে টাকা উত্তোলন করা হলেও খোলা হয়নি কোনো ব্যাংক একাউন্ট। শ্রমিক নেতৃবৃন্দ নিজেরাই এ টাকা ভাগবাটোয়ারা করে নেওয়ার খবরে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন সাধারণ শ্রমিকরা। গত কয়েকদিন ধরে শ্রমিক ইউনিয়নের কমিটি নিয়ে বিরোধ চলে আসায় এ খবর প্রকাশ্যে এসেছে। শ্রমিকদের একাংশের দাবি ইউনিয়নের সভাপতি দিলু মিয়া ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল গফুর মিয়া বিভিন্ন মহলকে ম্যানেজ করে আহত শ্রমিক সহায়তা তহবিলের টাকা নয়ছয় করেছেন। শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি সাধারণ সম্পাদক মালিক গ্রুপের নামে টাকা উত্তোলনের বিষয়টি স্বীকারও করেছেন। তবে চাঁদার রশিদে আহত শ্রমিক সহায়তা তহবিলের কথা উল্লেখ না থাকলেও এতে উল্লেখ রয়েছে, ‘মালিক গ্রুপের ব্যয়ভার ও তহবিল সংক্রান্ত রশিদ’। সাধারণ শ্রমিকদের দাবি, গত সাড়ে ৩ বছরে অন্তত ৪০ কোটি টাকা সড়ক থেকে উত্তোলন করা হয়েছে।

জানা গেছে, সিলেটে জেলার পরিবহণ মালিক-শ্রমিকদের নামে সিলেটের বিভিন্ন উপজেলার ১৭টি স্পটে প্রকাশ্যে রশিদ কেটে টাকা উত্তোলন করা হচ্ছে। টাকা উত্তোলনকারীদের দাবি, যোগাযোগ মন্ত্রনালয়ের নির্দেশে এই টাকা উত্তোলন করছেন। ৩০ টাকার রশিদে সংগৃহিত টাকা ‘আহত শ্রমিকদের সাহায্য তহবিল’ গঠন করেছেন। কিন্তু এই সংগঠনের ‘আহত শ্রমিকদের সাহায্য তহবিল’ নামে নেই কোনো ব্যাংক একাউন্ট। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যোগাযোগ মন্ত্রনালয়ের নির্দেশ বলে যা প্রচার করা হচ্ছে, তা সঠিক নয়। মন্ত্রনালয়ের নির্দেশে উল্লেখ রয়েছে কেবল লোড-আনলোড পয়েন্ট থেকে টাকা উত্তোলন করা যাবে।

অভিযোগ আছে, গত সাড়ে ৩ বছর ধরে সিলেট জেলা ট্রাক মালিক গ্রুপের নামে ৩০ টাকার রশিদ দিয়ে ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল গফুর হাতিয়ে নিচ্ছেন উত্তোলিত টাকার বৃহৎ অংশ। ট্রাক মালিক গ্রুপের নামের রশিদ দিয়ে প্রতিদিন শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক গফুর মিয়ার নির্দেশে ১৭টি স্পট থেকে তোলা হচ্ছে। কিন্তু মালিক গ্রুপের দাবি টাকা উত্তোলনের কথা তাদের অজানা। এদিকে, কার ইন্ধনে ১৭টি স্পট থেকে উত্তোলিত টাকা তোলা হচ্ছে কিংবা কাদের কাছে টাকা যাচ্ছে, তার হাদিস জানেনা প্রশাসন কিংবা মালিক-শ্রমিকরা!

জানা যায়, জেলা ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. দিলু মিয়া ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল গফুরের কমিটি ২০১৫ সালের ২৭ মার্চ থেকে দায়িত্ব নেন। এরপর থেকে সিলেট জেলা ট্রাক মালিক গ্রুপের নামে নিজেরা ৩০ টাকার একটি রশিদ তৈরী করেন। প্রতি রশিদ হলো ১শ পৃষ্টার। রশিদগুলো অফিসে না রেখে সাধারণ সম্পাদক আবদুল গফুরের বাসায় রেখে ১৭টি থানা আঞ্চলিক কমিটির মাঝে বিলি করে আসছেন। আঞ্চলিক কমিটির লোকজন অফিসে না গিয়ে সাধারণ সম্পাদকের বাসা থেকে সেই রশিদগুলো সংগ্রহ করে থাকেন। ট্রাক মালিক গ্রুপের রশিদের সাথে ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের ২০ টাকার ও ১শ টাকার একটি রশিদ দেওয়া হয়। এরমধ্যে ২০ টাকা সরকার নির্ধারিত হলেও ১শ টাকার রশিদটি হলো শ্রমিক ইউনিয়নের মনগড়া ও পকেট ভারী করার পন্থা।

ট্রাক মালিক গ্রুপের রশিদগুলো প্রতিদিন শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক গফুর মিয়ার নির্দেশে ১৭টি স্পট থেকে তোলা হচ্ছে। এগুলো হলো, দক্ষিণ সুরমার তেতলী বাইপাস, পরাইরচক বাইপাস, জালালাবাদ থানার তেমুখী বাইপাস, ধোপাগুল, কোম্পানীগঞ্জ, জাফলং, জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট পূর্ব, গোয়াইনঘাট পশ্চিম, কানাইঘাট, জকিগঞ্জ, বিশ্বনাথ, ওসমানীনগর, বালাগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজার শেওলা ব্রিজ ও ফেঞ্চুগঞ্জ। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি রশিদ কাটা হয়, পাথর কোয়ারী বেষ্টিত এলাকা কোম্পানীগঞ্জের কয়েকটি স্পটে প্রতিদিন ১৫টি রশিদ বই, জাফলং ও জৈন্তাপুরে ১০টি রশিদ বই, সিলেটের প্রবেশমুখ দক্ষিণ সুরমায় ৮টি রশিদ বই ও সার কারখানা এলাকা ফেঞ্চুগঞ্জ ৭টি রশিদ বই। অন্যানে স্পটে কোথাও ১টি বই, আবার কোথাও দুটি করে বই চলে। ট্রাক মালিক গ্রুপের ৩০ টাকার ১শ পৃষ্টার রশিদ বইয়ে হয় ৯ হাজার টাকা। সেই অনুপাতে প্রতিদিন কোম্পনীগঞ্জে ট্রাক মালিক গ্রুপের নামে টাকা তোলা হচ্ছে প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা, জাফলং ও জৈন্তাপুরে তোলা হচ্ছে প্রায় ৯০ হাজার টাকা, দক্ষিণ সুরমায় তোলা হচ্ছে প্রায় ৭২ হাজার টাকা ও ফেঞ্চুগঞ্জে তোলা হচ্ছে প্রায় ৬৩ হাজার টাকা। অন্যান্য স্পটে গড়ে তোলা হচ্ছে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। সেই টাকাগুলো বিভিন্ন কমিশনে বিভিন্ন শ্রমিক নেতা ও উপ কমিটির মাঝে বিলি করা হয় কমিশন মুলে। সব মিলিয়ে দেখা যায় প্রতি মাসে প্রায় কোটি টাকার মতো টাকা উত্তোলন হয় ‘শ্রমিক সহায়তা তহবিল কিংবা ‘মালিক গ্রুপের ব্যয়ভার ও তহবিল’ এর নামে।

ট্রাক মালিক গ্রুপের নামে প্রতিদিন ৩ লক্ষাধিক টাকা উত্তোলন হলেও মালিক গ্রুপ নেতাদের দাবি, এই ব্যাপারে তারা কিছুই জানেন না। তবে তাদের কথাগুলো ছিলো রহস্যজনক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন মালিক গ্রুপ নেতা বলেন, সংগঠনের কয়েকজন নেতা গফুর মিয়ার সাথে আঁতাত করে উত্তোলিত টাকার বখরা পেয়ে থাকেন। অথচ সংগঠনের অন্যান্য নেতা ও সদস্যদেরকে বিষয়টি জানানো হতোনা। গত কয়েকদিন ধরে ঘটনাটি মালিক গ্রুপের কার্যকরি কমিটির নেতৃবৃন্দ জেনে গেলে সংগঠনের মধ্যে শুরু হয়েছে তোলপাড়। ক্ষণে ক্ষণে চলে গোপন বৈঠক। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে ট্রাক মালিক গ্রুপের সাংগঠনিক সম্পাদক জাকির আহমদকে প্রধান করে, মালিক গ্রুপের নামে চাঁদা আদায়ের সত্যতা জানতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে জেলা ট্রাক মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক জাবেদ সিরাজ জানান, যোগাযোগ মন্ত্রনালয়ের একটি নির্দেশনা রয়েছে। কেবল লোড-আনলোড পয়েন্ট থেকে টাকা উত্তোলণ করতে পারবে। কিন্তু সিলেটে এই টার্মিনাল না থাকার কারণে তারা রোড থেকে এই টাকা উত্তোলন করছেন।

ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের দক্ষিণ সুরমা-মোগলাবাজার আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি কাউছার আহমদ বলেন, তেতলী বাইপাসে সংগঠনের শ্রমিক চাঁদা ও মালিক চাঁদা প্রতি গাড়ি থেকে নেওয়া হয়। এরমধ্যে ট্রাক মালিক গ্রুপের ৩০ টাকা ও ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের ২০ টাকা। আমরা অল্প কমিশন রেখে বাকি টাকাগুলো জেলা ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল গফুরের কাছে জমা দেই। রশিদ শেষ হলে তার বাসা থেকে তা সংগ্রহ করি।

ট্রাক মালিক গ্রুপের নামে প্রতিদিন ৩০ টাকা করে তোলার কথা স্বীকার করে একই বক্তব্য দেন জৈন্তাপুর আঞ্চলিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক সফিকুর রহমান, গোলাপগঞ্জ আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি বদরুল ইসলাম ও কোম্পানীগঞ্জের শ্রমিক মাহফুজ মিয়া।

তবে ট্রাক মালিক গ্রুপের নামে রশিদের নামে ৩০ টাকা আদায়ের বিষয়টি সকল আঞ্চলিক কমিটির নেতারা স্বীকার করলেও কেবল অস্বীকার করেছেন জেলা ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল গফুর। তিনি বলেন, এটা চাঁদাবাজি নয়। যোগাযোগ মন্ত্রনালয়ের অনুমতিতে তা সংগ্রহ করছি। ৩০ টাকার রশিদ ‘আহত শ্রমিকদের সাহায্য তহবিল’ করেছি। কিন্তু কোন ব্যাংকে এই সংগঠনের ‘আহত শ্রমিকদের সাহায্য তহবিল’ নামের একাউন্ট তা তিনি স্পষ্ট বলতে পারেন নি। গত সাড়ে বছর ধরে সিলেট জেলা ট্রাক মালিক গ্রুপের ৩০ টাকার রশিদ বানিয়ে শ্রমিকদের কাছ থেকে কতো টাকা উত্তোলন করেছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, হিসেব করে জানাতে পারবো।

সিলেট জেলা ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. দিলু মিয়া বলেন, যোগাযোগ মন্ত্রনালয়ের একটি নির্দেশনা রয়েছে। কেবল লোড-আনলোড পয়েন্ট থেকে টাকা উত্তোলন করতে পারবে। কিন্তু সিলেটে এই টার্মিনাল না থাকার কারণে আমরা রোড থেকে এই টাকা উত্তোলন করছি।