‘দেশে ৩ কোটি ২৫ লাখ মানুষ এখনও নিরক্ষর’

16

সবুজ সিলেট ডেস্ক
সিলেটে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালিত হয়েছে। ‘সাক্ষরতা অর্জন করি, দক্ষ হয়ে জীবন গড়ি।’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন স্থানের মতো সিলেটে ও সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নানা কর্মসূচির আয়োজন করে।

গতকাল শনিবার আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে সিলেটের জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে জেলা প্রশাসন, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর উদ্যোগ ও সিলেটে কর্মরত বিভিন্ন এনজিওর সহযোগিতায় সকাল ১০টায় এক বর্ণাঢ্য র‌্যালি বের করা হয়।

র‌্যালিটি নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে আলোচনা সভায় মিলিত হয়।

সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আবু শাফায়াৎ মুহাম্মদ শাহেদুল ইসলামের সভাপতিত্বে ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও ম্যাজিস্ট্রেট সুচন্দা রায়ের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন সিলেটের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) মৃনাল কান্তি দাশ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে মৃনাল কান্তি দাশ বলেন, শিক্ষা উন্নয়নের পূর্ব শর্ত। নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে দেশের নিরক্ষর মানুষদের মুক্ত করতে আমাদের অবস্থান থেকে প্রচেষ্টা চালাতে হবে এবং দায়িত্ব পালন করতে হবে। এটা উন্নয়নের অন্তরায়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ক্ষুধা, দারিদ্র ও নিরক্ষরমুক্ত সোনার বাংলার। তাঁরই সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে ভিশন ২০২১ এবং ২০৪১ বাস্তবায়নে কাজ করছেন। আমাদেরকেও দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে আন্তরিক ও দায়িত্বশীল হয়ে কাজ করতে হবে।

তিনি বলেন, ১৯৬৫ সালে ইরানের রাজধানী তেহরানে ৮৭ দেশের শিক্ষামন্ত্রী ও গবেষকরা ৮ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেন। ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ৮ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও সমাজের মধ্যে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও তাৎপর্য তুলে ধরার লক্ষ্যে দিবসটি নির্ধারণ করা হয়। ১৯৬৬ সালে বিশ্বে প্রথম আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালন করা হয়। প্রতিবছর এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভিন্ন দেশের সাক্ষরতা এবং বয়স্ক শিক্ষার অবস্থা তুলে ধরা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে প্রথম সাক্ষরতা দিবস উদযাপিত হয়।

সভায় সিলেটের শিক্ষা বিভাগ, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো ও বিভিন্ন এনজিওর প্রতিনিধিরা তাদের বক্তব্যে বলেন, বিবিএস’র জরিপ অনুযায়ী, ২০১২ সালে ১৫ বছরের বেশি বয়সীদের সাক্ষরতার হার ছিল ৬০.৭ শতাংশ, ২০১১ সালে ছিল ৫৮.৮ শতাংশ, ২০১০ সালে ৫৮.৬ শতাংশ। আর ২০০৯ সালে ছিল ৫৮.৪ শতাংশ।

ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে দেশে সাক্ষরতার হার ছিল ১৬.৮ শতাংশ। ১৯৭৪ সালে সাক্ষরতার হার দাঁড়ায় ২৫.৯ শতাংশ। ১৯৯১ ও ২০০১ সালে সেই হার দাঁড়ায় যথাক্রমে ৩৫.৩ শতাংশ ও ৪৭.৯ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এর তথ্য মতে দেশে বর্তমান সাক্ষরতার হার ৭২ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। গতবার এই হার ছিল ৭২ দশমিক ৩ শতাংশ। সরকারি হিসেবে যে ব্যক্তি নাম লিখতে পারে তাকেই সাক্ষর হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক নিয়মে শুধু নাম নয়, যে একটা চিঠি লিখতে, পড়তে এবং বুঝতে পারে তাকে সাক্ষর হিসেবে ধরা হয়। যে ব্যক্তিজীবনে শিক্ষাটা প্রয়োগ করতে পারে, হিসাব নিকাশ করতে পারে তাকেই সাক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন ধরা হয়।

বক্তারা আরও বলেন, দেশে এখনও নিরক্ষরের সংখ্যা ৩ কোটি ২৫ লাখ মানুষ এবং বিদ্যালয়বহির্ভূত ৮ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা ১০ লাখ। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমে নিরক্ষরদের সাক্ষরতা জ্ঞান এবং বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়ার জন্য সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।

সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন, সিলেটের উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর সহকারী পরিচালক মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া।

বক্তব্য রাখেন সিলেট জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা গোলজার আহমদ খান, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. ওবায়দুল্লাহ, বিশিষ্ট কলামিস্ট সাংবাদিক আফতাব চৌধুরী, দৈনিক সিলেটের ডাকের সিনিয়র রিপোর্টার এম আহমদ আলী। এনজিও প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন এওয়ার্ডের নির্বাহী পরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ, স্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ, রিডোর নির্বাহী পরিচালক নাসির উদ্দিন, কারিতাসের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক পিইস নানোয়ার, জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশনের ডিটিএল মো. আব্দুল বাকী প্রমুখ। শুরুতে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করেন মো. রফিকুল ইসলাম ও পবিত্র গীতা পাঠ করেন গীতা রানী দাশ।

এদিকে, গতকাল শনিবার সকাল ১১টায় জেলা প্রশাসনের আয়োজনে প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে থেকে র‌্যালীটি বের হয়ে শহরের গুরুত্বর্পূণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে শহীদ আবুল হোসেন মিনলায়তনে গিয়ে আলোচনা সভায় মিলিত হয়। সদর উপজেলা নিবার্হী অফিসার প্রদীপ সিংহের সভাপতিত্বে ও নিবার্হী ম্যাজিস্ট্রেট মিল্টন চন্দ্র পালের পরিচালনায় আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন স্থানীয় সরকার শাখার উপ-পরিচালক এমরান হোসেন, বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার পঞ্চালন বালা, সদর থানার ওসি তদন্ত আব্দুল্লা আল মামুন, শিক্ষাবিদ পরিমল কান্তি দে, সরকারী জুিবলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. ফয়জুর রহমান প্রমুখ।

আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, শিক্ষা ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন অনেক এগিয়ে গেছে। এক সময় ছিল বাংলাদেশে শিক্ষার হার অনেক কম ছিল, মানুষ তার নিজের স্বাক্ষরটা দিতে পারত না সে জন্য যে কোন কাজে টিপসই ছিল তাদের একমাত্র ভরসা। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে ঘরে ঘরে শিক্ষিত মানুষ গড়ে উঠেছে। যার কারণে মানুষ এখন নিজের স্বাক্ষর নিজেই দিতে পারছে।

এদিকে, বালাগঞ্জ আন্তর্জাতিক স্বাক্ষরতা দিবস ২০১৮ উদযাপন উপলক্ষ্যে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে র‌্যালী ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় “স্বাক্ষরতা অর্জন করি, দক্ষ হয়ে জীবন গড়ি” । এ উপক্ষে গতকাল শনিবার সকালে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আব্দুল হকের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত র‌্যালীতে বিভিন্ন স্কুল, কলেজের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং স্থানীয় গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ অংশ গ্রহন করেন। র‌্যালী শেষে উপজেলা হলরুমে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আব্দুল হকের সভাপতিত্বে আয়োজিত আলোচনা সভায়, বক্তৃতা করেন বালাগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম, বালাগঞ্জ থানার এসআই কামরুল ইসলাম, শিক্ষক গোবিন্দ্র চন্দ, বালাগঞ্জ-ওসমানীনগর উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি শাহাব উদ্দিন শাহীন প্রমুখ।

অপরদিকে, ছাতকে আন্তর্জাতিক স্বাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে র‌্যালী ও আলোচনা সভা অনুষ্টিত হয়েছে। শনিবার উপজেলা প্রশাসন ও প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের উদ্যোগে শহরে এক বর্ণাঢ্য র‌্যালী বের করা হয়। র‌্যালী শেষে উপজেলা অডিটোরিয়ামে এক আলোচনা সভা অনুষ্টিত হয়েছে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মানিক চন্দ্র দাসের সভাপতিত্বে ও ইউআরসি ইন্সট্রাক্টর মোস্তফা আহসান হাবীবের পরিচালনায় অনুষ্টিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন, ছাতক উপজেলা চেয়ারম্যান অলিউর রহমান চৌধুরী বকুল। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন, মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পুলিন চন্দ্র রায়, উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক সৈয়দ আহমদ। বক্তব্য রাখেন, মন্ডলীভোগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হেলালুল ইসলাম, বাগবাড়ী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিত্য রঞ্জন দাস, শিক্ষক পঙ্কজ দত্ত, মাহবুবুল হক প্রমূখ। সভার শুরুতে পবিত্র কোরআন তিলওয়াত করেন ইমাদ উদ্দিন মানিক, সভায় জগঝাপ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জগৎ জ্যোতি ভৌমিক, শিমুলতলা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেন সোহাগ, খুরমা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রুহুল ইসলাম পলাশ, আলমপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক খলিলুর রহমান, গনেশপুর সরকারী বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ফয়ছল আহমদ, নোয়াপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রেজ্জাদ আহমদ, ঝামক সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কামরুজ্জামানসহ বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী বৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।