সিলেটে প্রতিবন্ধীদের নামে শিল্প পণ্য মেলার পাঁয়তারা

47

অতীতে চিকিৎসার অর্থ পায়নি রোগীরাও-নেই প্রশাসনের অনুমোদন

স্টাফ রিপোর্টার
বাংলাদেশ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সোসাইটির উদ্যোগে প্রতিবন্ধীদের সাহায্যার্থে সিলেট সদর উপজেলার বটেশ্বর এলাকায় মেলার আয়োজন করা হয়েছে। উর্ধ্বতনমহল কিংবা স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি ব্যাতিরেখে মেলার বসালেও এর বিরুদ্ধে প্রশাসনের নেই কোন ব্যবস্থা। প্রতিবন্ধী শিল্প পণ্য মেলা। নাম শুনে যে কারোরই দরদ জাগতে পারে। বাস্তবে দৃশ্যপট ভিন্ন। এবারও প্রতিবন্ধীদের সহায়তার নাম ভাঙ্গিয়ে মানুষের সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে চলছে মেলার আয়োজন। এর নেপথ্যে রয়েছেন আলোচিত মেলা ব্যবসায়ী মঈন খান বাবলু ওরফে মেলা বাবলু।

বিভিন্ন সময় একেক নামে মেলার নেশায় পেয়ে বসা বাবলু এবার সিলেট সদর উপজেলার বটেশ্বর এলাকায় ক্ষেতের জমিতে করছেন মেলার আয়োজন। গত ৩০ আগস্ট থেকে প্যাভিলিয়ন ও স্টল তৈরীর কাজ চলছে। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে ১৪ সেপ্টেম্বর থেকে মেলা উদ্বোধন হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয়রা জানান, মূলত; ‘মেলা’ বাবুল এই মেলার আয়োজক। আর অন্ধ কল্যাণ সংস্থার নাম দিয়ে সিলেটে ফের মেলার ফন্দি শুরু করেছেন তিনি। অনুমোদন না থাকা স্বত্বেও কতিপয় ক্ষমতাসীন নেতাদের শেল্টারে মেলার নামে লটারী খেলার আয়োজন করছেন বাবলু। মেলা বাবুল বছরে ৪/৫টি মেলার আয়োজন করেন। সমসাময়িক প্রেক্ষাপটকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ধরণের মেলার আয়োজন করেন তিনি। মেলার নামে জুয়া, লটারী, সার্কাস সহ চলে নানা অবৈধ কর্মকান্ড।

কিছু দিন পূর্বে তৃণমূল নারী উদ্যোক্তার কাঁধে ভর করে মেলার আয়োজন করা হয়। অসহায়কে সাহার্য্য, রোগারোগ্য ব্যাধিতে ব্যক্তির চিকিৎসা, মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে চিকিৎসা’ এসবের নামে- বেনামে মেলার আয়োজন করা হয়। কিন্তু যার জন্য মেলার আয়োজন করা হয় তারা কোন সহযোগীতা পান না। আর পেলেও তা নামমাত্র। মেলার পুরো অর্থ ভাগাভাগি করে নেওয়া হয় ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও মেলা বাবুলের মধ্যে। অর্থমন্ত্রীর নাম ভাঙ্গিয়ে বিভিন্ন সময়ও মেলার আয়োজন করা হয়।

সিলেটে ঘন ঘন মেলা আয়োজন নিয়ে বিপাকে রয়েছেন ব্যবসায়ীরাও। এ নিয়ে ব্যবসায়ীরা ক্ষুব্ধ মনোভাব ব্যক্ত করে বলেন, প্রশাসন যদি অনুমোদন না দিয়ে থাকে, তবে কার শেল্টারে মেলার আয়োজন করেন বাবলু।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এর আগেও সিলেটে বিভিন্ন নামে একাধিক মেলার আয়োজন করেন মঈন খান বাবলু। প্রশাসন থেকে সুবিধা পাওয়ার জন্য ক্ষমতাসীন নেতাদের শেল্টার নেন। বিনিময়ে নেতারদের দেওয়া হয় মেলা থেকে অর্জিত অর্থের ভাগ।

গত বছরের ৮ আগস্ট বিভাগীয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম ফটক সংলগ্ন এলাকায় মাসব্যাপী ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প মেলার আয়োজন করা হয়। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বে ছিল বাবলুর প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ বেনারসি মসলিন অ্যান্ড জামদানি সোসাইটি। অথচ মেলায় লটারী বাণিজ্য করে কোটি কোটি টাকা আয় করলেও মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে দেওয়া হয় নামে মাত্র ৫ লাখ টাকা।

একইভাবে গত ঈদুল ফিতরের সময় নগরের টুকেরবাজার তেমুখী সংলগ্ন মাঠে তাঁত বস্ত্র শিল্প মেলার আয়োজন করেন বাবলু। মাস ব্যাপী শুরু হওয়া মেলা চলে আড়াই মাস। অর্থাৎ পবিত্র ঈদুল আজহার সময় একই স্থানে মেলার বদলে অবৈধ গরুর হাট করে মেলার সমাপ্তি টানেন বাবলু।

এছাড়া গত বছরের ৬ জানুয়ারি সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বারের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক বানিজ্য মেলার ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বে ছিলেন বাবলু। নামে আন্তর্জাতিক হলেও ওই মেলায় ফুটপাতের পণ্য তুলে ব্যাপক সমালোচিত হন। পাশাপাশি লটারীর টিকিট ও মেলাঙ্গনে প্রবেশ টিকিট নগর থেকে গ্রামে গাড়ি যোগে বিক্রি করা হয়। ওই মেলা থেকে এক দুরারোগ্য ব্যধিতে নিহত জনৈক সাংবাদিককে সহায়তার আশ্বাস দিলেও সিকি আনাও দেওয়া হয়নি। এভাবে মেলার নামে প্রতারণা করে চলেছেন বাবলু।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিলেট চেম্বার অব কমার্সের এক নেতা বলেন, আর্থিক সাহায্যের খাত দেখিয়ে সিলেটের মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে মেলার আয়োজন করা হয়। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে মেলার আয়োজন করা হয় ওই খাতকে বঞ্চিত রাখেন উদ্যোক্তারা।

এ বিষয়ে শাহপরান (র.) থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আখতার হোসেন বলেন, অন্ধ কল্যাণ সমিতির পক্ষে এমএ মোশাররফ জেলা প্রশাসনের কাছে মেলার অনুমোদন নিয়েছেন। তাতে উপজেলা প্রশাসনের অনুমোদন রয়েছে। ফলে মেলার নীতিমালা প্রতিপালন সাপেক্ষে মেলার আয়োজনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে কোনো ধরণের শর্তভঙ্গ করলে মেলা বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

সিলেট সদর উপজেলার খাদিমপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আফছর আহমদ বলেন, মেলার আয়োজকরা বলেছে জেলা প্রশাসন এমনকি মন্ত্রীরও অনুমোদন আছে। এ নিয়ে আয়োজকরা প্রতারণা করলো কিনা খতিয়ে দেখতে লোক পাঠাবেন।

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সিরাজাম মুনীরা বলেন, জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন থেকে মেলার করার বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য বলেছে। কিন্তু আয়োজকরা অনুমোদন পাওয়ার আগেই মেলার আয়োজন শুরু করে দিয়েছে।

সিলেটের জেলা প্রশাসক নুমেরি জামান বলেন, সদর উপজেলায় মেলার কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। জেলা প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তাও মেলার অনুমতি দেননি।

সিলেট সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আশফাক আহমদ বলেন, আমি জানিনা, অথচ মেলার অনুমোদন দেওয়া হয় কিভাবে। সিলেটে একমাত্র আন্তর্জাতিক বানিজ্য মেলা ব্যতিরেকে কোনো মেলা হতে দেওয়া ঠিক না। সিলেটের মানুষের সরলতা নিয়ে নামে বেনামে মেলা করতে দেওয়া যাবে না। প্রশাসন অনুমোদন দিলেও মেলা বন্ধের উদ্যোগ নেবেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, যে উদ্দেশ্যে মেলা করা হয়, সেই স্বার্থ হাসিল হয় না। বিগত দিনে মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী মারিয়ান চৌধুরী মাম্মীর ছেলের চিকিৎসার অর্থ সংগ্রহে মেলা করা হয়। অথচ এই নারী এখনো ছেলের চিকিৎসা করাতে পারছেন না।

মেলার ইভেনমেনেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মঈন খান বাবলু বলেন, বিভিন্ন সময় মেলার আয়োজন করলেও সহযোগীতার জন্য করে থাকি। আগে তৃণমূল নারী উদ্যোক্তা মেলা থেকে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে ৫লাখ টাকা দিয়েছেন। কিন্তু মেলা থেকে কতটাকা আয় করা হয়েছে এমন প্রশ্ন করলে তিনি এড়িয়ে যান। মাঠে মেলার প্রস্তুতি চলছে। প্রশাসনের অনুমতি আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রশাসনের অনুমতি এখনো পাইনি। তবে আবেদন করেছি। তাহলে অনুমতি ছাড়া মেলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন কিভাবে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, সেটা আমি বুঝবো।

তিনি বলেন, মেলায় স্টল থাকছে ৬০টি, সঙ্গে থাকছে সার্কাস, পুতুল নাচ, লটারী, প্রবেশ টিকেট ও বিভিন্ন ধরণের রাইড করা হবে।

মেলার আয়োজক বাংলাদেশ দৃষ্টি প্রতিদ্বন্দ্বি সোসাইটির চেয়ারম্যান এমএ মোশাররফ বলেন, মেলা করার জন্য আমরা বানিজ্য মন্ত্রনালয় থেকে অনুমোদন নিয়েছি। জেলা প্রশাসন অনুমতি এখনো পাইনি।

অনুমতি না পেয়ে কীভাবে মেলার কাজ চলছে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, প্রশাসনতো অনুমতি দেবে। তবে স্থানীয় প্রশাসনের অনুমোদনের আগে মেলার আয়োজন করা ঠিক হয়নি বলেও স্বীকার করেন তিনি।