সিলেটে প্রার্থী হতে পারেন খালেদা জিয়া কিংবা এরশাদ

124

নুরুল হক শিপু
সরকারের শীর্ষ মন্ত্রীদের বক্তব্য অনুযায়ী আর ক’দিন পরই নির্বাচনকালীন সংক্ষিপ্ত সরকার গঠন করতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। ডিসেম্বর নাগাদ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ট্রেন যাত্রা শুরুও করেছে। বিএনপি দলীয় চেয়ারপার্সনকে ছাড়া নির্বাচনে যাবে না-এমন হুমকি দিচ্ছে বার বার। নির্বাচনী ডামাডোল বেজে উঠায় বিএনপি আওয়ামী লীগের মতো জাতীয় পার্টিও সরব আলোচনায়। বিশেষ করে মর্যাদাপূর্ণ সিলেট-১ আসনে কে বা কারা প্রার্থী হচ্ছেন এ নিয়ে নেতাকর্মীদের মতো সাধারণ মানুষেরও উৎসাহের কমতি নেই। এ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য আবুল মাল আবদুল মুহিত নির্বাচন করবেন না এমন ঘোষণা দেওয়ার পর বেড়েছে আলোচনা। অর্থমন্ত্রী নির্বাচন না করলে গুরুত্বপূর্ণ এ আসন কী শরীকদের জন্য ছেড়ে দেবে আওয়ামী লীগ এমন আলোচনা সবখানেই। আর জাতীয় পার্টির হিসেবে দলীয় চেয়ারপার্সন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সিলেট-১ আসনসহ তিনটি আসনে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে দাবি জাতীয় পার্টি নেতাদের। আবার বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে দলীয় চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া কিংবা তার পুত্রবধূ ডা. জোবায়দা রহমানকে প্রার্থী চান নেতাকর্মীরা। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হেভিওয়েট প্রার্থীদের ধারাবাহিকতা ভাঙ্গতে পারে। সিলেট-১ আসনে দেখা যেতে পারে কোনো দলীয় প্রধানকে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক সকল দলের মূললক্ষ্য থাকে সিলেট-১ আসনে জয়লাভ করা। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই এ আসনে বিজয়ী প্রার্থীর দল সরকার গঠন করে আসছে। এমনকি ১৯৯১ সালে সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনের মধ্যে শুধু এই আসনে বিএনপির প্রার্থী জয়লাভ করেছিলেন এবং সরকারও গঠন করেছিল দলটি। যে কারণে সিলেট থেকেই দলগুলো নির্বাচনী প্রচার শুরু করে। জয়ী হওয়ার জন্য প্রধান দলগুলো শক্তিশালী প্রার্থীও দিয়ে থাকে এ আসনে।

আবুল মাল আবদুল মুহিত। ক্ষমতাসীন দলের অর্থমন্ত্রী। সিলেট-১ আসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ আসন থেকে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রীকে ভোট যুদ্ধে পরাজিত করে তিনি হয়েছিলেন এমপি-এরপর অর্থমন্ত্রী। বয়স হয়েছে আবুল মাল মুহিতের। বিদায়ের জন্য সু-সময় খুঁজছিলেন যেন তিনি। এই সময়ে অনেকটা হাঁপিয়ে ওঠেছেন যেন মুহিত। অনেকদিন থেকে ‘বিদায়-বিদায়’ বলছিলেন। কিন্তু সেটি আর হচ্ছিল না। অবশেষে নিজেই জানিয়ে দিলেন-এখন আর নয়; চাই অবসর। নির্বাচন করবো না। আমার পরিবর্তে আমার অনুজ সিলেট-১ আসনে নির্বাচন করবেন। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল মুহিত নিসন্ধেহে একজন হেভিওয়েট প্রার্থী। সিলেট-১ আসনে শুধু মুহিত নয়; তাঁর মতো অনেক হেভিওয়েট প্রার্থী প্রার্থীতা করে নির্বাচিত হয়ে করেছেন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন। সিলেট-১ সংসদীয় আসনটি সব দলের কাছেই অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। সিলেট সিটি করপোরেশন ও সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনটি ভিআইপি আসন হিসেবে পরিচিত। এ আসনেরই সংসদ সদস্য ছিলেন সাবেক স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ও সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান। বর্তমানে এ আসনের সংসদ সদস্য অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। সংগত কারণেই বিভাগীয় সদরের এ আসনে প্রার্থী কারা হবেন তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোতে থাকে নানামুখী হিসাব-নিকাশ। বর্তমান শাসক দল আওয়ামী লীগ আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচার সিলেট থেকে শুরু করলেও কে হবেন আগামী নির্বাচনে দলের প্রার্থী তা এখনো অনেকটা ধোঁয়াশায়। বর্তমান সংসদ সদস্য অর্থমন্ত্রী মুহিতের নির্বাচন করবেন না এবং তাঁর ভাই এ আসনে নির্বাচন করবেন মন্ত্রীর এমন মন্তব্যের পর অনেকেই এটিকে তাঁর ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে বিবেচনায় নিয়েছেন। তাই এই আসনের প্রার্থী চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগে জটিলতা কাটছে না। এখন পর্যন্ত দল এবং দলের বাইরের একাধিক প্রার্থীর নাম শোনা গেলেও কে হবেন প্রার্থী তা নিশ্চিত নয়। তিন বছর আগে থেকেই শোনা যাচ্ছিল অর্থমন্ত্রীর পরে সিলেট-১ আসনে তাঁর ছোট ভাই ড. এ কে আবদুল মোমেন প্রার্থী হবেন। জাতিসংঘের দায়িত্ব পালন শেষে দেশে এসে সিলেটেই বেশি সময় দিচ্ছেন ড. মোমেন। দলের সদস্যপদও গ্রহণ করেছেন তিনি। সরকারি-বেসরকারি সব অনুষ্ঠানেই তিনি যোগ দিচ্ছেন ভাইয়ের সঙ্গে। অর্থমন্ত্রী নিজেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে এই আসনে নির্বাচন করার আগ্রহের ব্যাপারে ইঙ্গিত দিয়েছেন। বর্তমানে তিনি আওয়ামী লীগ ও এর বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নানা কর্মসূচিতেও নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন। নগরের বিভিন্ন ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ আয়োজিত উঠান বৈঠকেও তিনি যোগ দিচ্ছেন। মোমেন ছাড়াও এ আসনে প্রার্থী হিসেবে আলোচিত নাম হচ্ছে, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ছহুল হোসাইন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সপ্তম গভর্ণর ড. মোহাম্মদ ফরাস উদ্দিন এবং সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান।

সিলেট-১ আসনে প্রার্থী নিয়ে জটিলতা রয়েছে সংসদের বাইরে থাকা বিএনপিতেও। দলের শীর্ষ নেতারা এ আসনে সিলেটের মেয়ে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমানকে প্রার্থী হিসেবে দেখতে চাচ্ছেন। অপরদিকে এ আসনের মনোনয়ন পেতে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তবে দল থেকে অব্যাহতি নেওয়া শমসের মুবিন বীরবিক্রম দল না ছাড়লে এ আসন থেকে নির্বাচন করার সম্ভাবনা ছিলো বলে জানিয়েছেন বিএনপি নেতারা।

অপরদিকে, নবম ও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে বর্তমান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির কোনো প্রার্থী ছিল না। জোটগতভাবে নির্বাচন করায় দলটি এ আসনে প্রার্থী দেয়নি। এর আগে ১৯৯৬ সালে নির্বাচনে এ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী ছিলেন বাবরুল হোসেন বাবুল। ২০০১ সালের নির্বাচনে ইসলামী জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন হলে এই আসনে জাতীয় পার্টির আব্দুল মুকিত খান ফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। আগামী নির্বাচনে দলটির সঙ্গে আওয়ামী লীগের জোট হলে এ আসনে তাদের কোনো প্রার্থী থাকবেন কি না এটা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা এই আসনে দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে প্রার্থী হিসেবে চাচ্ছেন।

এ ব্যাপারে সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বদর উদ্দিন আহমদ কামরান বলেন, ‘সিলেট-১ আসনে নেত্রী যাকে প্রার্থী দেবেন আমরা তাঁর হয়েই কাজ করবো।

জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব এহিয়া চৌধুরী বলেন, ‘জাপা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তিনটি আসনে নির্বাচন করবেন। এরমধ্যে একটি হচ্ছে সিলেট-১ আসন। তিনি বলেন, জাতীয় পার্টির সকল নেতাকর্মীরাই চাচ্ছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি পল্লীবন্ধু এই আসনে নির্বাচন করুন।

সিলেট মহানগর বিএনপি সভাপতি নাসিম হোসাইন বলেন, বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা চান সিলেট-১ আসনে বিএনপির চেয়ারপার্সন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া যেনো প্রার্থী হন। কোনো কারণে তিনি প্রার্থী না হলে তার পূত্রবধূ সিলেটের মেয়ে জোবায়দা রহমানকে যেনো প্রার্থী করা হয়। জিয়া পরিবারের কেউ প্রার্থী না হলে দল যাকে মনোনয়ন দেবে, তার পক্ষে আমরা কাজ করে যাবো।