বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের ঘোষণা

43

নির্দলীয় সরকার গঠন, সেনা মোতায়েন, ইভিএম বাতিলসহ ৫ দফা দাবি

সবুজ সিলেট ডেস্ক
যে পাঁচ দফা ১. জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে সংসদ ভেঙে দিয়ে রাজনৈতিক দলসমূহের সঙ্গে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন; ২.গণমাধ্যম ও সকল রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশের স্বাধীনতা এবং আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন; ৩. ‘কোটা সংস্কার’ এবং ‘নিরাপদ সড়ক’ আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্র-ছাত্রীসহ সকল রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি এবং নতুন করে কাউকে গ্রেফতার না করা; ৪. নির্বাচনের এক মাস পূর্বে এবং ভোটের পরের দশ দিন মোট চল্লিশ দিন প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ সেনাবাহিনী মোতায়েন; ৫. নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের পরিকল্পনা বাদ দিয়ে নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা।

আইনের শাসন, সামাজিক ন্যায়বিচার সুনিশ্চিত এবং জনগণের ভোটের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার গঠন, সেনা মোতায়েন, ইভিএম বাতিলসহ ৫ দফা দফা দাবির ভিত্তিতে বি. চৌধুরীর যুক্তফ্রন্ট ও ড. কামাল হোসেনের জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া ‘বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যে’র ঘোষণা দিয়েছে। গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্চে এক সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় ঐক্যের ঘোষণাপত্র পাঠ করেন নাগরিক ঐক্যে আহবায়ক ডাকসু ও চাকসুর সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না। এ সময় উপস্থিত ছিলেন জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার আহবায়ক গণফোরাম সভাপতি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন, স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলক জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রবসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। মঞ্চে আসার পথে রাস্তায় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী উপস্থিত হতে পারেননি। তবে তার প্রতিনিধি ছিলেন।

দেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি চর্চা এবং আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণার প্রাণকেন্দ্র জাতীয় শহীদ মিনারে এই ঘোষণা দেয়ার কথা ছিল। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের নিয়ে ড. কামাল হোসেন, আসম আবদুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্না, জাফরুল্লাহ চৌধুরীরা পদযাত্রা করে সেখানে যেতে চাইলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ শহীদ মিনারে যাওয়ার অনুমতি দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। নেতৃবৃন্দ যাতে শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে ঐক্যের ঘোষণা দিতে না পারেন সে জন্য আগে থেকেই পুলিশ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ঘিরে রাখে। ফলে মাঝপথ থেকে ফিরে এসে জাতীয় প্রেসক্লাবে বৃহত্তর ঐক্যের এই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়া হয়। শহীদ মিনারে উঠতে না দেয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে আসম আবদুর রব বলেন, বঙ্গবন্ধু সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল, আমি স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলকসহ আমাদের শহীদ মিনারে উঠতে দেয়া হয়নি। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও মুক্তিযুদ্ধে আমাদের কার অবদান কতটুকু দেশবাসী জানে। এই নজীববিহীন ন্যাক্কারজনক ঘটনার নেপথ্যে যারা তাদের একদিন একই পরিণতি ভোগ করতে হবে। যে পাঁচ দফা দাবিতে জাতীয় ঐক্য ঘোষিত হয়েছে সেগুলো হচ্ছে ১) জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে বর্তমান সংসদ ভেঙে দিয়ে রাজনৈতিক দলসমূহের সঙ্গে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন করতে হবে।

নির্বাচনকালীন সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। ২) গণমাধ্যম ও সকল রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে এবং আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে। ৩) ‘কোটা সংস্কার’ এবং ‘নিরাপদ সড়ক’ আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্র-ছাত্রীসহ সকল রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে আনীত মিথ্যা মামলাসমূহ প্রত্যাহার করতে এবং গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি দিতে হবে। এখন থেকে নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করা যাবে না। ৪) নির্বাচনের এক মাস পূর্ব থেকে নির্বাচনের পর দশ দিন পর্যন্ত মোট চল্লিশ দিন প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে। এবং আইন শৃংঙ্খলা বাহিনী নিয়োজিত ও নিয়ন্ত্রণের পূর্ণ ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের উপর ন্যাস্ত করতে হবে। ৫) নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের চিন্তা ও পরিকল্পনা বাদ দিতে হবে, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ এর যুগোপযোগী সংশোধনের মাধ্যমে গণমূখী করতে হবে এবং লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে।

শত শত সাংবাদিকের উপস্থিতি এবং অর্ধশত ক্যামেরার ক্লিক ক্লিকের মধ্যে ‘বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যে’র ঘোষণা পাঠ করা হয়। অতপর আর্ন্তজাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী ড. কামাল হোসেন বৃহত্তর এই ঐক্যের ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, আমরা আজকে এক বৃহত্তর ঐক্যের ভিত্তি নির্মাণ করেছি। আজ যে ঐক্যের ঘোষণা দেয়া হয়েছে তাকে আরো সুসংহত করে জনগণের শক্তিতে রূপান্তরিত করতে হবে। আমাদের এই ঐক্যের লক্ষ একটি অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন আদায় করা। সংবিধানে স্পষ্টপ করে বলা হয়েছে এ দেশের মালিক হচ্ছে জনগণ। এই জনগণ যাতে নির্ভয়ে, প্রভাবমুক্তভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে সেটাই মূল লক্ষ্য। জনগণের ভোটের মাধ্যমে প্রকৃত জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হবে এবং প্রতিষ্ঠিত হবে প্রকৃত গণতন্ত্র।

জেএসডির সভাপতি স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলক আ স ম আবদুর রব বলেন, জাতি যখন আজ এক দুঃসময়ে তখন দেশের ১৬ কোটি মানুষকে শহীদ মিনারে যেতে দেয়া হচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মাধ্যমে সরকার এই ঘৃণ্য ও জঘন্য কাজ করছে। আজকের এই ঘটনা সরকারের চরম ফ্যাসিবাদি চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ। তিনি এ ঘটনার তীব্র ঘৃণা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আমরা সহিংসতা চাই না। তাই এই প্রতীকি পদযাত্রার মাধ্যমে আমাদের কর্মসূচী শেষ করছি। তবে মহান আল্লার কাছে প্রার্থনা করি আজকে যারা আমাদেরকে শহীদ মিনারে যেতে দেয়নি আগামী ২১ ফেব্রুয়ারির আগেই যেন তাদের এই ক্ষমতার বাহাদুরি শেষ হয়ে যায়।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত ঘোষণাপত্র পাঠে মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, বর্তমানে একটি জনসমর্থনহীন, অনির্বাচিত সরকার দেশ শাসন করছে। সন্ত্রাস, গ্রেফতার, মিথ্যা মামলা ও পুলিশ প্রশাসন ব্যবহার করে ক্ষমতায় টিকে আছে। জনসমর্থন নিয়ে কেউ যাতে ক্ষমতায় না আসতে পারে সেজন্য তারা জনগণের অবাধ রাজনৈতিক কর্মকান্ডের অধিকারসহ গণতান্ত্রিক ও ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছে। আগামী নির্বাচনে যে কোনভাবে জয়লাভের জন্য ইভিএম পদ্ধতি প্রবর্তন, ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন অনুষ্ঠানসহ একের পর এক কূটকৌশল অবলম্বন করছে।

সন্ত্রাস, গুম, খুন, বিচারবর্হিভূত হত্যা এবং নির্বিচারে জেল-জুলুম ও নির্যাতনের মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকারসহ, মৌলিক, মানবাধিকার ও সাংবিধানিক অধিকারসমূহ কেড়ে নেওয়া হয়েছে। সরকারি চাকরিতে ‘কোটা সংস্কার’ এবং ‘নিরাপদ সড়ক’ -এর দাবিতে ছাত্র সমাজের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন পুলিশ ও সরকারী নামধারী ছাত্র সংগঠন অত্যন্ত ন্যাক্কারজনকভাবে দমনে লিপ্ত। এখানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই, ভিন্নমতের কাউকে নির্বিঘ্নে সভা-সমাবেশ করতে দেওয়া হয় না। রাষ্ট্রের আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগসহ সমগ্র রাষ্ট্র্রযন্ত্রকে এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বেচ্ছাচারী নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারসমূহ হরণ করা হয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে দেশ, জাতি ও জনগণকে মুক্ত করে রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বত্র কার্যকর গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে-বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গঠনের কোন বিকল্প নেই।

তাই, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সকল স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী রাজনৈতিক দল, সামাজিক শক্তি ও নাগরিক সমাজসহ জনগণকে সুসংগঠিত করে আমরা পাঁচ দফা দাবি ও ৯টি লক্ষ্য বাস্তবায়নে শান্তিপূর্ণ ও অহিংস গণআন্দোলন গড়ে তোলার অঙ্গিকার ব্যক্ত করে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ার কার্যকর উদ্যোগ অব্যাহত রাখার ঘোষণা প্রদান করছি।

সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সদস্য সচিব আ ল ম মোস্তফা আমিন, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি এডভোকেট সুবত চৌধুরী, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জেএসডির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন, ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর, গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাষ্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, বিকল্পধারা বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার ওমর ফারুক, গণদলের সভাপতি এটিএম গোলাম মাওলা চৌধুরী, মহা সচিব আবু সৈয়দসহ শতাধিক নেতা উপস্থিত ছিলেন।