সিলেট বিভাগের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কুলাউড়ার কালা পাহাড়

36

কুলাউড়া সংবাদদাতা
কুলাউড়ার কালাপাহাড় সিলেট বিভাগ তথা দেশের এ অঞ্চলের সর্বোচ্চ পাহাড়চূড়া। উচ্চতা প্রায় সমুদ্রপৃষ্ট থেকে ১১০০ ফুট। ২০১৫ সালে একদল ভ্রমণপিয়াসী অভিযাত্রী বিডি এক্সপেন্টারার এই চূড়াটি খুঁজে পায় এবং গারমিন চালিত জিপিএস দিয়ে এর সর্বোচ্চ বিন্দু ১, ০৯৮ ফুট (সমুদ্র স্তর থেকে) পরিমাপ করে। এর এক পাশে কুলাউড়া উপজেলা, অন্য পাশে জুড়ী উপজেলা ও ভারত সীমান্ত।

কালা পাহাড়ের অবস্থান মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নে। এখানে খাসিয়া জাতিগোষ্ঠীর মানুষ প্রায় সবাই খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী। প্রায় পাঁচশত পরিবার নিয়ে সীমান্তবর্তী বেগুনছড়া, পুঁটিছড়া, লবনছড়া পুঞ্জীর লোকজনের বসবাস।

আশপাশে আরও বেশ ক’টি খাসিয়া পুঞ্জি রয়েছে। এখানকার মানুষের আয়ের প্রধান উৎস হচ্ছে পান চাষ। এছাড়া বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা এখানে আসেন এক্সট্রিম এডভেঞ্চারাস ট্রেকিং ট্রেইলের ট্রিপ দেয়ার জন্য।

কালা পাহাড়ের পর্বতশ্রেণীকে স্থানীয় ভাসায় লংলা পাহাড় শ্রেণী নামে ডাকা হয়। ‘কালা পাহাড়’ হচ্ছে সর্বোচ্চ চূড়ার স্থানীয় নাম। বাংলাদেশ জিওগ্রাফিক সোসাইটির মতে, এই পাহাড়টি ‘হারারগঞ্জ পাহাড়’ নামেও পরিচিত। দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় এলাকায় অবস্থান করা এই পাহাড়ের ৬০% বাংলাদেশে পড়েছে এবং বাকি অংশ ভারতের উত্তর ত্রিপুরায় অবস্থিত। ত্রিপুরায় এই পাহাড়টির বাকি অংশ রঘুনন্দন পাহাড় নামে পরিচিত।

ভারতের বিখ্যাত প্রাচীন প্রত্মতাত্ত্বিক লল ধর্মীয় স্থান ঊনকোটি এই পাহাড়টির পাদদেশে অবস্থিত। কালা পাহাড়ের সর্বোচ্চ বিন্দু থেকে হাকালুকি হাওরের নীল পানি দেখা যায়। কুলাউড়া শহর থেকে কালা পাহাড়ের দূরত্ব আনুমানিক ৩৫ কি.মি। পাহাড়ের যাবার ট্রেকিং পথটি অনেক সুন্দর। পাহাড়ে উঠার পথ একটা (পাহাড়ি পথ) কিন্তু নামার পথ দুইটা, ঝিরি পথ ও পাহাড়ি পথ।

এক সময় এই গৃহীন পাহাড়ে পাশ^বর্তী ভারতের বিদ্রোহী উগ্রপন্থী দল উলফা এবং (এল এল টি টি এফ) এর সদস্যরা আত্মগোপন করে এই জায়গায় নানা ট্রেনিং করতো। তখন বাংলাদেশের পর্যটকরা অনেকে ভয়ে এই কালা পাহাড়ে ভ্রমন থেকে বিরত থাকতেন। কিন্তু বর্তমানে এসব উগ্রপন্থী দল দেশ থেকে একেবারে নির্মুল হওয়ায় পাহাড়টি বর্তমানে নিরাপদ ভুমি হয়ে উঠেছে। ফলে পর্যটকরা স্বাচনদ্দে এখন ভ্রমন করতে পারছেন। মূলত প্রচার-প্রচারণার অভাব, অনুন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা ও পর্যটকদের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সেখানে কোনো দিকনির্দেশনা এবং পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকার কারণে স্থানটি আকর্ষণীয় হচ্ছেনা।

কালা পাহাড়কে পর্যটন বান্ধব স্থান হিসেবে গড়ে তুলতে হলে শুরুতেই দেশের সকলকে জানাতে হবে যে, এই পর্বত জয় করলে এক্সট্রিম হিল এডভেঞ্চারাস ট্রেকিং ট্রেইলের অনুভূতি পাওয়া যায়।

কুলাউড়া থেকে রবিরবাজার হয়ে আজগরাবাদ চা-বাগান পর্যন্ত পাকা সড়ক আরো বড় করতে হবে। যাতে করে পর্যটকদের বড় গাড়ি সেখান পর্যন্ত যেতে পারে। আজগরাবাদ চা-বাগান থেকে পায়ে হেঁটে বেগুনছড়া পুঞ্জিতে পর্যটকরা যাওয়ার জন্য রোডম্যাপের গাইডলাইন সেখানে স্থাপন করতে হবে। চা-বাগান থেকে পুঞ্জি যাওয়ার পথে কিছু দিকনির্দেশনামূলক সাইনবোর্ড থাকলে পর্যটকরা খুব সহজেই নিজে থেকে বেগুনছড়া যেতে পারবে।

আজগরাবাদ চা-বাগান থেকে বেগুনছড়া পুঞ্জি যাওয়ার পথে ফানাই নদীসহ আরো ১০-১৫ টি পাহাড়ি বড় খাল পাওয়া যায়। বাঁশের সাকো দিয়ে এগুলো পার হতে পর্যটকদের অনেক কষ্ট করতে হয়। বর্ষার মৌসুমে পাহাড়ি ঢলে অনেক সময় বাঁশের সাঁকো ভেঙ্গে যায়।

ফানাই নদীর উপর পাঁকা সেতু এবং পাহাড়ী খালের উপর মজবুত বাঁশের সাঁকো অথবা স্ট্রীলের ঝুলন্ত সেতু স্থাপন করতে পারলে পর্যটকরা এবং স্থানীয় আদিবাসীরা খুব সহজেই নদী/খাল পার হওয়ার পাশাপাশি সেখানকার সৌন্দর্য্যও বৃদ্ধি পাবে।

কালা পাহাড়ের চূড়ায় স্বাগতম সাইনবোর্ড স্থাপন করতে হবে যাতে পর্যটকরা বুঝতে পারে তারা পর্বত জয় করে ফেলছে এবং সেখানে পর্যটকরা পৌঁছার পর যাতে সামান্য বিশ্রাম নিতে পারে সেজন্য পরিবেশবান্ধব স্থায়ী বিশ্রামাগার স্থাপন করতে হবে। বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন যদি এই স্থানটি আকর্ষনীয় করে গড়ে তুলতে পারে তাহলে দেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এই পাহাড়।

মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলাম মুঠোফোনে জানান, কুলাউড়া উপজেলায় এমনিতেই হাকালুকি হাওর ও গগণটিলা পর্যটকদের কাছে খুবই আকর্ষণীয়। পাশাপাশি কালাপাহাড়টি যাতে পর্যটন এরিয়া হিসেবে সুপরিচিতি পায় সে ব্যাপারে আমি কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বনবিভাগের মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে বিষয়টি বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনকে অবগত করবো।