জাতীয় ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপ : চার বছরেও প্রাইজমানি পাননি খেলোয়াড়রা!

143

নুরুল হক শিপু
জাতীয় ক্রীড়াঙ্গনে সিলেটের জৌলুস নতুন নয়; অনেক পুরনো। বিশেষ করে ব্যাডমিন্টনে সিলেটের দাপটের কথা কেউ অস্বীকার করা সুযোগ নেই। দিনদিন সাফল্য আর প্রাপ্তি বাড়ছে। সিলেট থেকেই অঙ্কুরিত হচ্ছে বাংলাদেশের ব্যাডমিন্টনের আগামীর স্বর্ণোজ্জ্বল সম্ভাবনা। এ কোনো আজগুবি স্বপ্ন নয়; সিলেটের পরিসংখ্যানই সিলেটের হয়ে কথা বলছে। তবে প্রতিভাবান খেলোয়াড়েরা জাতীয় পর্যায়ে গত চার বছর থেকে লজ্জিত।

লজ্জার কারণও রয়েছে, যদিও বিষয়টি নিয়ে কোনো খেলোয়াড় কথা বলতে চান না তবুও ঘটনাটি ব্যাডমিন্টন পাড়ায় এখন আলোচনার শীর্ষে। আর এই আলোচনা তারকা খেলোয়াড়দের যেমন লজ্জায় ফেলেছে, ঠিক তেমনি সিলেটের ব্যাডমিন্টন অঙ্গনকেও করেছে কলুষিত।

সূত্র মতে, ২০১৪ সালে প্রথমবারের মতো সিলেটের আবুল মাল আবদুল মুহিত ক্রীড়া কমপ্লেক্সে ৩৩তম জাতীয় ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপ অনুষ্ঠিত হয়। সুন্দর ও সফলভাবে টুর্নামেন্টের খেলা সম্পন্ন হলেও চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ খেলোয়াড়েরা পাননি তাদের কোনো প্রাইজমানি। দীর্ঘ চার বছর অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত প্রাইজমানির বিষয়টি অজানা রয়েছে সিলেট জেলা ক্রীড়া সংস্থার। বর্তমান কমিটির দায়িত্বরতরা বলছেন, এই ব্যাপারটি জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক কমিটির দায়িত্বশীলরাই ভালো জানেন। কেন পুরষ্কার ও প্রাইজমানি দেওয়া হয়নি, তা তারাই বলতে পারবেন। তবে জেলা ক্রীড়া সংস্থার কাছ থেকে খেলা চলাকালীন সময়েই সাবেক দায়িত্বরতটা খেলোয়াড়দের প্রাইজমানির টাকা তুলে নিয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে হিসাবরক্ষক জাহেদ উদ্দিন।

২০১৪ সালের ১৩ নভেম্বর সিলেটে অনুষ্ঠিত ৩৩তম জাতীয় ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপের উদ্বোধন করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এটি ছিলো সিলেটে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত ব্যাডমিন্টনের প্রথম জমজমাট আসর। ব্যাট আর শার্টেলের ধ্বনি, তারকা খেলোয়াড়দের ক্রীড়া নৈপুন্য দেখতে ব্যাডমিন্টন প্রেমিরা ছুটে গিয়েছিলেন আবুল মাল আবদুল মুহিত ক্রীড়া কমপ্লেক্সে। দর্শক ভর্তি গ্যালারি আর দর্শকদের হাততালিতে অসাধারণ হয়েছিল প্রতিটি ম্যাচই। কিন্তু এতো সুন্দর এবং বড় ব্যাডমিন্টন আসরটি আজ কালিমায় লেপটে আছে।

সিলেটের একাধিক ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় জানান, ‘বাইরের জেলায় খেলতে গেলে আমাদের অপমানিত হতে হয়। অন্য জেলার খেলোয়াড়েরা আমাদেরকে বলেন, সিলেট ক্রীড়া সংস্থা না-কি তাদের প্রাইজমানির টাকা মেরে খেয়েছেন। এতে আমাদের মাথা নিচু হয়ে যায়।’

খেলোয়াড়দের এমন অভিযোগের কারণে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর ও সিলেট জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সদস্য আজাদুর রহমান আজাদ ঘোষণা দিয়েছেন তিনি ব্যক্তিগতভাবে প্রাইজমানির টাকা সংশ্লিষ্টদের প্রদান করবেন।

এদিকে ২০১৪ সালে চ্যাম্পিয়ন হওয়া নারী তারকা শার্টলার এলিনা সুলতানা একজনের কমেন্টে লিখেছেন, ‘২০১৪ সালের চ্যাম্পিয়নশিপের টাকা তিনি এখনো পাননি।’ আরেকজন তারকা খেলোয়াড় তাঁর ফেইবুক স্ট্যাটাসে প্রাইজমানি না পেয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এমন স্ট্যাটাস আর কমেন্টের কারণে ২০১৪ সালের এই ঘটনা এখন সব খেলোয়াড়দের মুখে মুখে।

সিলেট জেলা ক্রীড়া সংস্থার হিসাবরক্ষক জাহেদ উদ্দিন জানান, ‘২০১৪ সালে খেলা চলাকালীন সময়ে কমিটিতে দায়িত্বপ্রাপ্তরা প্রাইজমানির টাকা ক্রীড়া সংস্থার কাছ থেকে নিয়েছেন। কিন্তু খেলোয়াড়রা কেন প্রাইজমানির টাকা পেলেন না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে কোনো খেলোয়াড়ের লিখিত অভিযোগ আমরা পাইনি।’

এ ব্যাপারে সিলেট জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক কোষাধ্যক্ষ এএম মিরাজ জাকির দাবি করেন, ‘আমরা সকল খেলোয়াড়দের প্রাইজমানি দিয়েছি। টাকা না পাওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়; প্রাইজমানি খেলোয়াড়রা পেয়েছেন।’

২০১৪ সালে জাতীয় ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপের ৩৩তম আসরে দ্বৈত চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন সিলেটের রাহাত কবির ও সালেহ আহমদ শ্যামল। রানার্সআপ হন সিলেটের এবাদুল হক চৌধুরী সুহেল ও জয়নাল আবেদীন। এছাড়া এককে চ্যাম্পিয়ন হন ঢাকার আইমান ইবনে জামান, রানার্সআপ হন সিলেটের এনামুল হক এনাম। নারী এককে এলিনা সুলতানা (ঢাকা) চ্যাম্পিয়ন এবং শাপলা (পাবনা) রানার্সআপ হন।

সিলেটের খেলোয়াড়রা ব্যাডমিন্টনে রাজত্ব করলেও ২০১৪ সালের প্রাইজমানি তাদের সুনামে এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেই তাদের মন্তব্য।

ব্যাডমিন্টনে সিলেটের সাফল্যগাঁথা দীর্ঘদিনের।

গত এশিয়ান গেমসে (এসএ গেমস) ব্যাডমিন্টনে বাংলাদেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছেন সাতজন। তাদের তিনজনই হচ্ছেন সিলেটের! ওই তিনজন হচ্ছেন এনামুল হক এনাম, রাহাত কবির খালেদ ও জামিল আহমদ দুলাল। জাতীয় ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপের ৩৪তম আসরে দ্বৈতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন সিলেটের জামিল আহমদ দুলাল ও রাহাত কবির খালেদ। এ প্রতিযোগিতায় রানার্সআপও সিলেটের জনপ্রিয় জয়নাল-সুহেল জুটি। এ বছর পুরুষ এককে রানার্সআপ হয়েছেন সিলেটের এনামুল হক এনাম। মিশ্র দ্বৈতে রানার্সআপ হয়েছেন সিলেটের খালেদ-মৌলি জুটি।

জুনিয়র চ্যাম্পিয়নশিপের দ্বৈততে সিলেটের খাইরুল ইসলাম অপু ও সুজন আহমেদ পড়েছেন বিজয়মাল্য। এছাড়া এককে রানার্সআপ হয়েছেন খাইরুল ইসলাম অপু।

অনূর্ধ্ব-১৫ ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপের এককে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন সিলেটের হানিফ আলম। সিলেটের গৌরব সিংহ ও মাইমম মাঙ্গালা এ চ্যাম্পিয়নশিপের দ্বৈততে হয়েছেন চ্যাম্পিয়ন। এ চ্যাম্পিয়নশিপের মেয়েদের প্রতিযোগিতায় সিলেটের লাবণী বেগম হয়েছেন রানার্সআপ। তাছাড়া জাতীয় স্কুল-মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড শীতকালীন ক্রীড়া প্রতিযোগিতায়ও মেয়েদের মধ্যে চ্যাম্পিয়ন হন এই লাবণী।

এছাড়া এবারের সামার ওপেন (র‌্যাংঙ্কিং) ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্টে সিলেটের গৌরব সিং এককে চ্যাম্পিয়ন এবং তাঁরই চাচাত ভাই মাঙ্গাল সিং রানার্সআপ হয়।