সিলেটের তারকা খেলোয়াড়দের দুঃখ গাঁথা!

88

শুরু হচ্ছে আজাদ কাপ বাংলাদেশ ওপেন ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্ট

নুরুল হক শিপু
ব্যাডমিন্টনে জাতীয় পর্যায়ে একসময় রাজত্ব ছিল বগুড়ার। এরপর চট্টগ্রামের। এখন সিলেটের দিন। টানা তিন বছর ধরে সিলেটের খেলোয়াড়রা ব্যাডমিন্টনের শিরোপার মালিক। এ রাজত্ব দীর্ঘদিন ধরে রাখতে চান সিলেটের তারকা খেলোয়াড়রা। কিন্তু এতে রয়েছে অনেক বাধা। শত বাধা ডিঙিয়ে সিলেটের প্রতিভাবান খেলোয়াড়রা কী পারবেন তাদের অবস্থান ধরে রাখতে? এমন প্রশ্নই এখন দেখা দিয়েছে। কারণ হিসেবে জানা গেছে-সঠিক পৃষ্টপোষকতার অভাব রয়েছে সিলেট ব্যাডমিন্টন অঙ্গণে। খেলোয়াড়রা দেশের ভেতরে কিংবা বাইরের দেশে টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করলে তাঁরা পাচ্ছেন না পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক সহযোগিতা। এমন অবস্থায় অনেকটাই মানবেতর জীবন কাটছে তাদের।
‘এনামুল হক। ২০ বছর থেকে যুদ্ধ করছেন শার্টেল আর ব্যাট নিয়ে। সিলেটের হয়ে খেলেছেন দেশে-বিদেশে। অর্জন করেছেন বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব। একাধিক বার রানার্সআপও হয়েছেন। দেশের হয়ে বিদেশের মাটিতে খেলে অর্জন করেছেন ব্যাপক খ্যাতি। কিন্তু খ্যাতিমান এ শার্টলারের এতো দুঃখ কিসের? তা গতকাল নিজ মুখেই প্রকাশ করেছেন। বলেছেন, এখন সিলেট ক্রীড়াঙ্গণের শ্রেষ্ঠ অর্জন ব্যাডমিন্টনে। একসময় আমরা জাতীয় পর্যায়ে খেলতে গিয়ে একটি স্থানে নিরবেই বসে থাকতাম। দেশ সেরাদের দাঁড়িয়ে আনন্দ করতে দেখেছি। অন্য জেলার খেলোয়াড়েরা দেশ সেরাদের সাথে সেলফি ওঠছেন। আমারা তখন অনেকটাই অবহেলিত। কিন্তু আজ দিন বদলেছে। এখন আমরাই সেরা। এখন সিলেটের সেরাদের নিয়ে অন্য জেলার খেলোয়াড়দের ভাবতে হয়। কারণ এখন সিলেটে সেলিব্রেটি খেলোয়াড়দের অভাব নেই। আমরা দেখিয়ে দিয়েছি আমাদের সিলেটের নবম শ্রেণির ১৫ বছরের কিশোরও বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এনাম বলেন, কিন্তু আমাদের ভাগ্য বদলায়নি। আমরা একটি জায়গায় খেলতে গেলে সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পাই না। আমাদের খেলোয়াড়রা যখন চ্যাম্পিয়ন হয়ে সিলেট ফিরে তখন জেলা ক্রীড়া সংস্থার কাছ থেকে একটা সংবর্ধনাও দেওয়া হয় না। অথচ সিলেটের ক্রীড়াঙ্গণে এখন সবচেয়ে বড় অর্জন ব্যাডমিন্টনে।’
‘পরশ। তাঁর বাড়ি বগুড়া। তিনি ছয় বারের বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন। তিনিও ছিলেন গতকাল এনামের সাথে একই মঞ্চে। বলেছেন, অনেক কিছু। সিলেটের এগিয়ে যাওয়ার গল্পও করেছেন। পরশ বলেন, ‘সিলেট এখন এগিয়ে আছে। আগে বগুড়া ও চট্টগ্রাম এগিয়ে ছিল। সিলেটের এই অবস্থান ধরে রাখতে হবে। তবেই দীর্ঘদিন ব্যাডমিন্টনে রাজত্ব করতে পারবে সিলেট। আর সেজন্য প্রয়োজন জেলা ক্রীড়া সংস্থা থেকে শুরু করে ক্রীড়াঙ্গণের সকল সংগঠন তাদের পৃষ্টপোষকতায় পাশে থাকা।’
শুধু এনাম আর পরশই নন; দুলাল, শ্যামল, কাওসারসহ সবারই মুখে ছিল একই ধরণের কথা। সবার কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে ব্যাডমিন্টনে তাদের দুঃখ গাঁথা।
বাংলাদেশের সেরা এই দুই খেলোয়াড় তাদের অনুভূতির কথা বলেছেন গতকাল মঙ্গলবার আবুল মাল আবদুল মুহিত ক্রীড়া কমপ্লেক্সে। অত্যাধুনিক এই ক্রীড়া কমপ্লেক্সে আজ থেকে শুরু হচ্ছে কাউন্সিলর আজাদ কাপ বাংলাদেশ ওপেন ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্ট। ব্যক্তি উদ্যোগে এটি দেশের সবচেয়ে বড় আসর বলেও জানিয়েছেন দেশ সেরা খেলোয়াড়েরা।
আজ থেকে শুরু হওয়া এই টুর্নামেন্ট চলবে আগামী ১৩ তারিখ পর্যন্ত। ৪০ জেলার খেলোয়াড়েরা এতে অংশগ্রহণ করবেন। তবে দেশের সেরা এবং র‌্যাংঙ্কিং খেলোয়ার ছাড়া অংশগ্রহণ করা যাবে না। নিয়মিত ও অ্যামেচার এই দুই পর্বে খেলা অনুষ্ঠিত হবে। দেশের বিভিন্ন জেলার ৭৫ জন খেলোয়ার এবং ৫ জন আম্পায়ারের আবাসন এবং খাবার সুবিধা করা হয়েছে এই টুর্নামেন্টে। খেলায় চ্যাম্পিয়নরা পাবেন ৬০ হাজার টাকা, রানার্সআপরা পাবেন ৪০ হাজার টাকা, তৃতীয় স্থান অধিকারী ১৫ হাজার, কোয়াটার ফাইনেলিস্ট ৪টি দল পাবে ২০ হাজার টাকা করে।
এছাড়া অ্যামেচারে চ্যাম্পিয়নরা পাবেন ৩০ হাজার এবং রানার্সআপরা পাবেন ২০ হাজার টাকা।
কাউন্সিলর আজাদ কাপ বাংলাদেশ ওপেন ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্টের আয়োজক কাউন্সিলর আজাদুর রহমান আজাদ বলেন, ‘খেলোয়াড়দের অগ্রযাত্রার জন্য তাঁর এই আয়োজন। সবকটি খেলা আবুল মাল আবদুল মুহিত ক্রীড়া কমপ্লেক্স অনুষ্ঠিত হবে। তিনি বলেন, দেশের ৪০টি জেলার খেলোয়াড়েরা এখানে খেলবেন। সবার সহযোগিতায় আগামীতেও এই টুর্নামেন্ট চালিয়ে যাওয়া হবে। তিনি সকরের সহযোগিতা কামনা করেছেন।’
এদিকে সিলেটের অর্জনে চোখ রাখলে দেখা যায়, ২০১৪ সালে জাতীয় ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপের ৩৩তম আসরে দ্বৈত চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন সিলেটের রাহাত কবির ও সালেহ আহমদ শ্যামল। রানার্সআপ হন সিলেটের এবাদুল হক চৌধুরী সুহেল ও জয়নাল আবেদীন। এছাড়া এককে রানার্সআপ হন সিলেটের এনামুল হক এনাম।
গত এশিয়ান গেমসে (এসএ গেমস) ব্যাডমিন্টনে বাংলাদেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছেন সাতজন। তাদের তিনজনই হচ্ছেন সিলেটের! ওই তিনজন হচ্ছেন এনামুল হক এনাম, রাহাত কবির খালেদ ও জামিল আহমদ দুলাল। জাতীয় ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপের ৩৪তম আসরে দ্বৈতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন সিলেটের জামিল আহমদ দুলাল ও রাহাত কবির খালেদ। এ প্রতিযোগিতায় রানার্সআপও সিলেটের জনপ্রিয় জয়নাল-সুহেল জুটি। এ বছর পুরুষ এককে রানার্সআপ হয়েছেন সিলেটের এনামুল হক এনাম। মিশ্র দ্বৈতে রানার্সআপ হয়েছেন সিলেটের খালেদ-মৌলি জুটি।
জুনিয়র চ্যাম্পিয়নশিপের দ্বৈততে সিলেটের খাইরুল ইসলাম অপু ও সুজন আহমেদ পড়েছেন বিজয়মাল্য। এছাড়া এককে রানার্সআপ হয়েছেন খাইরুল ইসলাম অপু।
অনূর্ধ্ব-১৫ ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপের এককে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন সিলেটের হানিফ আলম। সিলেটের গৌরব সিংহ ও মাইমম মাঙ্গালা এ চ্যাম্পিয়নশিপের দ্বৈততে হয়েছেন চ্যাম্পিয়ন। এ চ্যাম্পিয়নশিপের মেয়েদের প্রতিযোগিতায় সিলেটের লাবণী বেগম হয়েছেন রানার্সআপ। তাছাড়া জাতীয় স্কুল-মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড শীতকালীন ক্রীড়া প্রতিযোগিতায়ও মেয়েদের মধ্যে চ্যাম্পিয়ন হন এই লাবণী।
এছাড়া এবারের সামার ওপেন (র‌্যাংঙ্কিং) ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্টে সিলেটের গৌরব সিং এককে চ্যাম্পিয়ন এবং তারই চাচাত ভাই মাঙ্গাল সিং রানার্সআপ হয়।