সিলেটে টেস্টের রাজকীয় অভিষেক

25

হাসান মো. শামীম
সিলেটের ইতিহাসের প্রথম টেস্ট ম্যাচের তখন ৪৮ তম অভার। মাত্রই তৃতীয় উইকেট হারিয়েছে জিম্বাবুয়ে। নতুন ব্যাটসম্যান হিসেবে ক্রিজে এসেছেন মুর। বোলার নাজমুল ইসলাম অপু। শান্ত স্নিগ্ধ সময়টায় হঠাৎ করে আলোড়ন। কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করে এক ক্ষুদে দর্শক ইস্টার্ন গ্যালারি থেকে ভো-দৌড়ে তখন একেবারে মাঠের ভিতরে! তারপর এক দৌড়ে মুশফিকের বুকের ভেতর। তার পেছনে দুজন মাঠের নিরাপত্তা কর্মী। কি হচ্ছে তা বুঝতে একটু সময় লাগলেও শিশু সাপোর্টারকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন মুশফিক। নিরাপত্তাকর্মীদের অনুরোধ করলেন কিছু না করার জন্য। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা যখন বাচ্চাটিকে নিয়ে বের হচ্ছিলেন তখন তার চোখে ভয়ের বদলে ছিলো উচ্ছ্বাস,তৃপ্তি। স্বপ্নের নায়ককে ছুয়ে দেখার আনন্দ। যখন গ্যালারির পাশ দিয়ে বাউন্ডারি লাইন ধরে শিশুটিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল দর্শকরা তখন তাকে এক নজর দেখতে গ্যালারি ধরে ছুটছিলেন তার সাথে।
নিস্তরঙ্গ ম্যাচে ওই সময়টুকুতে উঠেছিল একটু ঢেউ। সারাদিনে এরকম ক্ষণে ক্ষণে উঠা কৌতূহল আর অজানাকে জানার মাঝেই ধুপ করেই অভিষেক হলো সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামের। টেস্টের আঙিনায় দেশের অষ্টম ভেন্যু হিসেবে জন্মের দিনে সিলেট যেন ভালবাসা ছড়ালো সর্বত্র। সকাল থেকে মাঠে আসা দর্শকরা সারাদিন অকুন্ঠ চিত্তে গেয়ে গেলেন বাংলাদেশের গান। টস ভাগ্যে হেরে বোলিং করা বাংলাদেশকে সারাদিন লাগাতার চিৎকার করে সাপোর্ট দিয়েছেন সিলেটের আবেগী দর্শকরা। এরমধ্যে প্রেস বক্সে এসে অন্যরকম আবেগ ছড়ালেন সাবেক জাতীয় অধিনায়ক রাজিন সালেহ। নব্য টেস্ট ভেন্যুতে এসে জানিয়ে দিলেন নিজের অবসরের কথা। সব ধরনের ক্রিকেট থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিলেন সিলেটের সাবেক এই টেস্ট ক্রিকেটার। সিলেটের শুরুর দিনে সারা হলেন রাজিন। ভালোবাসাময় আবেগ যেন ছুয়ে যাচ্ছিল সর্বত্র।
কার্তিক মাসের অনিন্দ্য সুন্দর আকাশ মাথায় নিয়ে শুরু হয়েছিল সিলেট টেস্টের প্রথম দিন। সকালটাই যেন ছিল অন্যরকম। ম্যাচ শুরুর আধ ঘন্টা আগে থেকেই স্টেডিয়াম অভিমুখে দর্শকদের দীর্ঘ সারি। বেলা বাড়ার সাথে সাথে বাড়ছিল কলেবর। ইতিহাসের সাক্ষী হতে ব্যানার ফেস্টুন প¬্যাকার্ড নিয়ে মাঠে এসেছিলেন সিলেটের ক্রিকেটপ্রেমীরা। আশা ছিল, প্রথম দিনেই বাংলাদেশের ব্যাটিং উপভোগ করবেন সবাই। তবে জিম্বাবুয়ে টসে জিতে ব্যাটিং এর সিদ্ধান্ত নেওয়াতে সে আশা প্রথম দিন আর পূর্ণ হয়নি। ম্যাচে একমাত্র পেসার হিসেবে খেলা সিলেটের ছেলে রাহী করেন সিলেটের মাটিতে হওয়া প্রথম টেস্টের প্রথম বল। তবে প্রথম উইকেট নেন স্পিনার তাইজুল। তবে সিলেটে প্রথম দিনটা প্রায় সমানই। নিচু বাউন্স আর ধীরগতির উইকেটে জিম্বাবুইয়ান ব্যাটসম্যানরা বাংলাদেশি বোলারদের সামলেছেন ভালোভাবেই, যার নেতৃত্ব দিয়েছেন উইলিয়ামস। রান উঠেছে ২.৫৯ হারে, তবে ধসের শঙ্কা দূরে ঠেলে ৫টির বেশি উইকেট হারায়নি তারা। শুরুটা ভালোই করছিলেন জিম্বাবুয়ের দুই ওপেনার। হ্যামিল্টন মাসাকাদজা ও ব্রায়ান চারি শুরুর কয়েকটা ওভার দেখে খেলার পর হাত খুলে খেলতে শুরু করেছেন। তারপরও প্রথম উইকেটটা উপহারই পেয়েছে বাংলাদেশ। তাইজুলের সোজা বলটা যেভাবে ইচ্ছা খেলতে পারতেন চারি, কিন্তু লাইন মিস করে স্লগ সুইপ খেলতে গিয়ে হয়ে গেলেন বোল্ড। উইকেটটা বিলিয়ে দিয়ে এলেন আনলাকি থার্টিনেই, প্রথম উইকেট পেলেন তাইজুল। মাসাকাদজা অবশ্য স্বচ্ছন্দই ছিলেন, তাইজুলের এক ওভারে মেরেছেন চার-ছয়ও।
লাঞ্চের পর প্রথম ওভারেই আবু জায়েদের ভেতরের দিকে তীক্ষèভাবে ঢোকা বলে এলবিডবি¬উ হ্যামিল্টন মাসাকাদজা। প্রথম সেশনে জিম্বাবুয়েকে চেপে ধরার ইঙ্গিতটা দ্বিতীয় সেশনের শুরুতেই জোরালো হলো আরও। শন উইলিয়ামস বাধা হয়ে দাঁড়ালেন, সিকান্দার রাজার পর সঙ্গী হিসেবে তিনি পেলেন পিটার মুরকে। চা-বিরতির পরপরই আবার জায়েদের তীক্ষè মুভমেন্ট, আম্পায়ার আউটও দিলেন মুরকে। তবে রিভিউয়ে বদলাল সে সিদ্ধান্ত। মাহমুদউল¬াহ এসে ফেরালেন উইলিয়ামসকে, তবে তার আগেই ৮৮ রানের ইনিংসে তিনি নিশ্চিত করেছেন, প্রথম দিনটা শুধুই বাংলাদেশের হচ্ছে না। রেজিস চাকাভাকে নিয়ে শেষবেলাটা নিরাপদেই কাটিয়ে দিলেন ১২২ বলে ৩৭ রান করা মুর। বাংলাদেশের তিন স্পিনার বা আবু জায়েদ বের করতে পারলেন না সেই মোক্ষম অস্ত্রটাই,যা ছিঁড়েফুঁড়ে দিতে পারে জিম্বাবুয়েকে।
তবে দিনের সেরা মুহূর্তটি এসেছে টেলর-মাসাকাদজা জুটির ১২ রানের মাথায়। তাইজুলের ভেতরের দিকে ঢোকা বলটা ডিফেন্ড করতে গিয়েছিলেন টেলর, ব্যাটের কানায় লেগে শর্ট লেগে চলে যায়। মাঠে তখন উড়ছিল অনেক চিল, সেই চিলের মতোই ছো মেরে এক হাতে বলটা মুঠোয় নিয়ে নিলেন অনেক দিন পর টেস্ট দলে ফেরা নাজমুল হোসেন শান্ত। ৪৭ রানে দ্বিতীয় উইকেট হারিয়েছে জিম্বাবুয়ে। মাসাকাদজাকে হারানোর চাপটা এরপর ধীরে ধীরে সামাল দিয়ে গেছেন উইলিয়ামস। প্রথম সেশনের মতো দ্বিতীয় সেশনেও তাদের রানের গতি ছিল মন্থর। লাঞ্চের পর প্রথম ওভারে আবু জায়েদ পাচ্ছিলেন সিম মুভমেন্ট, মাসাকাদজা ফিরলেন তাতেই। তবে জিম্বাবুয়েকে এরপরও চেপে ধরা হলো না ঠিক বাংলাদেশের। সিকান্দার রাজা সঙ্গ দিলেন উইলিয়ামসকে, তিন স্পিনার এলেন ঘুরেফিরে। সফল হলেন অভিষিক্ত নাজমুল। তার অ্যাঙ্গেল করা বলে রাজার ডিফেন্সের অবস্থা থাকলো যাচ্ছেতাই, ব্যাট-প্যাডের ফাঁক গলে প্যাড ঘুরে বল গেল স্টাম্পে। টেস্টে প্রথমবার নাগিন-ড্যান্স দেখাতে পারলেন নাজমুল। রাজার উইকেটের পর বেশ আঁটসাঁট বোলিং করলেন স্পিনাররা, মিরাজ ও অপু মিলে করলেন টানা চার মেইডেন। পিটার মুর থাকলেন, ততক্ষণে চালু করেছেন তার রক্ষণাত্মক মোড। উইলিয়ামস ছিলেন পুরোনো মেথডেই, বাজে ডেলিভারি করলে সেগুলোকে রেহাই দেননি তিনি। শর্ট বা ওয়াইড-সেগুলোর স্কোরিং সুযোগ মিস করেননি সেভাবে। চা-বিরতির এক ওভার আগে পূর্ণ করেছেন ফিফটি। ঝুঁকি নেননি সেভাবে, আগলে রেখেছেন উইকেট। শেষ সেশনে ফিরেছেন অন্য ভঙিমায়।
তাইজুলকে কাট করে চারের পর ফুলটসে মারলেন ছয়, খোলস ছেড়ে বেড়িয়ে এলেন মুরও। তবে খুব বেশি সময়ের জন্য নয়। সেঞ্চুরিটা নাগালের মধ্যে চলে আসার পরই ‘পার্ট-টাইমার’ মাহমুদউল¬াহর বাড়তি বাউন্সে ভড়কে গেলেন উইলিয়ামস। ১৭২ বল ব্যাটিংয়ের পরও শট খেলে ফেললেন আগেভাগে, তার আউটসাইড-এজটা স্লিপে বাঁদিকে ঝাঁপিয়ে দারুণভাবে নিলেন মিরাজ।
বাংলাদেশের তিন স্বীকৃত স্পিনার মিলে করলেন ৬৭ ওভার। আরিফুল হকের অভিষেক হলো, তবে তিনি করলেন মোটে ৪ ওভার। বাড়তি ১ ওভারও হলো, শুধু দিনে জিম্বাবুয়ের ওপর একহাত দিয়ে রাখা হলো না বাংলাদেশের। আজ দ্বিতীয় দিন বদলাবে কি সেই চিত্রটা?
ম্যাচ শেষে বাংলাদেশ দলের পেসার আবু জায়েদ রাহীর কাছে ক্ষুদে দর্শকের ঘটনা নিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল। রাহী হাসতে হাসতে বললেন, হঠাৎ করে খানিকটা ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলেন মুশফিক। বাংলাদেশের দলের খেলার মাঝে দর্শক ঢুকে পড়ার ঘটনা নতুন কিছু নয়। নিরাপত্তার বজ্র আঁটুনির মধ্যেও মাঝে মধ্যে ফস্কা গেরো হয়ে যায়। দুই বছর আগে আফগানিস্তানের বিপক্ষে সিরিজে হুট করে মাঠে ঢুকে পড়েছিলেন এক দর্শক, মাশরাফি বিন মুর্তজাকে বেঁধেছিলেন আলিঙ্গণে। সে সময় মারমুখো নিরাপত্তারক্ষীদের নিরস্ত করে মাশরাফি নিজেই মাঠ থেকে করে দিয়েছিলেন ওই দর্শককে। সিলেটে প্রথম টেস্ট উপলক্ষে এমনিতেই নিরাপত্তার কড়াকড়ি ছিল বেশি। মাঠের চারদিকও নিরাপত্তা প্রাচীরে ঘেরা। কিন্তু তার মধ্যেই কীভাবে কীভাবে যেন ফুটো খুঁজে বের করে ফেলে ওই শিশু । মাঠের ভেতরে ঢুকেই দে ছুট মুশফিকের দিকে। হঠাৎ করে হয়ে যাওয়ায় ঘটনার আকস্মিকতায় চমকে গিয়েছিলেন মুশফিক। লাফও দিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু খানিক পরেই বুঝতে পেরে জড়িয়ে ধরেছেন ওই কিশোরকে। মুশফিকের মুখে তখন হাসি, পাশ থেকে হাসছেন লিটন ও রাহীও। পরে অবশ্য নিরাপত্তারক্ষীরা এসে মাঠ থেকে বের করে নিয়ে গেছেন ওই কিশোরকে। ওভার বিরতির সময় হওয়ায় সরাসরি সম্প্রচারেও ঘটনাটা দেখানো হয়নি। ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে রাহী বলেছেন, ‘মুশফিক ভাই বলেছে আমি তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম রে। ও যখন ঢুকছে আমি দেখছি ছেলেটা দৌড়ে আসছে। আমি মুশফিক ভাইকে কী বলব খুঁজে পাচ্ছিলাম না। মুশফিক ভাইয়ের কাছে আসছিল, না মিরাজের কাছে আসছিল সেটাও আমি বুঝতে পাছিলাম না। মুশফিক ভাই শুধু একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিল।’মুশফিক হাসলেও এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়, এতো নিরাপত্তার মধ্যেও কেউ মাঠে ঢুকে পড়তে পারে। বিসিবির নিরাপত্তাবিভাগের জন্য এমন ঘটনা অশনী সংকেতও বটে।
এর আগে আয়োজকদের কথা মতোই সিলেট টেস্টে ঘণ্টা বাজানোর সম্মান পেলেন বাংলাদেশ দলের সাবেক অধিনায়ক আকরাম। এসময় তাঁর সাথে ছিলেন বাংলাদেশ দলের সাবেক পেসার শান্তও। শুধু ঘণ্টা বাজানোই নয়, সিলেটের অভিষেক টেস্টকে কেন্দ্র করে নেওয়া হয় আরও বেশ কিছু উদ্যোগ। সিলেট বিভাগের সাবেক ক্রিকেটারদের জন্য বিশেষ সম্মাননার ব্যবস্থা করা হয়। দু’দলের খেলোয়াড়দের জন্য বিশেষ স্মারক উপহার। এ ছাড়া ম্যাচের টসটিও হয় বিশেষ একটি মুদ্রায়। সব মিলিয়ে, আয়োজনের আতিশয্য নিয়ে তৈরি নয়নাভিরাম সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামের রাজকীয় টেস্ট অভিষেক হলো।