টেস্ট ব্যাটিং ভুলে গেছে বাংলাদেশ!

10

হাসান মো.শামীম
মানুষের শরীর যেমন মাঝে মাঝে অসুস্থ হয়,বাংলাদেশের ব্যাটিংটাও ঠিক তেমনি মাঝে মাঝে রোগাক্রান্ত হয়। সুস্থ থাকতে থাকতে যেন হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে উঠা। পার্থক্য হলো মানুষ এক সময় সুস্থ হয়, কিন্তু বাংলাদেশের অসুস্থতা যেন ছাড়ছেই না। ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত মানুষের স্মৃতি শক্তি যেমন লোপ পায় বাংলাদেশও ঠিক তেমনি ভুলে গেছে ব্যাটিং। উইকেটে বাংলাদেশের অসহায় রুপ আর আউট হওয়ার ধরনে মনে হয় বিশ্ব সেরা বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে খেলছে লাল সবুজের প্রতিনিধিরা। কিংবা পিচ হয়ে গেছে ইংল্যান্ড আফ্রিকার পিচের মু ব্যাটসম্যানদের বধ্যভূমি। সিলেটের অভিষেক টেস্টের ২য় দিনে মাত্র ৫১ ওভার ব্যাট করতে পেরেছে বাংলাদেশ। জিম্বাবুয়ে বোলারদের মারাত্মক বোলিংয়ের বিপক্ষে এই ৫১ ওভারে এসেছে মাত্র ১৪৩ রান। অথচ সদ্য সমাপ্ত ওয়ানডে সিরিজে এই ৫০ ওভারে গড়ে এসেছে প্রায় ২৭০ এর মু। কিন্তু রঙিন পোশাক ছেড়ে সাদা পোশাকে এলেই যেন খেই হারিয়ে ফেলে রিয়াদ বাহিনী। টেস্টে বাংলাদেশের এই ব্যাটিং ভুলে যাওয়া অবশ্য খুব একটা নতুন কিছু নয়। টেস্টে প্রায় নিয়মিুই ব্রেন ফেড হচ্ছে টাইগার ব্যাটসম্যানদের।

পরিসংখ্যান ঘেটে দেখা যাচ্ছে টেস্টে এ নিয়ে টানা ৭ম ইনিংসে ১৭০-এর নিচেই গুটিয়ে গেছে বাংলাদেশ! এ বছরের শুরুতে চট্টগ্রামে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৫১৩ রান করার পর এখনও ১৬৮-এর বেশি এক ইনিংসে করা হয়নি বাংলাদেশের। এমনকি এসময়ের ভেতর মাত্র ৪৩ রানেও অল আউট হওয়ার রেকর্ড আছে বাংলাদেশের। এর ফলে খেলা দেখতে সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামের দর্শকদেও খেলা ভুলে বিনোদন খুঁজে নিতে হয় কুকুরের কাছে। ভুল পড়ছেন না। প্রথম দিনে নিরাপত্তার ফাঁক গলে কিশোর সমর্থকের ঢুকে পড়ার পর কাল মাঠে ঢুকে পরেছিল দিগভ্রান্ত এক সারমেয়। বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের সময় হঠাৎ দুপুর ১টা ১৫ মিনিটে দেখা যায় দুই পক্ষের খেলোয়াড়েরা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছেন। আম্পায়াররাও নির্বিকার। খেলা বন্ধ করে সবার দৃষ্টি একদিকে। এমন সময় ক্যামেরার চোখ খুঁজে পেল এমন পরিস্থিতির কারণ। মাঠে ঢুকে পড়েছে একটি কুকুর। গ্যালারি ভর্তি দর্শকের চিৎকারে উদভ্রান্ত প্রাণীটি কোন দিকে যাবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না। ছুটোছুটি করছিল এদিক-সেদিক। এমন সময় ফিল্ডিং করা জিম্বাবুয়ের খেলোয়াড় কুকুরটিকে তাড়া করে বাউন্ডারির বাইরে বের করে দেন। এরপর আবারো শুরু হয় খেলা। তবে টানা দুই দিনে সিলেটের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এমন ত্রুটি প্রশ্নবিদ্ধ করে দিয়েছে বিসিবি ও স্থানীয় ক্রীড়াঙ্গনকেও।

সিলেটের মাটিতে প্রথম টেস্ট, উইকেট নিয়েও খানিকটা রহস্য হয়তো ছিল তবে কন্ডিশনটা তো একেবারে অচেনা নয়। তবুও এ্মন কন্ডিশনে ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ল বাংলাদেশ। প্রথম ইনিংসে ১৪৩ রানে অল-আউট হয়ে, জিম্বাবুয়েকে ১৩৯ রানের লিড দিয়ে দ্বিতীয় দিনশেষে চরম অস্বস্তিতে তারা।

টেস্টের মাত্র ২য় দিনে পড়েছে ১৫ উইকেট, এর মাঝে ১০টিই বাংলাদেশের। টেনডাই চাতারা ও সিকান্দার রাজা মূল ক্ষতিটা করেছেন, সঙ্গে ছিলেন কাইল জারভিস। অভিষিক্ত আরিফুল হকের ৪১ রানের ইনিংসই যা উজ্জ্বল দিক, এগিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েও শেষ করতে পারেননি মুশফিকুর রহিম। সব মিলিয়ে দিনের দারুণ শুরুটা মিলিয়ে গেছে দিনশেষে, যেখানে তাইজুলের তোপে দ্রুতই গুটিয়ে গিয়েছিল জিম্বাবুয়ে। সাড়ে তিন বছর পর টেস্টে পাঁচ উইকেট পেলেন তাইজুল ইসলাম। সিলেট টেস্টে তার পঞ্চম শিকার কাইল জার্ভিস। তাইজুলের বাঁহাতি স্পিন বোলারের মাথার ওপর দিয়ে উড়াতে চেয়েছিলেন জার্ভিস। ঠিক মতো শট খেলতে পারেননি। ব্যাটের কানায় লেগে ক্যাচ যায় স্লিপে মেহেদী হাসান মিরাজের কাছে। আর এর পরের বলেই চাতারাকে লিটনের ক্যাচে পরিণত করিয়ে ২য় ইনিংসে হ্যাট্ট্রিকের আশা জমিয়ে রেখেছেন এই বাহাতি স্পিনার। অবশ্য এই সুযোগটা যে এণ তাড়াতাড়ি পেয়ে যাবেন তা হয়তো নিজেই ভাবেননি তাইজুল।

আগেরদিন স্নায়ুর দারুণ পরীক্ষা দেওয়া জিম্বাবুয়ে সকালে যোগ করতে পেরেছে ৪৬ রান। সকাল গড়াল, দুপুর এলো যেন বিভীষিকা হয়ে। সিলেটের উইকেট শুষ্ক, র্টানের আভাসও মিলছে খানিক পরপরই। তবে ঠিক চ্যানেলটা খুঁজে পেলে সিম বোলিং যে এখানে দারুণ কার্যকর, সেটাই দেখালেন চাতারা ও জারভিস। আর সিকান্দার রাজা এসে দেখালেন, বড় টার্ন দরকার নেই,খুজে পেতে হবে ঠিক জায়গাটা।

শুরুটা হয়েছিল ইমরুলকে দিয়ে। চাতারার ব্যাক অফ আ লেংথ থেকে লাফিয়ে ওঠা বলে আগ বাড়িয়ে খেলতে গিয়ে বল ডেকে এনেছেন স্টাম্পে, ১৯ রানে ৪র্থ ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হওয়ার সময় মোটামুটি একই কাজ করেছেন অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহও, কোনো রান না করেই। এর মাঝে লিটন লিটন জারভিসকে, শান্ত চাতারাকে শরীর থেকে দূরে পা না চালিয়ে খেলতে গিয়ে মূল্য দিয়েছেন। বাংলাদেশ এরপর সিলেটের চা-বাগানকেই নিজেদের জন্য বানিয়ে ফেলেছে গহিন জঙ্গল। মুশফিক-মুমিনুল ধৈর্যেও পরীক্ষা দিচ্ছিলেন কিছু সময়ের জন্য। ৩০ রানের জুটির পর রাজার সেটআপে ধরা পড়লেন মুমিনুল, ড্রিফটে সামনের পায়ে আসলেন, আউটসাইড-এজ গেল স্লিপে। চা-বিরতির পর এক বাউন্ডারির পরই ধরা খেলেন মুশফিকও, জারভিসের ব্যাক অফ লেংথে নিজেকে সামলাতে না পেরে দিলেন খোঁচা। এর আগে স্ট্যাম্পে মুশফিকের পা লক্ষ্য করে অনবরত বল করে গেছেন জারভিস। লাইনে অভ্যস্থ করে হঠাৎ করে অফস্ট্যাম্পের বাইরের বলে খোচা লাগিয়ে যেন পাতা ফাঁদেই ধরা পড়লেন মুশি।

এরপর মেহেদিকে নিয়ে লড়াই করলেন আরিফুল। নির্বাচকরা নাকি তাকে দ্রুত রান তোলার জন্য নিয়েছিলেন, তবে তাকে পালন করতে হলো সম্পূর্ণ ভিন্ন দায়িত্ব। বাকি সব ব্যাটসম্যানের চেয়ে বেশি দায়িত্বশীল ছিলেন তিনিই, টেম্পারমেন্টও ছিল দারুণ। শেষ পর্যন্ত অপরাজিণ ছিলেন ৪১ রানে, ভুল বুঝাবুঝিতে শেষ ব্যাটসম্যান রাহী রান-আউট না হলে হয়তো বাংলাদেশের ক্ষতিটা আরেকটু কমাতে পারতেন তিনি। এর আগে মিরাজ ফিরেছেন বেশি সফট ডিসমিসালে, উইলিয়ামসের বলে লিডিং এজে ফিরতি ক্যাচ দিয়ে। তাইজুল রাজার দ্বিতীয় শিকার, এবারও অফস্পিনে বাঁহাতিকে বাধ্য করেছেন খোঁচা দিতে। আর নাজমুল রাজার বল পর্যন্ত পৌঁছাতে না পেরে সিলি পয়েন্টে দিয়েছেন ক্যাচ। সকালে আরিফুলের জায়গায় নিজেকে আবিষ্কার করেছিলেন পিটার মুর। রেজিস চাকাভার সঙ্গে ১০ ওভার পার করে ফেলেছিলেন, প্রথম স্পেলে বল করতে এসে তাইজুলের আঘাতের আগে। এবারও উইকেটের অর্ধেক কৃতিত্ব শান্তর, শর্ট লেগে আবারও দারুণ রিফ্লেক্সে ক্যাচ নিয়েছেন তিনি।

অভিষিক্ত ওয়েলিংটন মাসাকাদজা তাইজুলের অফ স্টাম্পের ঠিক বাইরের বলটা খোঁচা দিলেন, এর মধ্যে স্পিন শুরু হয়ে গেছে দুই দিক দিয়েই, নাজমুল ইসলাম অপু আবার এনে দিয়েছেন উদযাপনের উপলক্ষ। সোজা বলে ডিফেন্স করতে গিয়ে এলবিডব্লিউ মাভুতা। বড় শট খেলতে গিয়ে স্লিপে ক্যাচ দিয়েছেন জারভিস, পরের বলেই চাতারা সিলি মিড অফে ক্যাচ দিলেন লিটনকে, তাইজুলের হলো ছয়টি উইকেট। আর ৬৩ রান করে একা পড়ে রইলেন পিটার মুর। জিম্বাবুয়ে হয়তো তখন ইনিংসটা আরেকটু বড় না করার আক্ষেপে পুড়ছে। তবে সেটাই তাদের এনে দিল ১৩৯ রানের লিড। আগের দিন সমান-সমান ছিল। এদিন পরিষ্কার ব্যবধানে এগিয়ে থাকলো জিম্বাবুয়ে। আর বাংলাদেশের সামনে থাকলো অনেক কঠিন এক কাজ। আজ ম্যাচে ফিরতে হলে যত অল্প রানে সম্ভব জিম্বাবুয়েকে অল আউট করতে হবে। তারপর প্রথম ইনিংসের ভুল শুধরে করতে হবে দায়িত্বপূর্ন ব্যাটিং। না হলে বাংলাদেশের প্রতিটি স্টেডিয়ামের অভিষেকে জয় না পাওয়ার রেকর্ডটি আরেকটু বড়ই হবে শুধু।

দ্বিতীয় দিনশেষে

জিম্বাবুয়ে ১ম ইনিংস ১১৭.৩ ওভারে ২৮২ (উইলিয়ামস ৮৮, মুর ৬৩*; তাইজুল ৬/১০৮) ও ২য় ইনিংস* ১/০

বাংলাদেশ ১ম ইনিংস ১৪৩ (আরিফুল ৪১, মুশফিকুর ৩১, চাতারা ৩/১৯, রাজা ৩/৩৫)

জিম্বাবুয়ে ১০ উইকেট নিয়ে ১৪০ রানে এগিয়ে