ক্ষমতার দাপটে বেপরোয়া মুহুরি হাসনাত

1440

সদর সাব রেজিস্ট্রারের নিরাপত্তা দেবে কে?

সৈয়দ বাপ্পী
সিলেট বিভাগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অফিস সিলেট সদর সাব রেজিস্ট্রার অফিস। কিন্তু বিভাগীয় সদরের এই সাব রেজিস্ট্রি অফিসে কোনো সাব রেজিস্ট্রার আসতে চান না। এমনকি বদলি সাব রেজিস্ট্রারও আসতে ভয় পান।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সিলেট সদর সাব রেজিস্ট্রার অফিস এখন একটি দালাল ও জালিয়াত চক্রের নিয়ন্ত্রণে। এই চক্র ভলিয়ম বা বালামের পাতা বদল, জাল দলিল সৃষ্টিসহ বিভিন্ন ধরনের জালিয়াতি ও অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। এই চক্রটি তাদের কথামত দলিল সম্পাদন না করলে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের দিয়ে সাব রেজিস্ট্রারসহ অফিসের অন্য কর্মকর্তাদের নানা ধরনের হুমকি দিয়ে আসছে। এমনকি প্রতিটি দলিল সম্পাদনে তাদেরকে নির্দিষ্ট পরিমানের চাঁদা দিতে হয়। শুধু রেজিস্ট্রার অফিসই নয়, এর আশপাশ এলাকাও নিয়ন্ত্রণ করছে এই চক্রটি। এতে সাধারণ মানুষ, দলিল লেখক ও অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারিরা তাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। সাব রেজিস্ট্রারসহ কর্মচারিরা রয়েছেন নিরাপত্তাহীনতায়।

জানা যায়, এই চক্রের নেতা জনৈক আবুল হাসনাত। আবুল হাসনাত ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতা ও সিলেট সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আশফাক আহমদের অতি ঘনিষ্ঠ জন বলে নিজেকে দাবি করে আসছেন। তিনি নিজেকে সদর উপজেলা যুবলীগের প্রভাবশালী নেতা বলেও দাবিদার। তবে উপজেলা চেয়ারম্যান আশফাক আহমদ বলেন, হাসনাতকে আমি চিনি না। আমার সাথে অনেকেই ছবি তুলে। আজকেও আমার সাথে প্রায় ৩শ’ লোক ছবি তুলেছে। আমার নাম ব্যবহার করে কেউ কোনো অপকর্ম করার প্রমান পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেব। ইতোমধ্যে ক্ষমতার প্রভাব খাঁটিয়ে সিলেট জেলা সদর সাব রেজিস্ট্রার দলিল লেখক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক পদেও অধিষ্টিত হয়েছেন।

জমি দখল, মাটি চুরি করে বিক্রি, মাদক বিক্রি, জাল দলিল তৈরিসহ বিভিন্ন অপরাধে অর্জিত কোটি টাকার মালিক হাসনাত খাদিমপাড়া ইউনিয়ন তথা আশপাশ এলাকার দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি। মাদকের মামলা, জাল দলিলের মামলা, বালাম জালিয়াতির মামলাসহ বহু অপকর্মের হোতা হাসনাতের ক্ষমতার কাছে পুলিশসহ স্থানীয় প্রশাসনও ধরাশায়ী। হাসনাতের সকল অপকর্মের বিস্তারিত পরবর্তিতে পর্যায়ক্রমে পাঠকের কাছে তুলে ধরা হবে।

তবে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে সিলেট সদর সাব রেজিস্ট্রার অফিসে ঘটে যাওয়া ঘটনায় অচল হয়ে পড়ে সদর সাব রেজিস্ট্রার অফিস। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে সদরে একটি দলিল সম্পাদন হয়। হাসনাতের কথামত দলিল সম্পাদন না হওয়ায় সিলেট সদর সাব রেজিস্ট্রারের কাছে সে কৈফিয়ত চায়। এ নিয়ে অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের সাথে বাকবিতন্ডায় লিপ্ত হয় হাসনাত।

আবুল হাসনাত সিলেট সদরের বদলি সাব রেজিস্ট্রার মো. সহিবুর রহমান প্রধানকে একটি দলিল সম্পাদন না করতে বলে। বেলা ১টার দিকে সেই দলিলের সব কাগজপত্র ঠিক থাকায় দলিলে স্বাক্ষর করেন সাব রেজিস্ট্রার। তাই দলিল সম্পাদন হওয়ায় দুপুর ২টায় আবুল হাসনাত তার দলবল নিয়ে সাব রেজিস্ট্রার মো. সহিবুর রহমান প্রধানের উপর হামলার চেষ্টা করে এবং কেরানির কাছ থেকে টাকা ছিনিয়ে নেয়। এসময় সাব রেজিস্ট্রার পরে আশপাশে থাকা মুহুরিরা এর প্রতিবাদ করেন এবং রেজিস্ট্রারি অফিসে প্রবেশদ্বার বন্ধ করে দেন। এতে স্বাভাবিককর্ম এবং দলিল সম্পাদন বন্ধ হয়ে যায়। একপর্য়ায়ে দলিল করতে আসা লোকজন ও উত্তেজিত মুহুরিরা হাসনাতকে ধাওয়া করলে তার দলবল নিয়ে পালিয়ে যায়। পরে আর কোনো দলিল সম্পাদন না করেই নিরাপত্তাজনিত কারনে বদলি সাব রেজিস্ট্রার অফিস ত্যাগ করেন।

সম্প্রতি মোমিনখলা মৌজার জায়গা সংক্রান্ত একটি দলিলের বালাম তৈরি করা হয়। এই বালামের একটি পাতা বদলি করে অন্য একটি পাতা তৈরি করে একটি দলিল বালামের অন্তর্ভুক্ত করে এই আবুল হাসনাত। বর্তমানে এই বালাম অডিট কমিটি দিয়ে তদন্ত চলছে।

জানা যায়, আবুল হাসনাত তার দালাল বাহিনী দলিল রেজিস্ট্রারিকারীদের কাছ থেকে অবৈধভাবে হাতিয়ে নেয় মোটা অঙ্কের টাকা। ২০১৫ সালে জাল দলিল সম্পাদন করার অভিযোগে আবুল হাসনাতের দলিল লেখক সনদ বাতিল করা হয়।

গাব রেজিস্ট্রি অফিসে কর্মরত একাধিক মুহুরি জানান, দলিল লেখক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল হাসনাত বহিরাগত সন্ত্রাসীদের নিয়ে সাব রেজিস্ট্রার অফিসে মুহুরিদের কাছ থেকে সাপ্তাহিক চাঁদা আদায় করে। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে মারধর করে। এমনকি মামলায়ও ঢোকায়। সাব রেজিস্ট্রার অফিসের কিছু অসাধু কর্মচারিদের ম্যানেজ করে ও ক্ষমতাসীন দলের একাধিক নেতার ছত্রছায়ায় আবুল হাসনাত এসব বেআইনি কার্যক্রম অবাধে চালিয়ে যাচ্ছে।

তবে এ সকল অভিযোগ অস্বীকার করে সিলেট জেলা সদর সাব রেজিস্ট্রার দলিল লেখক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল হাসনাত বলেন, গত কদিন থেকে স্থানীয় পত্রিকায় সদর সাব রেজিস্ট্রার অফিসের দুর্নীতি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করা হচ্ছে। আমরা ক’জন গিয়েছিলাম বিষয়টি সাব রেজিস্ট্রারকে জানাতে। মোমিনখলা মৌজার জায়গা সংক্রান্ত বিষয় ও দলিল লেখক সনদ বাতিল প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলে তিনি তা এড়িয়ে যান।

এ ব্যাপারে সাব রেজিস্ট্রার মো. সহিবুর রহমান প্রধান বলেন, ‘দীর্ঘ দিন ধরে সিলেট সদর উপজেলা সাব রেজিস্ট্রার অফিসের দুর্নীতি-অনিয়ম করে আসছে একটি চক্র। এই দালাল চক্রের মূল হোতা হলেন-সিলেট জেলা সাব রেজিস্ট্রার দলিল লেখক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল হাসনাত। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে আবুল হাসনাত তার দলবল নিয়ে অফিসে এসে আমাকে বলে, একটি দলিল আসবে, সেই দলিল যেন সম্পাদন না করি। পরে বেলা দেড়টায় সেই দলিল আসে। আমি কাগজপত্র সবঠিক দেখে দলিল সম্পাদন করি। আর এই দলিল সম্পাদন করার কারণে আবুল হাসনাত তার দলবল নিয়ে আমাকে হুমকি দেয়। পরে আশপাশে থাকা মুহুরিরা তাদের প্রতিহত করলে তারা চলে যায়।