মধ্যপ্রাচ্যগামী নারীদের পুঁজি ‘কাইফা হালুকা’

185

সৈয়দ বাপ্পী
ন্যূনতম লেখাপড়া না জেনেই সিলেটের দরিদ্র পরিবারের নারীরা মধ্যপ্রাচ্যমুখী। আর লেখাপড়া না জানাটাই তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। নতুন পরিবেশে, মানুষ আর অপরিচিত ভাষা কিংবা দক্ষতা না থাকায় ফিরে আসতে হয় তাদের। ফিরেই আবার সেই বিভীষিকাময় জীবন। আবার দারিদ্র্যের সাথে সংগ্রাম। কখনো নিজের যৎসামান্য পুঁজি হারিয়ে কিংবা দেনার দায়ে জর্জরিত হয়ে পড়েন মধ্যপ্রাচ্য ফেরত নারীরা।

মধ্যপ্রাচ্যগামী নারীদের দক্ষ করে তুলতে সরকার বিভিন্ন সময়ে পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব নারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য মহিলা কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলেছে। শুরুতে এ সকল কেন্দ্রে কোনো ধরনের বাছ বিচার ছাড়াই প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। লেখাপড়া জানা কিংবা না জানা সকল দরিদ্র নারীরা প্রশিক্ষণ নিতে পারতেন। আর এ কারণে ভিড়ও ছিল উপচেপড়া। কিন্তু লেখাপড়া না জানা নারীরা কোনো রকমে প্রশিক্ষণ নিয়ে মধ্যপ্রাচ্য গেলেও টিকতে না পারায় ফিরে আসতে হয়। তাই মহিলা কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভর্তির জন্য ন্যূনতম লেখাপড়া জানা নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার উদ্যেগ নিয়েছে সরকার। এ কারণে সিলেট মহিলা কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে মধ্যপ্রাচ্যগামী নারীদের ভর্তির হার কমেছে। কেন্দ্রেয় দায়িত্বশীলরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বাসাবাড়িতে কাজের জন্য যোগ্য হয়ে গড়ে উঠতে একজন নারীকে ন্যূনতম লেখাপড়া জানতে হয়। লেখাপড়া জানা নারীরা বিদেশ গেলেও তারা মানিয়ে নিতে পারে। আর যারা একেবারেই লেখাপড়া জানেন না তারা গেলে বিভিন্ন সমস্যায় নিজেকে নিরাপদ রাখতে পারছেন না।

জীবনে দারিদ্র্যের সাথে যুদ্ধ করতে করতে একটু ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় নিয়ে সিলেটের দরিদ্র নারীরা মধ্যপ্রাচ্যমুখী। আর এ জন্য তারা প্রস্তুতিও সারছেন। পাসপোর্ট করা থেকে শুরু করে আরবি ভাষা শিক্ষাও নিচ্ছেন তারা। তবে লেখাপড়া না জানার কারণে পদে পদে তারা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। সরকারিভাবে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও রয়েছে। আবাসিকভাবে থেকে তারা আরবি ভাষার প্রাথমিক শব্দগুলো আয়ত্ব করছেন। এর মধ্যে পরিচিত শব্দ হিসেবে নিজেরাই নিজেদের মধ্যে প্রতিদিনের সাক্ষাতে ‘কাইফা হালুকা’ বলছেন। যার অর্থ আপনি কেমন আছেন? এছাড়াও আরবি ভাষায় বিভিন্ন সবজি, গাছ, ফুল, ফল, রান্নাঘরের উপকরণের নামও শিখে নেওয়ার চেষ্টা করছেন তারা।

সিলেটে বিদেশগামী নারীদের নানা ধরণের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে মহিলা কারিগরী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। নগরীর দক্ষিণ সুরমার আলমপুরে এর অবস্থান। সিলেট অঞ্চলের দুর দুরান্ত থেকে আসা মধ্যপ্রাচ্যগামী নারীরা ছাড়াও আত্মকর্মী হিসেবে যারা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চায় তারাও প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। আবাসিক, অনাবাসিক উভয় ধরনের শিক্ষার্থী রয়েছেন। তৃণমূল পর্যায়ে হতদরিদ্র মহিলারা বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে জনশক্তি কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণ ব্যুরোর আওতায় আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভর্তি হন। স্বপ্নের বিদেশ যাত্রার শুরু থেকেই তারা কষ্টের মধ্য দিয়ে পার হন।

এখানকার বাসিন্দাদের একেক জনের জীবনের গল্প একেক রকম। মূলত দারিদ্র্য আর হতাশা থেকেই তাদের প্রবাসযাত্রার স্বপ্ন। অনেকে জীবনের গল্প নতুন করে সাজাতে সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অনেকে আবার অভাবী সংসারে স্বচ্ছলতা আনতে অর্থের জোগান দিতে অজানা পথে পাড়ি জমাচ্ছেন সৌদি আরব, জর্ডানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে।

মধ্যপ্রাচ্য যাবার প্রস্তুতিপর্ব হিসেবে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে অনেকে ভর্তি হয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রশিক্ষণার্থী বলেন, জীবনের শুরু থেকেই দারিদ্র্যের সাথে সংগ্রাম করেছেন। অন্যের বাসাবাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে সংসার চালিয়েছেন। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে আর্থিক দৈন্যতা তাদের হতাশ করে তুলেছে। যে-কোনো উপায়ে স্বাবলম্বী হতে হবে। দারিদ্র্যের কারণে পিতার সংসারে যেমন কষ্ট করেছেন, তেমনি স্বামীর সংসারেও তেমনি। অনেকের স্বামীর যোগ্য সহধর্মিনী হয়ে সংসারের হাল ধরতে বিদেশ পাড়ি জমাতে চাচ্ছেন। আর এ কারণে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।

তারা বলেন, লেখাপড়া কম জানার খেসারত দিতে হচ্ছে। অনেক কিছু বুঝতে পারি না। বিভিন্ন ট্রেডে আরবি ভাষায় বিভিন্ন জিনিসপত্রের নাম, রান্নার উপকরণ কিংবা রান্না ঘরের সরঞ্জামের নাম শিখেছি। অতিথি সম্ভাষন কিংবা কারো সাথে প্রাথমিক কথাবার্তা চালিয়ে নেওয়ার মতো আমাদের গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। আমরাও যা পারছি শিখে নিচ্ছি। কারণ নতুন পরিবেশ, নতুন ভাষা কিংবা নতুন সংস্কৃতির সাথে মিশে যেতে হবে। তারা বলেন, প্রাথমিক কুশল বিনিময়ে সালামের পর সব চেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ‘কাইফা হালুকা’। জবাবে আলহামদুলিল্লাহ বলতে হয়। এভাবেই আমরা আরবি ভাষা শেখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার রীতা বেগম, সুনামগঞ্জের হাছনা বিবি ভর্তি হয়েছেন এখানে।

তারা জানান, প্রতিদিন সবজি আর ডাল দিয়ে এখানে দু’বেলা খাই এখানে। মাঝে মধ্যে মাছ-মাংসও দেওয়া হয়। বিদেশে গিয়ে কাজ করে ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য ভাষা শিখতে কষ্ট স্বীকার করেও আমরা এখানে পড়ে আছি। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এখানে কষ্ট হলেও তা মেনে নিয়েছি।

সিলেট মহিলা কারিগরী প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পরিচালক প্রকৌশলী শাহনাজ পারভীন বলেন, মধ্যপ্রাচ্যগামী নারীদের আমরা যোগ্য করে গড়ে তুলছি। আমরা তাদের হোম এপ্ল্যায়েন্স, হাউসকিপিং, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স ইক্যুইপমেন্টের ব্যবহার শিক্ষা দেওয়া ছাড়াও তাদের আরবি ভাষা প্রশিক্ষণ দিচ্ছি।

তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মহিলারা প্রশিক্ষণ ছাড়াই মধ্যপ্রাচ্য যাচ্ছেন। আবার অনেকে দালালদের খপ্পরে পড়ে জাল সার্টিফিকেট তৈরি করে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। একজন দরিদ্র পরিবারের মেয়ে উন্নত প্রযুক্তির সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ এখানে রয়েছে। আমাদের সিলেবাসে মেয়েদের বিদেশে গিয়ে জীবনধারণের মতো করে গড়ে তোলার কোর্স রয়েছে। এছাড়া বিদেশে গিয়ে কোনো বিপদের মুখোমুখি হলে কোথায় যোগাযোগ করা হবে তাও শিক্ষা দেওয়া হয়। যারা প্রশিক্ষণ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্য যায়, তাদের অনেকেই ফিরে আসতে হয়, কারণ মধ্যপ্রাচ্যেও জীবনধারা, ভাষার সাথে খাপ খাওয়াতে না পেরে। তাই আমরা ভাষা শিক্ষার উপরও গুরুত্ব দিই।

সিলেট জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস সূত্রে জানা গেছে, সিলেট বিভাগে এ বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে গেছেন ১৩ হাজার ৮৫৩ নারী। এদের মধ্যে সর্বোচ্চ হবিগঞ্জ জেলা থেকে ও সর্বনি¤œ সিলেট জেলা থেকে। জেলাওয়ারি হিসেবে হবিগঞ্জ থেকে ৫ হাজার ৫৬৩ জন, সুনামগঞ্জ জেলা থেকে ৪ হাজার ৪৫৫ জন, মৌলভীবাজার জেলা থেকে ২ হাজার ৫০৭ ও সিলেট জেলা থেকে ১ হাজার ৩২৮ জন নারী মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে গমন করেছেন।